নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিভাগ ভিত্তিক হোক

395
gb

রাজু আহমেদ ।| জিবি নিউজ টোয়েন্টিফোর  ||

চাকুরির বিজ্ঞপ্তিতে শুণ্য আসন যে সংখ্যায় থাকুক তাতে আবেদনের সংখ্যা কোনভাবেই লাখের নিচে থাকছে না । এতে প্রমাণ মিলছে, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে কিন্তু তুলনামূলক কর্মসংস্থান বাড়ছে কম । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রধারীদের দীর্ঘ বেকার জীবন কতোখানি হতাশার তা অভিজ্ঞ মাত্রেরই সঠিক উপলব্ধির বিষয় । যন্ত্রনার বাড়তি অনুষঙ্গ হিসেবে আবেদনের শর্তে সংযুক্ত ৫০০-৭০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফটের বাধ্যবাধকতা বেকার চাকুরিপ্রার্থীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে । আর্থিক সংকটকালীন সময়ে প্রায় প্রত্যেকটি চাকুরির পরীক্ষা রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে প্রার্থীদেরকে সেথায় উপস্থিত হয়ে অংশগ্রহন করা জীবন-মরণের চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে । তাছাড়া নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষেররীত, যুক্তির লাঘামহীন কোটা পদ্ধতি-এসব দিকের কথা না হয় আড়ালেই রইলো । সুশাসনের অনুষঙ্গগুলো যখন কেবল কাগজে সাঁটা আর বক্তৃতার মঞ্চে ঝংকারিত হয়েই তার কর্ম ক্ষান্ত করে সেখানে খুব বেশি ভালোর আশা থাকে না ।

চাকুরি হোক বা না হোক, চাকুরির পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে পারার মধ্যে এক ধরণের প্রশান্তি আছে । অনিয়মের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভুলে অন্তত চিত্তকে সান্ত্বনা দেয়া যায়, যোগ্য ছিলাম না বলেই লক্ষ্যে পৌঁছিনি । সর্বদিকের সুবিধার্থে প্রায় প্রতি শুক্রবার রাজধানীতে কোন না কোন নিয়োগ পরীক্ষা থাকে । বেকারদের রাজধানীতে ছুটতে হয় ।ধার-কর্যের অর্থ ব্যয়ে দীর্ঘ ভোগান্তির পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষার আসনে বসতে হয় । তিরিশ বছর পর্যন্ত এভাবেই স্বপ্নরা বেঁচে থাকে । কয়েক ডজন বার ব্যাংক ড্রাফট কাটতে হয়, দেশের শেষ সীমানা থেকেও জীবিকার স্থায়ী নিশ্চয়তার সন্ধানে রাজধানীতে আসতে হয় । পদে পদে ভোগান্তি বহাল দেখে যখন শুনতে হয় প্রশ্ন ফাঁস ছিল কিংবা দেখতে হয় কারো ‘মামার সুপারিশ কিংবা টাকার ক্ষমতা নতুবা বিশেষ ব্যানারের’ বদৌলতে চাকুরি হয়ে গেছে তখন ধিক্কার জাগে । যে রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিককে তার কাছে ঋণী করলো সেই রাষ্ট্র এবার নাগরিকদের কাছে ঋণী হতে শুরু করে । নিয়ম-শৃঙ্খলার মাঝে প্রকাশ পায় দৈণ্যাভাব । অনিয়ম চড়ে বসে নিয়মের ঘাড়ে ।

বেকার চাকুরি প্রার্থীদের সুবিধার্থে এবং রাষ্ট্রের মঙ্গলার্থে অন্তত দু’টো কাজ করতেই হবে । প্রথমতঃ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত হিসেবে ব্যাংক ড্রাফটের প্রথা বাতিল করা সময়ে দাবী । প্রত্যেক আবেদনে ৫০০-৭০০ টাকা বেকারদের পক্ষে জোগাড় করা রীতিমত কঠিন সংগ্রামের । এজন্য পরিবারের সদস্যদের কালো চেহারা দেখতে হয়, পরিচিতদের উপহাস সহ্য করতে হয় । কাজেই এ ভার বহন করার সামর্থ্য সিংহভাগ বেকারের নাই । প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে যোগ্য কর্মী বাছাই করবে, সেখানে প্রায় হাজার টাকা বেকারের কাছ থেকে নেয়া হবে কোন যুক্তিতে ? ব্যাংক ড্রাফটের  আয়োজন করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার নামে কোন কোন প্রতিষ্ঠান চাকুরি দেয়ার প্রতারণার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ খোঁজার সংবাদও মাঝে মাঝে প্রকাশ পায় । এসবে আমরা অবাক হইনা ! কেননা রাষ্ট্র যখন দুর্নীতির সুযোগ দেয় তখন ঠগদের থেকে সুনীতি আকাঙ্ক্ষা করলে সেটা আব্দার হিসেবে অন্যায়ের মোড়কবদ্ধ হবে হয়তো !

দ্বিতীয়তঃ যেসব নিয়োগ পরীক্ষায় অন্তত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা লাখের গন্ডি স্পর্শ করে সেসব পরীক্ষার আয়োজন বিভাগ ভিত্তিক করার সময়ের সবচেয়ে বড় এবং যৌক্তিক দাবী । দেশের বিভিন্ন বিভাগের প্রত্যেকটি থেকে ২০-৩০ হাজার পরীক্ষার্থীর রাজধানীতে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহন করারটা মোটেই সুখকর নয় । দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কিঞ্চিৎ করুণ দশা, যানবাহনের প্রতিকূল পরিবেশ, পথে পথে জ্যামের ভোগান্তিতে নাকাল হওয়া এবং রাজধানীতে অতিরিক্ত জনসমষ্টির আবাসন সংকটের যে তীব্র যন্ত্রনাতে চাকুরি প্রার্থীদেরকে অবতীর্ণ হতে হয় তা বর্ণনাতীত দুঃসহ অভিজ্ঞতার । বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে রাজধানীতে অবতীর্ণ হওয়া প্রায় অসম্ভবের কোঠায় । দেশের বিভিন্ন শহর থেকে ছেলেরা রাজধানীতে গিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্র খুঁজে একাকী পরীক্ষা দিয়ে ফিরতে সক্ষম হলেও মেয়েদের সাথে তার অভিভাবক হিসেবে কাউকে না কাউকে যেতেই হয় । কেননা নিরাপত্তার প্রশ্নের মেয়েদের নিরাপত্তা এখনো রাষ্ট্রের সর্বোত্র সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি । এসব বিভিন্ন দিকের বিবেচনায় কর্তৃপক্ষের উচিত অন্তত বৃহৎ নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিভাগ ভিত্তিক আয়ো্জন করার ব্যবস্থা নেয়া ।

বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দেশের বিভাগ ভিত্তিক সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা যেহেতু সম্ভব হচ্ছে কাজেই অন্যান্য পরীক্ষাগুলো বিভাগ ভিত্তিক আয়োজন করা মোটেই অসম্ভব নয় । পরীক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাধি হিসেবে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা প্রায় স্বাভাবিকভাবে ঘটছে । কতিপয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে নৈতিকতা চর্চার অভাব থেকে এসব নীতিহীন বিচ্যূতি প্রকাশ পাচ্ছে । রাষ্ট্রের উচিত এসব মনুষ্যরূপী রিপুকে চিহ্নিত করে তাদের শক্ত হাতে দমন করা । অন্যায়-অনাচারের পন্থায় যে নিয়োগ হয় তাতে রাষ্ট্র তার যোগ্য সেবক থেকে বঞ্চিত হয় । চারদিকে বিশৃঙ্খলা দানা বাঁধে । কোথাও কোথাও জাতির জনকের নাম কিংবা বাংলাদেশের নামটিও ভুল বানানে মূদ্রিত হতে দেখা যায় । অশিক্ষিত টাইপিষ্ট না হয় অনিচ্ছাকৃত ভুল করতে পারে কিন্তু যারা তদারকির দায়িত্বে তাদের দৃষ্টি কোথায় থাকে ? এদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সুশাসন বাস্তবায়ন, কর্তৃপক্ষের যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন প্রত্যহ দেখি । এ স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্যে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা সর্বাগ্রে জাগ্রত হতে হবে নয়তো সবকিছু বৃথা রোদনে যাবে । শৃঙ্খলার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে কারো কোন অভিযোগ থাকবে না । বিশ্বের অনেক দেশ যখন এসব পারছে অতএব আমরাও পারবো বলেই বিশ্বাস । শুধু কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক অবস্থান গোটা জাতির ইতিবাচক অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে ।

রাজু আহমেদ । কলামিষ্ট ।

raju69alive@gmail.com