এ দেশে জীবনের দাম বেশি না ভিআইপিদের দাম বেশি

221

মো:নাসির, বিশেষ প্রতিনিধি জিবি নিউজ ২৪||

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ। উন্নত চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনা হচ্ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন(এটুআই) প্রকল্পের যুগ্মসচিব আব্দুস সবুর মন্ডলের গাড়ি না আসায় ফেরি ছাড়তে ৩ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এমনকি প্রতিকার মেলেনি জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেও। অবশেষে ফেরি ছাড়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই প্রাণ হারান তিতাস। বৃহস্পতিবার রাতে এ হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ১নং ফেরি ঘাটে।

নিহত তিতাস ঘোষ (১১)। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পৌর এলাকার মৃত তাপস ঘোষের ছেলে এবং কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল। বিআইডব্লিউটিসি কাঁঠালবাড়ী ঘাট সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় দিকে মাদারীপুরের কাঠালবাড়ী ১নং ফেরিঘাটে পৌঁছায় আইসিইউ সম্বলিত একটি অ্যাম্বুলেন্স। তখন কুমিল্লা নামের ফেরিটি ওই ঘাটেই ছিল। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা স্বজনরা ঘাটের কর্মকর্তাদের ফেরি ছাড়তে অনুরোধ জানায়। ঠিক ওই সময়ই মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ঘাট কর্তৃপক্ষকে একটি জরুরী বার্তা পাঠায় সরকারি একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ফেরি পদ্মা পাড়ি দিবে। তাই ১ নং ফেরিঘাটে থাকা ফেরিটি যেন আগে না ছেড়ে যায়। তাই ঘাট কর্তৃপক্ষ ওই কর্মকর্তার গাড়ি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়তে রাজি হননি।

এদিকে স্বজনদের অভিযোগ, ভিআইপি আসার অপেক্ষায় প্রায় ৩ ঘণ্টা ঘাটেই বসে ছিল ফেরি। আশপাশের লোকজনের অনুরোধের পরও কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে ফেরি ছাড়েনি। এমনকি সরকারি জরুরী সেবা পেতে ৯৯৯ নম্বর ফোন করেও মেলেনি প্রতিকার। জানতে চাইলে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুঠোফোন বলেন, সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আব্দুল সবুর মন্ডল পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাচ্ছিল। সে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে যাওয়ার আগে আমার কাছে ফেরিতে যাওয়ার বিষয়টি জানায়। পরে আমি ঘাটের ব্যবস্থাপক সালামকে ভিআইপি ফেরিতে ওঠার বিষয়ে বার্তা পাঠাই। কিন্তু ওই ঘাটে অ্যাম্বুলেন্সে একজন গুরতর আহত অবস্থায় রোগী আছেন তা আমি জানতাম না। বা আমাকে ঘাটের ম্যানেজার এ বিষয় কিছু জানানো হয়নি। পরে আজই বিষয়টি জানতে পারলাম।

সরকারি কর্মকর্তা বা ভিআইপিদের জন্য ফেরি আগে থেকেই অপেক্ষা থাকার কোন নিয়ম রয়েছে কিনা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি চাঁদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক। এছাড়াও তিনি যুগ্ম সচিব। তাই তাকে ভিআইপি বলা যায়। এই ধরণের কর্মকর্তারা এই নৌপথে এলে তাদের বিশেষভাবে গুরুত্ব আগে থেকেই দেয়া হচ্ছে।

এই বিষয় বিআইডব্লিউটিসি কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. সালাম হোসেন মিয়া বলেন, ডিসি স্যার ফোন দিয়ে রাতে জানায় ভিআইপি যাবে। তবে আমি তখন ঘাটে ছিলাম না। আমাদের স্টাফকে বলে দেই ভিআইপি আসার কথা। পরে সেখানে কি হয় তা আমার জানা নেই।

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে পদ্মা নদীতে স্রোত বেশি থাকায় ফেরি পারাপারে দ্বিগুণ সময় লাগে। এছাড়াও রাতে তেমন একটা ফেরি চলে না। তাই ঘাটে যানজট কমবেশি থাকেই। তবে আমরা অ্যাম্বুলেন্সসহ সাধারণ যাত্রীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপারের ব্যবস্থা করে দেই।

তিতাসের স্বজনরা জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ায় প্রথমে ভর্তি খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বৃহস্পতিবার রাতেই তাকে নেয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালের পাঠায় চিকিৎসক। চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখে দ্রুত ঢাকায় পৌঁছাতে অর্ধলাখ টাকায় ভাড়া করা হয় আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্সটি ঘাটে আসে থামে রাত ৮টার দিকে। ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য সাহায্য চান ঘাট কর্তৃপক্ষ, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাছে। তিন ঘণ্টা অপেক্ষা থাকার পরে রাত পৌনে ১১ টার দিকে সাদা রঙের নোহা মাইক্রোবাসটি ফেরিতে ওঠার পরে ছাড়া হয় ফেরি। পরে ফেরি ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই মাঝ নদীতে মারা যায় তিতাস। তিতাসের বড় বোন তন্নীসা ঘোষ বলেন, আমার ভাইর জীবন কেড়ে নিল ভিআইপি। এ দেশে জীবনের দাম বেশি না ভিআইপিদের দাম বেশি?

তিতাসের মা সোনামনি ঘোষ তিতাসের কথা জানতে চাইলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, বাবা তোমাগো কাছে বললে কি আমার পেলারে পামু? ওরা আমার পোলারে মেরে ফেলছে? আমি ফেরি আলাগো পায় ধরছি, তবুও ওরা ছারে নাই। ফেরি ঠিক মতন গেলে হয়তো পোলাডা বাইচা জাইতো।

নিহতের মামা বিজয় ঘোষ বলেন, আমার ভাগ্নে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ায় আমরা তার চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঘাটে এসেই সব যে এভাবে শেষ হয়ে যাবে তা ভাবলেই বুকটা ছিড়ে ওঠে। আমার বোনে ফেরির লোকেদের পায় ধরে মাটিতে পড়ে কাঁদছে। তবুও ওরা ফেরি ছাড়েনি। উল্টো বলেছে ফেরি ছাড়লে নাকি তাদের চাকরি থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, ফেরির লোকদের কাছে জিজ্ঞাস করলে তারা বলে মন্ত্রী আসবে। ভিআইপি আসবে। আমাদের রোগী যে মরে যাচ্ছে সেদিকে তাদের কোন নজর নেই। কোন সহযোগিতা না পেয়ে দিলাম ৯৯৯ কল। কিন্তু সেখানেও কোন কাজ হলো না।