মাদকরাজ্যে ‘বাবাদের’ বাবা টিটি জাফর

71
gb

জিবি নিউজ ২৪

যারা ইয়াবা ব্যবসা করেন, তাদের সাধারণত বলা হয় ‘বাবা কারবারি’। কারণ ইয়াবা বড়ি ‘বাবা’ হিসেবেই এখন বেশি পরিচিত। ইয়াবা সেবনকারীদের বলা হয় ‘বাবাখোর’। গত বছরের মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। বন্দুকযুদ্ধে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন চার শতাধিক। গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই লাখের বেশি। তবু থেমে নেই ইয়াবা কারবার। প্রায়ই ধরা পড়ছে ইয়াবার চালান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক চেষ্টা করেও ইয়াবা কারবারের অর্থ লেনদেনের চ্যানেল বন্ধ করা যায়নি। অবৈধ এ ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা এখনও রয়েছেন বহালতবিয়তে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা ইয়াবার আর্থিক লেনদেনের ৮০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করেন মূলত একজন। তার নাম জাফর আহমেদ ওরফে টিটি জাফর। গ্রামের বাড়ি টেকনাফের জালিয়াপাড়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। দীর্ঘদিন ধরে দুবাই বসেই মিয়ানমারের বড় ইয়াবা কারবারিদের নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। বাংলাদেশে ইয়াবা আনতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এই টিটি জাফর।

র‌্যাবসহ একাধিক সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বলেন, বাবার রাজ্যে টিটি জাফরই বড় গডফাদার। তাকে বলা হয় ‘বাবাদের’ ‘বাবা’। টিটি জাফরকে আইনের আওতায় আনা না গেলে দেশে ইয়াবার কারবার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কীভাবে দুবাই থেকে টিটি জাফরকে দেশে ফেরানো যায়, সে ব্যাপারে সংশ্নিষ্টরা কাজ শুরু করেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের র‌্যাব-১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ সমকালকে বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর আত্মসমর্পণকারী ১০২ কারবারি ২২ হুন্ডি ব্যবসায়ীর নাম জানায়। তাতে এক নম্বরে ছিল টিটি জাফর। পরে তার ব্যাপারে খোঁজ নিলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। মূলত যে প্রক্রিয়ায় ইয়াবার অর্থ হাতবদল হয়, তার ৮০ ভাগের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছেন টিটি জাফর। ইয়াবা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে খুচরা ব্যবসায়ী, বাহক ধরার পাশাপাশি যারা এর পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করেন তাদের সাজা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সবার আগে টিটি জাফরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

সংশ্নিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, চলতি বছরের জুনে কক্সবাজার থেকে এক লাখ ৭০ হাজার পিস ইয়াবাসহ রবিউল নামে এক বড় মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, ইয়াবার ওই চালানে মূল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন দুবাইয়ে অবস্থানরত টিটি জাফর। একইভাবে আরও একাধিক চালান জব্দের পর জানা যায়, মূলত টিটি জাফরই ইয়াবার মূল মালিক।

যেভাবে চলে ইয়াবা কারবার: ইয়াবার অর্থ হাতবদলের ঘটনা অনেকটাই অভিনব। টিটি জাফর মূলত মিয়ানমারের কারবারিদের কাছ থেকে ইয়াবার চালান কেনেন। ওই চালান মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছে দেয় একটি গ্রুপ। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গারা রয়েছে। জুনে জব্দ করা এক লাখ ৭০ হাজার ইয়াবা চালানের ঘটনায় তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, মিয়ানমার থেকে নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত দুই রোহিঙ্গা ইয়াবার ওই চালান পৌঁছে দেয় আলী নামে এক বাঙালির কাছে। আলীর হাতবদল হয়ে সেটা আসে রাসেল নামে আরেকজনের কাছে। এরপর রাসেল তা দীন ইসলাম নামে একজনের কাছে পৌঁছে দেন। দীন ইসলাম ওই চালান কক্সবাজারে রবিউলের কাছে দেন। মিয়ানমার থেকে আসার পর মাঝে যারা চালানটির বাহক হিসেবে কাজ করেছেন, তারা একেকজন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন। কক্সবাজারে পৌঁছার পর চালানটির মালিক হয়ে যান রবিউল। পরে রবিউল ওই চালান বাবদ ৬০ লাখ টাকা বড় বাজারের হুন্ডি ব্যবসায়ী কফিলের কাছে দেন। পূর্বপরিকল্পনা মাফিক কফিল তখন দুবাইয়ে থাকা টিটি জাফরকে জানিয়ে দেন যে ওই চালান বাবদ ৬০ লাখ টাকা তিনি পেয়েছেন। তখন টিটি জাফর কক্সবাজার ও আশপাশ এলাকার যারা সৌদি আরব ও দুবাইয়ে থাকেন, তাদের তালিকা কফিলকে দেন। এরপর কফিলকে প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ৬০ লাখ টাকা বণ্টন করে দিতে বলেন টিটি জাফর। কার পরিবারকে কত দিতে হবে তাও জানিয়ে দেন তিনি। মূলত প্রবাসীদের কাছ থেকে সমপরিমাণ অর্থ টিটি জাফর আগেই বিদেশে তার নিয়োগ করা এজেন্টদের মাধ্যমে তুলে রেখেছেন। এভাবেই হুন্ডি ব্যবসায় ইয়াবার টাকা ঢুকছে। যারা বিদেশ থেকে স্বজনের কাছে অর্থ পাঠাতে চান, তাদের কাছে টিটি জাফরের এজেন্টরা আগে থেকেই পরিচিত। এভাবে ইয়াবার অর্থ রেমিট্যান্স হিসেবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দেশে ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ: ইয়াবা কারবারে টিটি জাফরের এত বড় কানেকশনের বিষয়টি জানার পর তার ব্যাপারে গোয়েন্দারা নড়েচড়ে বসেছেন। জানা গেছে, জাফরের বাবার নাম মৃত মো. হোসেন। বর্তমানে জাফর সপরিবারে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। খুব বেশি দূর পড়াশোনা করেননি তিনি। তবে এরই মধ্যে টাকার কুমির হয়েছেন। তার স্ত্রীর নাম সৈয়দা বেগম। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। টিটি জাফরের সাত ভাইবোন। টেকনাফ থানায় টিটি জাফরের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, টিটি জাফরকে দেশে ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ। জাফরকে ফেরানো গেলে মিয়ানমারের সঙ্গে ইয়াবা কারবারিদের যোগাযোগে বড় ছেদ পড়বে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে মিয়ানমারের ইয়াবা কারবারিদের অর্থ হস্তান্তর করেন জাফর। সে তালিকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কয়েক কর্মকর্তাও রয়েছেন। এদিকে কক্সবাজারের আরেক মাদক কারবারি রবিউলের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে মাদক কেনাবেচার চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। টিটি জাফরের কাছ থেকে পাওয়া চালান রবিউলসহ অন্তত ১০ জন বড় কারবারি কিনে থাকেন। এরপর তারা তা খুচরা বিক্রেতাদের হাতে দেন। একেকটি চালান মিয়ানমার থেকে ঢাকা পর্যন্ত চার থেকে ১২ জনের হাতবদল হয়। একটি চালানে তারা এত লাভ করেন যে, অন্য পাঁচ-সাতটি চালান ধরা পড়লেও লোকসান কাটিয়েও লাভ থাকে তাদের।

কেন প্রবাসীরা টিটি জাফরের কাছে যাচ্ছেন: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টিটি জাফরের এজেন্টদের মাধ্যমে হুন্ডি করে যারা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশ অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থান করছেন। তাই তারা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে পারছেন না। আবার প্রবাসীদের অনেকের ব্যাংক-ভীতি রয়েছে। তাই দেশে টাকা পাঠানোর দরকার হলে সহজ মাধ্যম হিসেবে টিটি জাফরের এজেন্টদের কাছে যান তারা। টাকা দেওয়ার কমিশন বাবদ হুন্ডি কারবারিরা এক লাখে ৪০০ টাকা নিয়ে থাকেন। ২০১৮ সালের ৩ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। এরপর পৃথকভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালায় পুলিশও। মাদকবিরোধী অভিযানে ইতোমধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ চার শতাধিক নিহত, ১০২ জন আত্মসমর্পণ এবং দুই লাখের বেশি গ্রেপ্তারের পরও থেমে নেই ইয়াবার কারবার।

Attachments area

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More