বিরোধী দল সমালোচনা করতে পারবে বাধা দেব না

‘আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন সৈয়দ আশরাফ’

103
gb

গণতান্ত্রিক ধারায় সমালোচনা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ- এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি বিরোধী দলের সদস্যদের আশ্বাস দিতে পারি যে তারা তাদের সমালোচনা যথাযথভাবে করতে পারবেন। এখানে আমরা কোনো বাধা সৃষ্টি করব না। কোনো দিন বাধা আমরা দেইনি, দেবও না।’

বুধবার একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম নবনির্বাচিত স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু আলোচনায় অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা নবনির্বাচিত স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আশা করি এই সংসদও কার্যকর হবে। প্রাণবন্ত হবে। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হবে বর্তমান সংসদ। তিনি এ সময় বিরোধী দলের সদস্যদেরও অভিনন্দন জানান।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আমরা একটা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। কারণ এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ, মা-বোনেরা, প্রথম যারা ভোটার তারা, তরুণ ভোটার- সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। একটি সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।’

স্পিকারের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ নেতা হিসেবে আমার দায়িত্ব সংসদের সব সদস্যের অধিকার যেমন দেখা এবং সেই সঙ্গে আপনি স্পিকার হিসেবে সব সদস্য যাতে সমানভাবে সুযোগ পান; এখানে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই যেন সমান সুযোগ পায়, অবশ্যই আপনি সেটা দেখবেন। এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে সবরকম সহযোগিতা করব।’

সংসদ নেতা বলেন, ‘গণতন্ত্রই একটি দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর তা আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রমাণিত সত্য। আজ আমরা আর্থ-সামাজিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছি। এ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশের জনগণকে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্ন, যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি এ দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা আমরা ইনশাআল্লাহ গড়ে তুলব- এটাই আমাদের লক্ষ্য।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ যেহেতু ভোট দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত করে এবং আমরা যারা প্রতিনিধি বসেছি, সবাই কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছি। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে আমরা আমাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করব।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, আমাদের ভোটাররা, যারা নির্বাচিত করে এখানে পাঠিয়েছেন, তাদের সার্বিক উন্নয়ন, তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দেশে যেন একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ জঙ্গিমুক্ত, মাদকমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ যেন গড়ে ওঠে এবং দেশের মানুষের জীবনে যেন শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, সেটাই আমাদের সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অতীতে একটা চমৎকার পরিবেশে সংসদ পরিচালিত হয়েছিল বলেই আমরা মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলাম। আবার যেহেতু সংসদে নির্বাচিত হয়ে এসেছি, অবশ্যই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করে বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। এটাই আমাদের লক্ষ্য।’

তিনি বলেন, ‘এই সংসদে বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। আজ সেই সংসদ আপনাকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করেছে এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে আমাদের ফজলে রাব্বী সাহেবকে নির্বাচিত করেছে। আমি আপনাকে এবং ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

এছড়া বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের নবনির্বাচিত স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘সংখ্যায় কম হলেও আমরা মনে করি, সঠিকভাবে আমাদের কথা এখানে তুলে ধরতে পারলে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে। মানুষ সংসদকে গুরুত্ব দেবে। সংসদ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।’

তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আমরা সংসদে কথা বলব। সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরব। আমাদের কথা গুরুত্ব দিলে সংসদ প্রাণবন্ত ও কার্যকর হবে।’

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা একটি সোনালি যুগে প্রবেশ করেছি। তার নেতৃত্বে সরকারের এ উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।’

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমরা সরকারে না বিরোধী দলে- চারিদিকে এ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা অতীতের মতো আগামী দিনেও কার্যকর ভূমিকা পালন করব।’ হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আমরা বিপুল বিজয় অর্জন করেছি। এ জয়কে সংহত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’

এর আগে আলোচনার সূত্রপাত করে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘সংসদ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। জাতীয় সংসদ কার্যকর রাখতে স্পিকারের ভূমিকাই মুখ্য। তাই স্পিকার নিরপেক্ষ থাকবেন- এমনটাই মানুষ আশা করেন।’

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘স্পিকারের নিরপেক্ষ আচরণ গণতন্ত্রকে সুসংহত করে। আমরা আশা করব, এই সংসদকে কার্যকর করতে আপনি সবরকম উদ্যোগ নেবেন।’

আশরাফকে নিজের ভাইয়ের মতোই দেখতাম : প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, সৈয়দ আশরাফকে নিজের ভাইয়ের মতোই দেখতাম। সৈয়দ আশরাফ অত্যন্ত সৎ ও মেধাবী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। সে আমার পরিবারের সদস্যদের মতো ছিল, আমাকে বড় বোনের মতো শ্রদ্ধা করত।

জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদজ্ঞাপনের পর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব আনা হয়। এরপর সংসদে তার জীবনীর ওপর আলোচনা হয়। তার সম্মানে সংসদের বৈঠক ৩৫ মিনিট মুলতবি রাখা হয়।

শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে সে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অসাধারণ মেধাসম্পন্ন নেতা ছিল সৈয়দ আশরাফ।

তিনি বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের’ সময় আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিল সৈয়দ আশরাফ। আজ আমরা যে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি, সেক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফেরও বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। অসম্ভব সোজাসরল ছিল সে। ভাইদের হারিয়ে যে ক’জনকে ভাইয়ের মতো পেয়েছিলাম, সৈয়দ আশরাফ তাদের একজন। তার বাবা দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সৈয়দ আশরাফও দীর্ঘদিন মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সবসময় অসম্ভব সৎ জীবনযাপন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওর টাকা নেই, পয়সা নেই। কষ্ট করে চলতে হতো। তার চিকিৎসার জন্য যা যা করার আমি তা করেছি। তার মতো একজন প্রজ্ঞাবান ও জ্ঞানী রাজনীতিকের চলে যাওয়ার ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের এবং দেশের জন্য সৈয়দ আশরাফের চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি হল।

কিশোরগঞ্জবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সৈয়দ আশরাফের সততা ও নিষ্ঠার কারণে অসুস্থতা সত্ত্বেও তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। তার বোন ডা. লিপিকে উপনির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছি। আমরা আশা করি, সৈয়দ আশরাফের স্মৃতি ধরে রাখতে ডা. লিপিকে ভোট দিয়ে কিশোরগঞ্জবাসী নির্বাচিত করবেন।

শোক প্রস্তাবের ওপর আরও আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং জাতীয় পার্টির বেগম রওশন এরশাদ।

এছাড়া শোক প্রস্তাবে সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল বাতেন, নুরুল আলম চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী, মাওলানা নুরুল ইসলাম, আশরাফুন নেছা মোশাররফ ও বোরহান উদ্দিন খান, কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার, অভিনয়শিল্পী এবং লেখক আমজাদ হোসেন, বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী, সুরকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন, নারী মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবি, জাতীয় প্রতীকের নকশাকার মোহাম্মদ ইদ্রিস, প্রখ্যাত সাংবাদিক শাহরিয়ার শহীদ, ভাষাসৈনিক সৈয়দ আবদুল হান্নান, একাত্তরের বীরযোদ্ধা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার কুলদীপ সিং চাঁদপুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল এবং প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের ও সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী মেহজাবিন চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

এ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ায় বিমান দুর্ঘটনায় ও সুনামিতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানলে, আফগানিস্তানে তালেবান হামলায় এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে সংসদ গভীর শোকপ্রকাশ, সব বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে সংসদ।

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More