টুকরো-টাকরা ভাবনা যত ,আধুনিক কবিতা বিষয়ে

117
gb

মুহম্মদ আজিজুল হক

[আমি পরিতৃপ্ত আমার ভাবনার কথা ব’লে,
দুঃখ নাহি তা যদি কারো ভাবনায় না-ও মেলে।]

আমার একজন বিশেষ ঘনিষ্ঠজন আমাকে একবার কিছুটা কৌতুকের স্বরে বলেছিলেন, “আধুনিক আর্ট, আধুনিক মিউজিক, আধুনিক কবিতা এবং স্পঞ্জ রসগোল্লা –এরা সবই এক পর্যায়ের।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তা কি করে?” তিনি বললেন, “ওগুলো সব সাধনাবিমুখতা আর ব্যর্থতারই নামান্তর।” তিনি আরো বলেছিলেন আর্ট তিনি আদৌ পছন্দ করতেন না। আর্টের প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণই ছিল না। কিন্তু তাঁর সমস্ত মনোভাবটাই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল প্যারিসের লুভর মিউজিয়াম (Musée du Louvre) ভিজিট করার পরে। আর্ট যে কতটা নিখুঁতভাবে বাস্তব ব্যক্তি বা বস্তুর বা নৈ্সর্গিক দৃশ্যের অনুকরণ হতে পারে তা তিনি লুভর মিউজিয়ামে না গেলে কল্পনাও করতে পারতেন না। লুভর মিউজিয়ামই তাঁর মধ্যে প্রথমবারের জন্য এই সচেতনতা সৃষ্টি  করে যে Leonardo da Vinci, Raphael, Peter Paul Rubens, Michelangelo, Theodore Gericault ও Eugene Delacroix-এর মতো জগদ্বিখ্যাত কালজয়ী শিল্পীরা অনেক সাধনা করে তাঁদের সৃষ্টিকর্মের বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। স্রষ্টা হয়তো তাঁদের অন্তরে একটি অনুপ্রাণনার স্ফুলিঙ্গ দান করেছিলেন, কিন্তু সেই স্ফুলিঙ্গকে তাঁদের বিপুল সৃষ্টিকর্মের বিশাল বহ্নিশিখায় রূপান্তরের জন্য তাঁদেরকে বিরতিহীন সাধনার অপরিসীম কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন যেমনটি বলেছিলেন, “Genius is one percent inspiration and ninety-nine percent perspiration.”। অষ্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় অবস্থিত একটি আর্ট মিউজিয়ামে শিল্পকর্মের একটি প্রদর্শনীতে আমার উপরোক্ত ঘনিষ্ঠজন রুবেন্সের একটি সেল্ফ-পোর্ট্রেইট দেখেছিলেন। দেখে নাকি মনে হয়েছিল কোনো হাই রেজোলুশন ক্যামেরা দিয়ে তোলা একটি নিঁখুত ছবি; অনবদ্য, বিস্ময়কর। রুবেন্সের শ্মশ্রুমন্ডিত মুখমন্ডল; শ্মশ্রুর প্রতিটি স্ট্র্যান্ড যেন আলাদাভাবে গণনা করা যাবে; আবার সব মিলিয়ে একমুখ দাড়ি। তাঁর চোখের তারা হতে নীলাভ আইরিসের ওপর সূর্যকিরণের মতো ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি সূক্ষ্ম দাগ ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃষ্ট হয় কাছে থেকে লক্ষ্য করে দেখলে; কিন্তু একটু দূর থেকে কী অনিন্দ্য চক্ষুদ্বয় নজর কাড়ে।

সকল খ্যাতিমান শিল্পী, ভাস্কর, গায়ক, সাহিত্যিক, কারিগর (তা সে মিষ্টিরই হোন, বা, ফার্নিচারেরই হোন) একটি অভিন্ন গুণে গুণান্বিত ছিলেন –সাধনা। অবিরাম ও অক্লান্ত সাধনাই তাঁদেরকে তাঁদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে উৎকর্ষের অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। গায়ক বা গায়িকা হিসেবে যাঁরা অমরত্বের স্পর্শমাত্র পেয়ে আজো স্মরণীয় হয়ে আছেন প্রতিদিন অতি প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে তাঁরা হারমোনিয়াম, বীণা বা সেতার নিয়ে গলা সাধতেন বা সংগীত সাধনায় রত হতেন। তাদের সেই গলা সাধার উৎপাতে প্রতিবেশীদের সকালের সুখনিদ্রার সুখভঙ্গ হলেও তারা তা নির্বিবাদে সহ্য করতেন। যাঁরা কবিতা লিখতেন, তাঁদেরকে কবিতা রচনার কলা-কৌশল, তাল, পর্ব, লয়, ছন্দ, মাত্রা, অন্তঃমিল, অন্ত্যমিল, মিত্রাক্ষর, অমিত্রাক্ষর, যতি, ছেদ, চিত্রকল্প, রূপক, উপমা, অনুপ্রাস, কাব্যরস, ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞন রাখতে হতো। বিখ্যাত কবিদের রচিত কবিতাসমূহ পাঠ করে নিজেদের মধ্যে সুপ্ত কাব্য-প্রতিভাকে বিকশিত করতে হতো। ভাস্করদেরকে অক্লান্ত সাধনায় রপ্ত করতে হতো পাথরে খোঁদাই করে নান্দনিক ভাস্কর্য সৃষ্টি করার কৌশল। মিষ্টির সফল ও ইনোভেটিভ কারিগরই জানেন কিভাবে অপূর্ব স্বাদের মিষ্টি তৈ্রী করতে হয়। এসব সফলতার পশ্চাতে থাকতো বিরামহীন, ক্লান্তিহীন সাধনা। সাধনাই ছিল তাঁদের বিস্ময়কর সফলতার সূতিকাগার। আর কঠোর সাধনার সীমাহীন কষ্ট করার শক্তি ছিল তাঁদেরই, যাঁদের ছিল অধ্যবসায়, প্রবল ইচ্ছেশক্তি, অসামান্য উচ্চতায় পৌঁছাবার অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা। আজ উচ্চাকাংখার অভাব নেই। অনেকেই আপন আপন ক্ষেত্রে অনেক উঁচুতে উঠতেই চান। কিন্তু ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে অধ্যবসায় এবং অক্লান্ত সাধনার প্রয়োজন তা আছে ক’জনার? তাঁদের প্রায় সকলেই কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চান বিনা পরিশ্রমে, বিনা সাধনায়। তাই অনায়াসলভ্য অর্জন হিসেবে আমরা পাই আধুনিক দুর্বো্ধ্য আর্ট (বলে রাখি, আধুনিক আর্টের সবগুলোই যে শিল্প-সুষমাবিবর্জিত তা নয়; ব্যতিক্রমধর্মীও ঢের আছে); পপ আর রক  সঙ্গীত, যেখানে গায়ক-গায়িকার কন্ঠের সকল দুর্বলতা ও সকল অভাব তলিয়ে যায় বিশাল আম্পলিফায়ারের লক্ষ ডেসিবল আওয়াজের মধ্যে; প্লাবনের জলের মতো চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসা দুর্জেয় সব আধুনিক কবিতা; এবং সুস্বাদু রসগোল্লা তৈ্রীর প্র্য়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় পাই স্পঞ্জ রসগোল্লা। নবপ্রজন্মের মানুষের মাঝে এসবের যে বেশ কদর আছে তা অনস্বীকার্য। কারণ, এসবেই তাঁরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন।

মানব মনের ভাবনা, অনুভূতি, ইত্যাদি যথোপযুক্ত, সুস্পষ্ট, সুন্দর এবং কাব্যিক ভাষায় ও ছন্দে প্রকাশ পেলে তা হয়ে ওঠে উৎকৃষ্ট কবিতা। অসংখ্য আধুনিক কবিতা আছে যা মূলত কবিতার অবয়ব-আরোপিত গদ্য। কিন্তু গদ্যকে শুধু কবিতার বাহ্যিক আদল আরোপ করলেই কবিতা হয় না; কবিতার অভ্যন্তরীণ বা অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলিও থাকতে হয়। আধুনিক, অর্থাৎ আমাদের সমকালিক, কবিতার ভাব ও ভাষার দুর্বোধ্যতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে ঐসব কবিতার অনেক সমঝদারকে বলতে শুনেছি আধুনিক কবিতা বুঝতে হলে তোমাকে আধুনিক কবিতার ওপর বিস্তর পড়াশোনা করতে হবে। ওসব কবিতার ভাব, ভাষা, বৈশিষ্ট্য, শব্দচয়ন, ইত্যাদি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। ভাবখানা এমন যেন আধুনিক কবিতা হতে কাব্যরসের স্বাদ পেতে হলে আধুনিক কবিতার ওপর পিএইচডি করে আসতে হবে। মনে প্রশ্ন জাগে; কই, রবীন্দ্রনাথের ‘যেতে নাহি দিব’, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, জসীমউদ্দীনের ‘কবর’, জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’, ‘আবার আসিব ফিরে’, ইত্যাদি কবিতা পড়ে বুঝতে তো পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করে আসতে হয় না! এইসব বিশ্ববরেণ্য কবি আর আমাদের সমকালীন কবিদের (সম্মানিত ব্যতিক্রমধর্মী কতিপয় ব্যতীত) মাঝে ফারাকটা কোথায়? কি কারণে? কালের কষ্টিপাথর কাদের লেখাকে ছাড় দিয়েছে? কাদের লেখা টিকে আছে? কাদের লেখা টিকে থাকবে?

একজন কবির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত লেখনীর মাধ্যমে তারঁ মনের ভাব, অনুভূতি, কল্পনা, চিন্তা, চেতনা, দর্শন, জীবনোপলব্ধি, ইত্যাদি কাব্যরসে সিঞ্চিত করে পাঠকের মন-মানসে অনুরূপ ভাব, অনুভূতি, উপলব্ধি, ইত্যাদি সঞ্চারিত করা। মানব মনের বিচিত্র ভাব, অনুভূতি, ইত্যাদির সুস্পষ্ট, প্রাঞ্জল ও সুললিত, তথাপি ব্যঞ্জনাময় প্রকাশই কবির লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়; বক্তব্যের অস্পষ্টতা ও ভাষার দুর্বোধ্যতার মাধ্যমে ভাব বা অনুভূতি গোপন করা নয়। ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে মনের কথা ও প্রকৃ্ত অনুভূতি, অভিমত, ইত্যাদি গোপন করাই যদি অভিপ্রায় হয়, তাহলে কূটনীতির ভাষায় পারদর্শী হওয়া মন্দ নয়। কারণ, কূটনীতিতে কখনো কখনো কথার মাধ্যমে কথা লুকানোর প্রয়োজন হয়। কাব্যচর্চায় চাই ভাবের অবাধ প্রকাশ।

[PS: আমার এই লেখার দ্বারা কারো মনে আঘাত করা বা কেউকে খাটো করার সামান্যতম দুরভিসন্ধি আমার নেই। আমি কেবল আমার অভিমত ব্যক্ত করলাম। আর আমার অভিমতের অভ্রান্তিও আমি দাবি করি না। এ বিষয়ে সকলেই যে আমার সাথে সহমত পোষণ করবে সে প্রত্যাশাও আমার নাই।]

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন তবে আপনি চাইলে অপ্ট-আউট করতে পারেন Accept আরও পড়ুন