অগ্নিপথের যাযাবর: রোমানিয়ান রোমাদের সহস্রাব্দের দহন ও দর্পণ

কাজল রশীদ ||

রোমানিয়ার ধূলিধূসরিত পথপ্রান্ত থেকে কার্পেথিয়ান পাহাড়ের পাদদেশ, যেখানে যাযাবর বাতাসের গায়ে লেগে থাকে সুদূর অতীতের ঘ্রাণ, সেখানেই মিশে আছে 'রোমা' বা 'রোমানি' জাতির এক দীর্ঘ, বেদনাবিধুর অথচ অজেয় মহাকাব্য। একে আমি কোনো শুষ্ক ইতিহাস বলব না, বরং বলব এক রক্তাক্ত মানচিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে আসা এক যাযাবর জাতির পদচিহ্ন, যা শুরু হয়েছিল ভারতের সিন্ধু নদের অববাহিকায় এবং আজও যার শেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগের কথা। যখন ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে,আজকের রাজস্থান বা পাঞ্জাবের রুক্ষ ধুলোয় সূর্যাস্ত নামত, তখন একদল মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল। কেন তারা বেরিয়েছিল? সে কি কোনো রাজকীয় আজ্ঞা, নাকি গজনীর সুলতানি আক্রমণের সেই ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচার তাগিদ? ইতিহাস সেখানে অস্পষ্ট, কিন্তু তাদের ভাষায় আজও রয়ে গেছে সেই শিকড়ের প্রমাণ।
রোমানি ভাষায় যখন কেউ বলে—'Ek, Dui, Trin', তখন মনে হয় গঙ্গা বা সিন্ধুর পাড়ের কোনো হাটে বসে কথা বলছি। তাদের রক্তে মিশে আছে জাট, রাজপুত বা ডোমদের আদিম সুর। তারা যখন ভারত ছাড়ল, তাদের সাথে ছিল কেবল আগুনের শিল্প, কামারের হাতুড়ি আর সুরের মূর্ছনা। তারা মধ্যপ্রাচ্য হয়ে তুরস্কের পথ ধরে যখন বলকান অঞ্চলে পৌঁছাল, তখন তারা ছিল এক নতুন পৃথিবীর অতিথি। কিন্তু ইউরোপ তাদের 'অতিথি' হিসেবে গ্রহণ করেনি।
চৌদ্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রোমারা যখন আজকের রোমানিয়া ভূখণ্ডে (তৎকালীন ওয়ালাচিয়া ও মোলদাভিয়া) প্রবেশ করল, তাদের কপালে জুটল দাসত্বের তিলক। ইতিহাস বইয়ের পাতায় অনেক সময় এই অধ্যায়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়, কিন্তু সত্য এই যে, প্রায় পাঁচশ বছর (১৮৫৬ সাল পর্যন্ত) রোমারা রোমানিয়াতে ছিল স্থাবর সম্পত্তি বা 'ক্রীতদাস'।
চার্চের পাদ্রি থেকে শুরু করে বড় বড় ভূস্বামী বা 'বোয়ার'দের কাছে তারা ছিল কেনাবেচার পণ্য। কোনো রোমা পরিবারের সন্তান হলে তাকেও সেই প্রভুর অধীনেই দাসত্ব করতে হতো। তারা ছিল পৃথিবীর সেই দুর্ভাগা যাযাবর, যারা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়েছিল, অথচ রোমানিয়ার মাটিতে তারা শৃঙ্খলিত হয়ে রইল শতাব্দীর পর শতাব্দী। ১৮৫৬ সালে যখন দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলো, তখন তারা পেল নামমাত্র স্বাধীনতা; না ছিল জমি, না ছিল মাথার ওপর ছাদ। সেই নিঃস্ব অবস্থাই জন্ম দিল এক চিরস্থায়ী দারিদ্র্যের।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপ যখন নাৎসিবাদের বিষবাষ্পে নীল হয়ে উঠল, তখন ইহুদিদের পাশাপাশি রোমারাও ছিল সেই নির্মূল অভিযানের লক্ষ্য। রোমানিয়ার তৎকালীন স্বৈরশাসক ইয়ন আন্তোনেস্কুর নির্দেশে হাজারে হাজারে রোমাকে ঘোড়ার গাড়িতে তুলে নির্বাসিত করা হয়েছিল ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার জনশূন্য প্রান্তরে। সেই যাত্রাকে তারা বলে 'পোররাজমোস' (Porajmos)—যার অর্থ 'ধ্বংস' বা 'সর্বগ্রাস'। ক্ষুধার জ্বালায় মৃত মায়ের পাশে বসে থাকা শিশুর কান্না সেদিন কার্পেথিয়ান পাহাড়ের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছিল। প্রায় আড়াই থেকে পাঁচ লাখ রোমা সেই সময় অকালে প্রাণ হারিয়েছিল।
রক্ত আর কান্নার মাঝেও রোমারা তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে সুরের মাধ্যমে। রোমানিয়ার রোমারা কেবল যাযাবর নয়, তারা হচ্ছে সুরের জাদুকর। তাদের 'লাউতারি' (Lăutari) সংগীতধারা ইউরোপের ধ্রুপদী সংগীতকেও হার মানায়। ভায়োলিন আর সিম্বলমের সেই দ্রুত লয় যখন বাজে, তখন মনে হয় যেন হৃদপিণ্ড থমকে যাবে।
তাদের উৎসবগুলো যেন রঙের মেলা। লাল-হলুদ-সবুজ ঘাগরার ঘূর্ণি আর পুরুষদের উঁচু টুপির আভিজাত্যে তারা বুঝিয়ে দেয়, অভাব থাকলেও তাদের আভিজাত্য কমেনি। তাদের সমাজে আজও আছে 'ক্রিস' (Kris)—যা তাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা। আজও অনেক রোমা নিজেদের আদি পেশা অনুযায়ী 'কামার', 'রূপার কারিগর' বা 'পশুপালক' হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে।
কমিউনিস্ট শাসনের পতনের পর রোমানিয়া আধুনিক ইউরোপের অংশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রোমাদের ভাগ্য বদলানোর গতি বড় ধীর। আজও বুখারেস্টের বস্তিগুলোতে বা ছোট ছোট গ্রামের ভাঙা ঘরে তারা প্রান্তিক মানুষ হিসেবে বেঁচে আছে। স্কুল-কলেজে রোমা শিশুদের আজও অনেক সময় আলাদা চোখে দেখা হয়। কিন্তু এরই মাঝে জেগে উঠছে এক নতুন প্রজন্ম। যারা রোমানি ভাষাকে আঁকড়ে ধরছে, যারা ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গিয়ে নিজেদের অধিকারের কথা বলছে।
রোমানিয়ার রোমারা কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা এক জ্বলন্ত ইতিহাস। তারা সেই ধুলোবালি মাখা পথিক, যারা হাজার বছর আগে ভারতের এক নদীপাড় থেকে যাত্রা শুরু করে সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। তাদের চামড়ায় লেগে আছে ইউরোপের রোদ, কিন্তু তাদের গানে আজও লুকিয়ে আছে গঙ্গা-যমুনার প্রাচীন সুর।
রোমানিয়ার প্রতিটি গির্জা বা প্রাসাদের পাথরের নিচে হয়তো কোনো এক নামহীন রোমা দাসের ঘাম লেগে আছে। তারা ছিল, তারা আছে এবং তারা হয়তো চিরকালই থাকবে, সমাজের মূলধারার পাশে এক সমান্তরাল মহাকাব্য হয়ে। তাদের জীবন আমাদের শেখায় যে, শিকড় ছিঁড়ে গেলেও মানুষ তার গান হারায় না।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন