মিশিগানে রিপাবলিকানদের হাতিয়ার ‘ইসলামবিদ্বেষ’

মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে আমেরিকার রাজনীতিতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা। আর এই প্রচারযুদ্ধে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা পাল্টাপাল্টি আক্রমণে নেমেছেন।

যাকে যেভাবে কাবু করা যায়, সব অস্ত্র প্রয়োগে ভুল করছেন না কেউই। তবে মিশিগানে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে রিপাবলিকানদের মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছে ধর্ম। মিশিগানে সিনেটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদকে ভোট না দেওয়ার পক্ষে রিপাবলিকানদের যুক্তিগুলো বিপজ্জনকভাবে এই রূপ ধারণ করছে যে, ‘তিনি একজন মুসলিম, তাই তাকে ভোট দেবেন না।’

 

মিশিগানে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে যে তীব্র ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে, তা আধুনিক যেকোনো নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক; কেউ কেউ একে ধর্মান্ধতা বা কুসংস্কারও বলতে পারেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স এবং ওহাইওর সিনেটর বার্নি মোরেনোর লক্ষ্য খুবই স্পষ্ট বলে মনে হচ্ছে- সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণী এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে এল-সায়েদকে একজন ‘অ-আমেরিকান’ এবং সরকারি পদের জন্য ‘অনুপযুক্ত’ হিসেবে চিত্রিত করা।

 

তবে মিশিগানে রিপাবলিকানদের এই কুৎসিত কৌশলটি কেবল একক কোনো লড়াই বা বড় রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়েও অনেক গভীরে পৌছে গেছে। এটি এমন একজন প্রেসিডেন্টের ভাষা ও কর্মের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়, যিনি তার প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকেই মুসলিমদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির চেষ্টা করেছিলেন এবং যিনি তার পূর্বসূরি কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার কথা বলার সময় তার মধ্যনাম ‘হুসেইন’ উল্লেখ করতে ভুলতেন না।

ট্রাম্প প্রায়শই সবচেয়ে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও বর্ণবাদী বক্তব্যকে উসকে দেন; ঠিক যেমনটা এখন করছেন।

মূলত, এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে কোনোভাবে কম খাঁটি আমেরিকান হিসেবে উপস্থাপন করা। এল-সায়েদের ওপর প্রয়োগ করা এই কৌশলটি কেবল নির্বাচনী ভীতি প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সাংবিধানিক নীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে আমেরিকার ধর্মীয় ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে মূলধারা হিসেবে দেখা জনগোষ্ঠীর মধ্যকার গভীর বিভাজনকে প্রকাশ করে।

 

এল-সায়েদকে নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো ব্যক্তিগত আক্রমণ ছাড়িয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে উপহাস ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের পর্যায়ে চলে গেছে—যা প্রকারান্তরে এই বিশ্বাসের অনুসারী প্রতিটি আমেরিকানকেও আঘাত করে। তিনি এল-সায়েদকে ‘জিহাদি’ বলে ডেকেছেন; দাবি করেছেন তিনি নির্বাচিত হলে সিনেটে মেটাল ডিটেক্টর বসাতে হবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তার নাম বিকৃত করে ‘মোহাম্মদ’ এবং ‘আব্দুল রমজান’ বলে সম্বোধন করেছেন।

ট্রাম্প মূলত একজন মুসলিম হওয়াকে ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদের সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবার তিনি তার সেই চিরচেনা রূপক বক্তব্যে ফিরে যান; যেখানে দাবি করা হয় যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রাজনীতিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতিগত বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে। ট্রাম্প বলেন, ‘আপনি যদি কৃষ্ণাঙ্গ বা ইহুদি হন এবং আব্দুলকে ভোট দেন, তবে আপনি পাগল।’

 

মিশিগানে আব্দুল এল-সায়েদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাঈক রজার্স অবশ্য সাধারণভাবে ইসলাম ধর্মকে কালিমালিপ্ত করা থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিরত থেকেছেন। তিনি বলেছেন যে মুসলিমরা যাতে তাদের ইচ্ছামতো উপাসনা করার স্বাধীনতা পায়, তা রক্ষা করতেই তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরেছিলেন। তিনি এল-সায়েদের নাম বা ধর্ম নিয়ে উপহাস না করে তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। তবে তাদের শেষ বিতর্কে রজার্স দাবি করেন যে, মিসরের ইসলামপন্থী সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে এল-সায়েদের যোগসূত্র রয়েছে এবং তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। রজার্স জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি আমেরিকার পক্ষে, নাকি বিদেশের এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে?’ এল-সায়েদ অবশ্য এই সংগঠনের সাথে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন।

তবে বুধবার ওহাইওতে ট্রাম্পের এক সমাবেশে সব ধরনের রাখঢাক ফেলে দেন সিনেটর বার্নি মোরেনো। এল-সায়েদ একজন সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসীদের সমার্থনকারী; এমন সমালোচনার ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি কার্যত যুক্তি দেন যে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই তাকে সরকারি পদে বসার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। মোরেনো বলেন, ’এই আব্দুল এল-সায়েদ চরিত্রটি ওয়াশিংটন ডিসির আশেপাশেও থাকতে পারে না।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘আপনারা কি মনে করেন, সে এই ধারণাটি বোঝে যে আমাদের অধিকার সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে, যীশু আমাদের মুক্তির জন্য এখানে এসেছিলেন? সে ওয়াশিংটন ডিসির আশেপাশে থাকার যোগ্য নয় এবং ইক রজার্স আগামী মঙ্গলবার তাকে উচিত শিক্ষা দিতে যাচ্ছেন।’

অথচ মার্কিন সংবিধানের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ’যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে কোনো সরকারি পদ বা জনস্বার্থের দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে কোনো ধর্মীয় পরীক্ষা কখনোই বাধ্যতামূলক করা যাবে না।’ 
এছাড়া প্রথম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ’কংগ্রেস ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না।’ এল-সায়েদের বিপরীতে, মোরেনো নিজে কিন্তু আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেননি—তিনি কলম্বিয়া থেকে আসা একজন নাগরিক। তারপরও তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মিশিগানের সিনেট পদপ্রার্থী খ্রিস্টান না হওয়ায় সমান অধিকার পাওয়ার যোগ্য নন। এমন দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর হলে তা ইহুদি, হিন্দু ও বৌদ্ধদেরও সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে বঞ্চিত করতে পারে, যারা বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং ‘দ্য ওথ অ্যান্ড দ্য অফিস’ পডকাস্টের সঞ্চালক কোরি ব্রেটশ্নাইডার বলেন, এল-সায়েদবিরোধী এই আক্রমণাত্মক বক্তব্যের একটি উদ্বেগজনক সাংবিধানিক প্রভাব রয়েছে, ‘আপনি যখন বলছেন যে আমরা মুসলিমদের বিশ্বাস করতে পারি না এবং কংগ্রেসের অন্য সবার মতো না হয়ে তাকে ভেতরে ঢুকতে মেটাল ডিটেক্টর পার হতে হবে; তখন এটি সরকারি পদের জন্য একটি ধর্মীয় পরীক্ষা নেওয়ার চেয়ে কম কিছু নয়।’

মোরেনোর সমর্থকেরা হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ব্যবহৃত ‘স্রষ্টা’ শব্দটির দিকে ইঙ্গিত করে যুক্তি দিতে পারেন যে; প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই যেহেতু বিশ্বাসী ছিলেন, তাই তারা এই নতুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করেছিলেন। তবে ব্রেটশ্নাইডার উল্লেখ করেন যে, জর্জ ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতারা বিশেষভাবে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যাতে দেশে কোনো রাষ্ট্রধর্ম না থাকে। ব্রেটশ্নাইডার বলেন, ‘আমি মনে করি না যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল রচয়িতা  জেফারসন একজন খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী ছিলেন। এমনকি সংবিধানের প্রণেতারা এবং এই দলিলটি নিজেই স্পষ্টভাবে খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদের বিরোধী। এটি মূলত ধর্মতন্ত্র একটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান।’

মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগেও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন এল-সায়েদ। রিপাবলিকানরা এল-সায়েদের সৎবোনের পুরনো কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট আঁকড়ে ধরেছেন, যেখানে বর্ণনা করা হয়েছিল যে তাদের মা; যিনি এল-সায়েদের শৈশবেই তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে; ৭০-এর দশকে এই সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। এল-সায়েদ ২০১১ সালে ‘হাফপোস্ট’-এ একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন যেখানে তিনি যুক্তি দেন যে মিসরের নির্মম সামরিক শাসকদের পরিবর্তে যদি মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতা গ্রহণ করে, তবে তার ফলাফল অনেকের ভাবনার চেয়েও বেশি ইতিবাচক হতে পারে। এই সবকিছুই ঘটেছিল ‘আরব বসন্ত’ গণজাগরণের প্রেক্ষাপটে, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে স্বৈরাচারী সরকারগুলোর পতন ঘটছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো বিরোধী দলগুলো বিকল্প হিসেবে সামনে আসছিল।

মিশিগানের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এই জটিল প্রেক্ষাপটটি প্রায়শই হারিয়ে যায়। আর যেহেতু অনেক ভোটারই এই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তাই রিপাবলিকানরা ব্রাদারহুডকে মধ্যপ্রাচ্যের গোষ্ঠীগুলোর একটি অস্পষ্ট প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন, যা শুনতে বেশ হুমকিস্বরূপ মনে হয়।

চলতি মাসের শুরুতে এক টাউন হল সভায় এল-সায়েদ একজন প্রশ্নকর্তাকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেন, যিনি ধরে নিয়েছিলেন যে ‘আমি মুসলিম বলেই কোনোভাবে আমাদের সংবিধানের বাইরে অন্য কিছুর প্রতি আমার আনুগত্য থাকবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার কাছে, সেই সংবিধানই হলো পথপ্রদর্শক আলো।’

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি নতুন সিএনএন/এসএসআরএস জরিপ সন্দেহ তৈরি করেছে যে একটি বড় মুসলিম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রাজ্যে ধর্মীয় এই আক্রমণগুলো আদৌ কাজ করছে কি না। জরিপে এল-সায়েদ ৪৯ ভাগ এবং রজার্স ৪২ ভাগ মানুষের সমর্থন পেয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত কে জিতবেন তা নির্ধারিত হবে আগামী মঙ্গলবার। তবে মিশিগানের এই নির্বাচনী লড়াই মার্কিন রাজনীতিতে একটা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত রেখে যাবে। এটি রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যকার সাধারণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের চেয়েও গভীর এক বিতর্কে রূপ নিয়েছে—যা ধর্মীয় বৈচিত্র্য, বহুত্ববাদ এবং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের একটি মঞ্চ হয়ে উঠেছে। পরিশেষে, এটি একটি চিরন্তন রাজনৈতিক প্রশ্নে নতুন এক ফ্রন্ট উন্মোচন করেছে : একজন আমেরিকান হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী?

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন