করোনা নিয়ে ডা. মিলিভা যা বললেন

181

আমাদের জীবনযাপন, দেশ ও বর্তমান বিশ্ব একটি নতুন ধরনের ভাঙনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। স্কুল গুলো বন্ধ। সকালে স্কুলে যাবার তাড়া নেই। অফিস –আদালত, বিনোদন-কেন্দ্র, শপিং মল, এয়ারলাইন্স সবখানেই নীরবতা, স্তব্ধতা। এর সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অত্যাবশ্যক। আমাদের সবার নজর এখন এই SARS-COV-2 (করোনা) ভাইরাসমুখি। SARS, MERS এর সাথে মিল থাকলেও এটি একটি নতুন ধরনের ভাইরাস। SARS, MERS শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ করলেও এরা এত দক্ষভাবে ছড়ায় না যা এই COVID-19 ছড়ায়। এই ছড়ানোটাই গেম চেঞ্জার। আর এটির লক্ষণ উপসর্গ ইনফ্লুয়েঞ্জার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। সারা বিশ্বে এই রোগে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। আবার সুস্থ্যও হচ্ছেন। আমাদের লক্ষ্য হবে এর সংক্রমণ বন্ধ করে প্রাদুর্ভাব কমানো, সেই সাথে মৃত্যুহার ও ক্ষতি কমানো। এ কাজ জনগণ, সরকার, ডাক্তার ও রোগীর সম্মিলিত প্রয়াসে সম্ভব।

COVID-19 সংক্রমণ রোধে ৩টি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ—

১। করোনা রোগী শনাক্তকরণ

২। কোয়ারেন্টিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে আইসোলেশন

৩। কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং ফলোআপ করা অর্থাৎ রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষজনকে শনাক্ত করে নজরদারিতে রাখা।

সোশ্যাল ডিসটেনসিং বা সামাজিক দূরত্ব সংক্রমণ রোধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ন হাতিয়ার। যেটা মূলত ফিজিক্যাল ডিসটেনসিং বা শারীরিক দূরত্ব (১ মিটার) বজায় রাখা।

কেস আইডেন্টিফাই করতে টেস্ট এর বিকল্প নেই। টেস্ট করে কেস আইডেন্টিফাই করে রোগীকে আইসোলেশন করা, তার কন্টাক্টগুলোকে কোয়ারেন্টাইন রাখা ও তাদের ফলোআপ করা যে তারা আক্রান্ত হল কিনা তা জানা ভীষণভাবে জরুরী। রোগীকে সুস্থ্য ঘোষণা করতেও পর পর ২টি টেস্ট করতে হবে। নেগেটিভ হলেই তবে সুস্থ্য বলা যাবে।

চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যসেবাকর্মী যারা সরাসরি রোগীকে সামলাবেন তাদের বিজ্ঞানসম্মত সুরক্ষা ব্যবস্থা বা PPE (Personal Protective Equipment) সুনিশ্চিত করতে হবে যেন সেবা দিতে গিয়ে তারা নিজেরা রোগাক্রান্ত না হন এবং সর্বোপরি এরা রোগ ছড়ানোর মাধ্যমে পরিণত না হন।

আশার কথা হল কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস সুবিধা করতে পারে না। মৃদু উপসর্গ থেকেই তারা সুস্থ্য হচ্ছেন। যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো তারা এই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত বয়সের সাথে সাথে এই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। কিন্তু আমরা দেখছি কিছু বয়োবৃদ্ধ মানুষকে সুস্থ্য হতে আবার কিছু তরুণকে মৃত্যুবরণ করতে।

এই যে আমরা সবাই অন্তঃপুরের বাসিন্দা হয়ে আছি, এ সময়টা আমরা আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগাতে পারি। একজনও যদি আমরা নিজেকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখি তাহলে স্বাস্থ্যসেবায় কিছুটা হলেও চাপ কমবে।

এজন্য যা যা করতে হবে তা হলো—

প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। শাক-সবজি, ফল, ছোট মাছ এসবে প্রচুর ভিটামিন রয়েছে।

এন্টি-অক্সিডেন্ট ভিটামিন অর্থাৎ ভিটামিন এ, সি এবং ই বেশি পরিমাণে খাবেন।

ভিটামিন এ এর কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হল রোগপ্রতিরোধ করা। এটি হলুদ, সবুজ এবং রঙিন শাক-সবজি ও ফলে পাবেন। যেমন গাজর, ব্রকলি, পালং শাক, পাকা পেঁপে, ডিম ও কড লিভার ওয়েলে।

ভিটামিন সি এর কথা আমরা সবাই জানি। করোনা প্রতিরোধে এর কথা জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে। টক জাতীয় ফলে পাওয়া যায়। যেমন কমলা, জাম্বুরা, লেবু, পেয়ারা, আনারস, আমলকি ও মালটা ইত্যাদি।

ভিটামিন ই আরেকটি অত্যন্ত কার্যকরী এন্টি-অক্সিডেণ্ট। কাঠ বাদাম, পেস্তা বাদাম, চিনা বাদাম, সূর্যমুখি তেল, সয়াবিন তেল, দানাদার শস্য, পিনাট বাটার ইত্যাদিভিটামিন ই এর উৎস।

মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। নইলে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বাড়বে যা ক্ষতিকর। ব্যায়াম বা শারিরীক পরিশ্রম আমাদের শরীর ও মনের স্বাস্থ্যের জন্য অধিক প্রয়োজনীয়। সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ মিনিট হাটা অথবা হালকা ব্যায়াম আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

প্রতিদিন ৭-৮ ঘন্টা শান্তিপূর্ণ ঘুম প্রয়োজন। ঘুমালে শরীরে গ্রোথ হরমোন, প্রলাক্টিন, মেলাটনিন ও লেপ্টিন নামক হরমোণ নিঃসরণ বাড়ে যা আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

ইতিমধ্যে আমরা জানি ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে কি কি করতে হবে। সঠিক নিয়মে (কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড) হাত ধুয়ে নিতে হবে। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মানতে হবে। ঘর পরিষ্কারে ব্লিচিং পাউডারের দ্রবণ (১ লিটার পানিতে পৌনে ২ টেবিল চামচ পাউডার) ব্যাবহার করতে হবে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যাতিত করোনা প্রতিরোধে যেকোন ওষুধ সেবন প্রাণঘাতী হতে পারে। সর্বোপরি পরম করুণাময় স্রষ্টার কাছে বিপদমুক্তির প্রার্থনা করুন। ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন ও সবাইকে সুস্থ্য রাখুন।