বৈধ প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা অবৈধ ব্যবস্থাপনায় কেন

381
gb
মাঈনুল ইসলাম নাসিম ||
চার বছর আগে পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি বলেই নির্বাচন সুষ্ঠ হয়নি কিংবা একই কারণে বর্তমান সরকার অবৈধ, এই ক্যাটাগরির সস্তা ব্লেমগেমে আমি বিশ্বাসী নই। বিএনপি নির্বাচনে না আসাতে গত চার বছরে তারা ‘যার পর নাই’ প্রায়শ্চিত্ত করেছে, এখনও করছে এবং আগামীতে করবে কি করবে না সেটাও এখনো অনিশ্চিত। সংবিধান মোতাবেক বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে তাই কোন কিছু বলার না থাকলেও সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশ সফরকালীণ সময়ে বিভিন্ন দেশে আয়োজিত গণসংবর্ধনার বৈধতা প্রশ্নের মুখোমুখি আজ শতভাগ। একজন বৈধ প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা বিদেশের মাটিতে কেন এবং কিভাবে অবৈধ ব্যবস্থাপনায় হয়ে থাকে সেটাই তুলে ধরছি নাতিদীর্ঘ এই নিবন্ধে।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে বিদেশে যেখানেই যাবেন, সেখানকার স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাঁকে স্বাগত জানাবে বা গণসংবর্ধনা দেবে এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু একাধারে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান, তাই যৌক্তিক কারণে বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের বাড়তি উৎসাহ উদ্দীপনা থাকবে, এটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিদেশে আয়োজিত এই গণসংবর্ধনার যাবতীয় খরচাদি যেহেতু সংশ্লিষ্ট দেশেরস্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হয়সঙ্গত কারণে উক্ত গণসংবর্ধনা যে কোন অবৈধ রাজনৈতিকব্যানারে আয়োজন করা নৈতিকতার মাপকাঠিতে শতভাগ অনভিপ্রেত এবং অগ্রহণযোগ্য। কেননা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক প্লাটফর্মটি বিভিন্ন দেশের আইনে পুরোপুরি অবৈধ।
 
সম্পূর্ণ সরকারী খরচে বিদেশের মাটিতে যে দলীয় রাজনৈতিক ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা আয়োজন করা হচ্ছেসেসকল রাজনৈতিক দল বা সংগঠনেরকোন আইনগত বৈধতা বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নেই। বিশ্বের কোন দেশই তার দেশের অভ্যন্তরে ভিনদেশী কোন রাজনৈতিক দল বাদলের কর্মকান্ডকে অনুমোদন করে না বা করার সুযোগও নেই। কেউ করলে অবশ্যই সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইনে। আর এ কারণেইবাংলাদেশ ভিত্তিক যে কোন রাজনৈতিক দলের ন্যূনতম কোন আইনগত বৈধতা বিদেশের কোথাও নেই। এ ব্যাপারে কারো কোন প্রকার সন্দেহ থাকলে নিজ নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট কোন স্থানীয় বিজ্ঞ আইনজীবির শরণাপন্ন হয়ে অতি সহজেই জেনে নিতে পারেন প্রবাসে ‘বাংলাদেশ ভিত্তিক রাজনীতি’ কেন শতভাগ অবৈধ।
 
চরম ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছেহাতে গোনা কিছু দেশে আমাদের দেশের চতুর লোকজন বিগত দিনে তাদের রাজনৈতিক সংগঠনকে বিভিন্ন দেশে ‘প্রতারণামূলকরেজিস্ট্রেশন করিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের খাতায় সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠন দেখিয়ে। “রাজনৈতিক সংগঠনের নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন আছে’’ এমনটাযারা দাবী করে বিভিন্ন দেশেঅফিসিয়ালি খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার নিয়েছে সেটা নামে  কাজেরাজনৈতিক সংগঠন’, কিন্তু তাদের নিবন্ধনের ক্যাটাগরি হচ্ছে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক। আইনের দৃষ্টিতে ‘ডাবল প্রতারণা’ নির্ভর এমন রাজনৈতিক ব্যানারেওএকাধিক দেশে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা বাংলাদেশ সরকারের খরচে আয়োজন করার নজির রয়েছে।
 
অনুসন্ধানে দেখা গেছেবাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে যোগান দেয়া অর্থে বিভিন্ন দেশে আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় দলীয় পরিচয়ের মুখচেনালোকজনের বাইরে তেমন কারো অংশগ্রহণের সুযোগ একেবারেই সীমিত বা নেই বললেই চলে। আগে থেকেই তালিকাভুক্ত দলীয় লোকজনরাই শুধুমাত্র এইগণসংবর্ধনায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পায় এবং সেই দলীয় লোকদের সামনেই সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড বর্ণনা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দুর্ভাগ্যজনকহলেও সত্য যেসফরের আগে ঢাকার মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হয় অমুক দেশের তমুক শহরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেয়া সংবর্ধনা তথাকমিউনিটির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বাস্তবে দিনশেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যোগ দেন বিভিন্ন দেশ থেকে জড়ো হওয়াখুবই ‘লিমিটেড এন্ড লিস্টেড’ কয়েকশ’ দলীয় লোকের সমাবেশে।
 
প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় প্রবেশের তালিকাটি যারা তৈরী করে তারা আবার বিভিন্ন কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদেরনাম তালিকায় না থাকাই স্বাভাবিক কিন্তু দেখা যাচ্ছেসরাসরি আওয়ামী লীগ না করার ‘অপরাধে’ বিভিন্ন দেশে সমাজের অনেক সুধীজন এবং ত্যাগীকমিউনিটি ব্যক্তিত্বদের সুকৌশলে বঞ্চিত করা হয় প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনায় যোগদান থেকে। এই অপকর্মটি করছে দলের নাম

ভাঙ্গানো গুটিকয়েক ‘ভিলেজ পলিটিশিয়ান’, যাদের দাপটে অসহায় সরকারী চাকরি করা দূতাবাসের কর্তাব্যক্তিরা। বিভিন্ন দেশে মেইনস্ট্রিমে আকাশচুম্বী সাফল্যের অধিকারী তথা বিভিন্ন সেক্টরে ‘ডমিনেট’ করা বাংলাদেশের ‘সোনার সন্তান’ অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি আসার কিংবা গণসংবর্ধনায় যোগ দেওয়ার সুযোগ পান না এই ভিলেজ পলিটিশিয়ানদের অপকর্মের খেসারতে।
 
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেহেতু কোন দলের প্রধানমন্ত্রী নন এবং তিনি যেহেতু দেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী, তাই বিদেশে রাষ্ট্রীয় খরচে আয়োজিত গণসংবর্ধনা কেন দূতাবাস বা হাইকমিশনের ব্যানারে অথবা তাদের তদারকিতে গঠিত কোন বিশেষ ‘নাগরিক কমিটি’ কিংবা এটলিস্ট কোন বৈধ সংগঠনের ব্যানারে আয়োজন করা হবে না, এই প্রশ্নের জবাব জানতে চান সাধারণ প্রবাসীরা, যারা বিদেশের মাটিতে অবৈধ দেশী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থেকেও মনেপ্রাণে ভালোবাসেন বাংলাদেশকে। বৈধ প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশে যারা অবৈধ অর্থায়নে এবং অবৈধ সাংগঠনিক ব্যানারে গণসংবর্ধনার নামে প্রশ্নের মুখোমুখি করছে, তাদেরকে থামাবার এখনই সময়। বৈধ প্রধানমন্ত্রীকে যারা অবৈধ ব্যবস্থাপনায় মঞ্চে উঠায়, তারা দেশপ্রেমিক তো নয়ই বরং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হবার ন্যূনতম কোন নৈতিক যোগ্যতাও তাদের নেই। বৈধ প্রধানমন্ত্রীকে যারা প্রতারিত করছে, তাদের মুখে বড় বেশি বেমানান ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।