লন্ডন, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের ৫০ বছরের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন, ত্যাগ ও সাফল্যের ইতিহাস নিয়ে রচিত ‘স্টোরিজ অব স্ট্রাগলস অ্যান্ড স্ট্রাইডস’ গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য এটি একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এ ধরনের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করলে সময়ের সঙ্গে তা হারিয়ে যাওয়ার কিংবা বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের প্রকৃত অবদান সম্পর্কে জানতে পারে না। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, ‘স্টোরিজ অব স্ট্রাগলস অ্যান্ড স্ট্রাইডস’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে।

১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে আয়োজিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিকার ব্যারিস্টার মোশতাক আহমদ, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা রাজন উদ্দিন জালাল, ব্যারোনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দিন এবং কমিউনিটি নেত্রী আলমা চৌধুরী।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জেরেমি করবিন এমপির অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তিনি যোগ দিতে পারেননি। তাঁর পক্ষে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন তাঁর কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজার তালাল কারিম।
ইস্ট এন্ড কানেকশনের স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান সয়ফুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের ট্রাস্টি বদরুল আলম এবং প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ আহমদ উল্লাহ দোলা। শেষদিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন সিরাজুল ইসলাম জোয়ার্দার।
স্পিকার মোশতাক আহমদ বইটির প্রকাশনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আপনারা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। এমন সব স্মৃতিকে সংরক্ষণ করেছেন, যেগুলো হয়তো একদিন হারিয়ে যেত। সেগুলোকে বেঁচে থাকার একটি স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছেন।” এ উদ্যোগে সহায়তার জন্য তিনি ন্যাশনাল লটারি হেরিটেজ ফান্ডকেও ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, “আজ রাতে আমরা শুধু একটি বইয়ের প্রকাশনা উদযাপন করছি না; আমরা স্মৃতি সংরক্ষণ করছি। আমরা বলছি—এই জীবনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এই সংগ্রামগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এই ত্যাগগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব গল্প পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “আসুন আমরা সংগ্রামকে উদযাপন করি, অগ্রযাত্রাকে উদযাপন করি, আমাদের পূর্বসূরিদের সম্মান জানাই এবং নিশ্চিত করি—তাঁদের গল্প যেন বলা হতে থাকে। আসুন, টাওয়ার হ্যামলেটসকে ভালোবাসি, টাওয়ার হ্যামলেটসকে নিয়ে গর্ব করি। আমরা অতীতেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, ভবিষ্যতেও হবো; তবে আমরা সেই চ্যালেঞ্জের সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবো।
রাজন উদ্দিন জালাল বলেন, বাংলাদেশিরা একসময় কঠিন সময় পার করেছেন। তারা প্রতিদিন বর্ণবাদী হামলার শিকার হতেন। নিজেদের ঘর, রাস্তা, স্কুল কিংবা কর্মস্থল—কোথাও তারা নিরাপদ ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করত এবং বর্ণবাদী সহিংসতার শিকারদেরই অপরাধী হিসেবে দেখত।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর লন্ডনে বর্ণবাদীদের বড় সমাবেশ হয়েছে। এতে পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো বর্ণবাদী বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক । সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প, ইলন মাস্ক ইউকেতে বর্ণবাদ ও ঘৃণাজনিত মতবাদ রপ্তানি করছে । নাইজেল ফারাজ ঘৃণা ও ইসলাম বিদ্বেষকে উসকে দিতে ইডিএলকে ফিরিয়ে আনছে। তাদের সবচেয়ে বড় সমর্থক হচ্ছে মুলধারার রাজনীতি ও মিডিয়া। তবে আমাদের কমিউনিটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এখনও সোচ্চার। ২০২৫ সালে যখন বর্ণবাদীরা হোয়াটচ্যাপেলে আসার হুমকি দেয় তখন কমিউনিটির দশ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ সমাবেশ করে তাদের হুমকি রুখে দিয়েছিলো । এরপর পুলিশ তাদেরকে ফিরে আসার অনুমতি দেয়নি । সুতরা, আমাদেরকে সবসময়ই বর্ণবাদ, ফ্যাসিজম ও ইসলাম বিদ্বেষ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের কমিউনিটিকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
বদরুল আলম বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসও অনেক সময় বদলে যায়। তাই ইতিহাসকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছি সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে। ইতিহাস যেন পরিবর্তিত না হয়, প্রত্যেকের অবদান যেন সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয় এবং পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারে—কমিউনিটি গড়ে তুলতে কার কী অবদান ছিল।”
উল্লেখ্য, ৬৬৮ পৃষ্ঠার বইটির মোড়ক উন্মোচনের পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের একটি করে কপি প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৪ শত অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত টাউন হলে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবনসংগ্রাম ও কমিউনিটি গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন