যুবলীগ নেতার দাপটে বাড়িছাড়া ৫ পরিবার

340
gb

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা:: গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় একটি প্রেমের ঘটনার সূত্র ধরে গত দেড় বছর থেকে ৫টি পরিবারের ২৩ জন সদস্য বাড়িছাড়া হয়েছেন। উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের বেলতৈল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রতিপক্ষের হুমকি কারণে পরিবারগুলো বাড়িতে বসবাস করতে পারছেন না। বাড়িছাড়া এসব পরিবার মীমাংসার জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েও পাননি।
গত বছর ২০ জুলাইয়ের গাইবান্ধা পুলিশ সুপারের কাছে দাখিল করা একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বেলতৈল গ্রামের আজিজার রহমান মন্ডলের ছেলে সম্রাট আওরঙ্গজেবের সঙ্গে প্রতিবেশি সাঘাটা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হারুনুর রশিদ হিরুর ভাতিজির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তারা দুজনে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই রাতেই সম্রাট আওরঙ্গজেব,ভগ্নিপতি আইনজীবী আবু হায়াত মো. সামছুজ্জোহা মন্ডল সেকুল, চাচা হবিবর রহমান মন্ডল, বড় জেঠা জহির উদ্দিন মন্ডল, জেঠাতো ভাই মশিউর রহমান মন্ডল মুকুলের বাড়ি ও কক্ষের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করে নিয়ে যায় হারুনুর রশিদ হিরুসহ তার পরিবারের সদস্যরা।
পরে আবার ২৩ সেপ্টেম্বর সম্রাট, তার বড় ভাই প্রিন্স, ভগ্নিপতি সামছুজ্জোহা, জেঠাতো ভাই মামুন ও বড় বোন বিলকিসকে আসামি করে সাঘাটা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন হারুনুর রশিদ হিরু। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ দোষ না থাকায় অন্যান্য আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে শুধু সম্রাটকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মইনুল হক ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেন, হারুনুর রশিদ হিরু ক্ষিপ্ত হয়ে সম্রাটের পরিবারসহ অন্যান্য পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদেরকে বাড়িছাড়া করেছেন। ফলে তারা জীবনের ভয়ে অন্যত্র বাড়িভাড়া নিয়ে বসবাস করছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানকালে বেলতৈল গ্রামে আমার উপস্থিতিতে বাড়িছাড়া এসব পরিবারের সদস্যদের পক্ষের কয়েকজন লোক স্বাক্ষ্য দেওয়ার জন্য উপস্থিত হলে হারুনুর রশিদ হিরু তাদেরকে মারধর করার চেষ্টা করেন ও হুমকি দামকি দেন। বাড়িছাড়া এসব পরিবারের সদস্যরা নিজের বাড়িতে প্রবেশ করলে যে কোন সময় তাদের উপর হামলা হতে পারে বলে ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মইনুল হক।
অপরদিকে ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বাড়িছাড়া এসব পরিবারের সদস্যরা যাতে নির্ভয়ে নিজ বাড়িতে বসবাস করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনাটির মীমাংসার কোনো চেষ্টাই করেননি বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিনে ওই সব বাড়িতে দেখা যায়, ভেঙ্গে ফেলায় কয়েকটি ঘরের দরজা নেই। ঘরের ভেতরের সামান্য কিছু আসবাবপত্র আছে, তাও আবার ভাঙাচুরা অবস্থায় এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। আঙ্গিনায় আগাছা জন্মেছে। আশেপাশের গাছের পাতা পরে আবর্জনার স্তুপে পরিণত হয়েছে বাড়িগুলো।
সম্রাটের বড় ভাই প্রিন্স মাহমুদ বলেন, ওই মেয়েটি ও আমার ছোট ভাই সম্রাট পালিয়ে যাওয়ার চার-পাঁচ দিন আগে ওই মেয়েটি একদিন স্বেচ্ছায় আমাদের বাড়িতে এসে ওঠে। পরে তার পরিবারকে ডেকে তাদের হাতে মেয়েটিকে তুলে দেয়া হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের উপর হামলা করে জীবননাশের হুমকি দিয়ে আমাদের বাড়িছাড়া করেছেন হারুনুর রশিদ হিরু।
ওই মেয়েটি সম্রাটের বাড়িতে স্বেচ্ছায় যাওয়ার কথা স্বীকার করে হারুনুর রশিদ হিরু বলেন, এই ঘটনার পর আমরা সম্রাটের পরিবার ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের সঙ্গে একটি বৈঠকে করি। বৈঠকে সম্রাটকে খুব দ্রুত অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে সম্রাট আবার আমার ভাতিজিকে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং ১০-১২ দিন পর বাড়ি ফিরে আসে।
বাড়ি ভাঙচুর-লুটপাটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কারও বাড়ি ভাঙচুর-লুটপাট করিনি। আমাদের হয়রানি করার জন্য তারা নিজেরাই ইচ্ছা করে বাড়িতে থাকেন না। এ ছাড়া সম্রাট তার ভাতিজিকে উত্ত্যক্ত করতো বলেও জানান হারুনুর রশিদ হিরু।
আইনজীবী আবু হায়াত মো. সামছুজ্জোহা মন্ডল সেকুল বলেন, হারুনুর রশিদ হিরু ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পাঁচটি পরিবারকে বাড়িছাড়া করেছেন। দেড় বছর থেকে আমরা বাড়িতে যেতে পারছি না। নিজের ঘরবাড়ি, জমি-জমা থাকলেও বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। পুলিশের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।
সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উচ্ছেদ হওয়া ওইসব পরিবারের সদস্যরা যেদিন চাইবে সেদিন আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের বাড়িতে তুলে দেব। তারা কোনদিন বাড়িতে উঠতে চায় সেটা আমাকে জানালে আমি ফোর্সসহ নিজে উপস্থিত থাকবো।