ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : আল্লাহর স্মরণেই পারিবারিক জীবনে আসে শান্তি ও ভালোবাসা

শায়খ আবদুল কাইয়ুম ||

পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আবদুল কাইয়ুম। তিনি ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার খুতবায় কথাগুলো বলেন।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম বলেছেন, পরিবার ও পারিবারিক জীবন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একটি মহান নেয়ামত । একটি ঘর কেবল চার দেয়াল ও ছাদের সমষ্টি নয়; বরং তা হওয়া উচিত শান্তি, ভালোবাসা, মমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে তোমাদের জন্য বিশ্রামের স্থান করেছেন।” (সুরা আন-নাহল, ১৬:৮০)। এখানে ব্যবহৃত সাকান শব্দটি সুকুন থেকে এসেছে, যার অর্থ শান্তি, স্বস্তি ও প্রশান্তি।

তিনি বলেন, একটি বাড়ি অনেক বড় ও সুন্দর হতে পারে, দামি আসবাবপত্রে পরিপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু সেখানে যদি পারিবারিক শান্তি, ভালোবাসা ও সুসম্পর্ক না থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে প্রশান্তির ঘর নয়। আবার ছোট ও সাধারণ একটি ঘরেও যদি ভালোবাসা, সম্মান ও আল্লাহর স্মরণ থাকে, তাহলে সেটিই প্রকৃত সুখের আবাস হতে পারে।

দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; আর তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” (সুরা আর-রূম, ৩০:২১)।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম বলেন, আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—আমাদের ঘরে কি সেই প্রশান্তি, ভালোবাসা ও রহমত আছে? কারণ শয়তান পরিবারের মধ্যে বিভেদ, ঝগড়া-বিবাদ ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে চায়। আল্লাহর স্মরণ থেকে পরিবার যত দূরে যায়, শয়তানের প্রভাব তত বাড়তে থাকে।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ঘরে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যে ঘরে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় না, এ দুই ঘরের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো। তাই ঘরে কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, যিকির ও ইবাদতের পরিবেশ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না।” এর অর্থ হলো ঘরেও সালাত, নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণের পরিবেশ থাকতে হবে।

সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও ঘুমের আগের দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তারা যদি ছোটবেলা থেকেই কুরআন, সালাত ও দোয়ার পরিবেশে বড় হয়, তাহলে তা তাদের জীবনের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, শুধু ইবাদত করলেই হবে না; পরিবারের সদস্যদের একে অন্যের প্রতি দয়ালু, সহনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।

তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া, ছাড় দেওয়া ও সুন্দর আচরণ। সংসার শুধু নিজের ইচ্ছা প্রতিষ্ঠার জায়গা নয়; বরং একে অন্যের হক আদায় এবং ভালোবাসার সঙ্গে পথ চলার নাম।

বর্তমান সমাজে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সন্তান ছোটবেলায় বাবা-মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। বর্তমান সমাজের অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা এর একটি বড় কারণ। তাই পরিবারে ইসলামি মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও আত্মীয়তার বন্ধন শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম বলেন, সন্তানদের জন্য শুধু বাড়ি, সম্পদ বা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ নয়। বরং তাদের দ্বীনদার, সৎ, দায়িত্বশীল ও ভালো চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই মা-বাবার প্রকৃত বিনিয়োগ।

তিনি বলেন, মা-বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও সন্তানদের সালাত, সৎকর্ম এবং মা-বাবার জন্য করা দোয়া তাদের জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে।

সবশেষে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের ঘরগুলোকে শান্তি ও প্রশান্তির আবাসস্থল করেন, তাঁর স্মরণে ঘরগুলোকে জীবন্ত রাখেন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আমাদের পরিবারকে রক্ষা করেন ।

শায়খ আবদুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জু'মার খুতবা, ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ২০২৬।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন