ডাকসু নির্বাচন সরগরম ঢাবি ক্যাম্পাস

নয় বছর পর ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, পরিবেশ সৃষ্টিতে নির্বাচন তিন মাস পেছানোর দাবি * ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন চায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রজোট * গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি অনুসরণ করে নির্বাচন : উপাচার্য

70
gb

ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সরগরম হয়ে উঠেছে। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয় বছর পর বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে পদযাত্রা করেছে ছাত্রদল।

নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির স্বার্থে এ নির্বাচন তিন মাস পেছানোর দাবি জানিয়ে সংগঠনটি উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে। তবে যথাসময়ে নির্বাচন চায় ছাত্রলীগ এবং বাম সংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট। আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকী কয়েকশ’ নেতাকর্মী নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে হাজির হন। এরপর ছাত্রদলের চার নেতা উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে পদযাত্রাসহ টিএসসি হয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যান ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। এর মাধ্যমে নয় বছর পর ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য কার্যক্রম করল বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল।

বৈঠক শেষে ছাত্রদল সভাপতি রাজীব আহসান সাংবাদিকদের বলেন, ডাকসু নির্বাচনের আগে হল ও ক্যাম্পাসে সহাবস্থান দরকার। এখন কোথাও সহাবস্থান নেই। এর জন্য তিন মাস সময় দরকার। উপাচার্যের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের যৌক্তিক দাবি প্রশাসন মেনে নেবে এবং সবার অংশগ্রহণে একটি কার্যকর ডাকসু নির্বাচন হবে। তিনি আরও বলেন, সহাবস্থান নিশ্চিত করতে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট সময়ের দরকার। আজকে সহাবস্থান দিয়ে কালকে এটাকে কার্যকর বা স্থায়ী বলা যাবে না। শুধু ডাকসুকে কেন্দ্র করে সহাবস্থান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি স্থায়ী সহাবস্থান আমরা চাই। এ ব্যাপারে উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, তাদের (ছাত্রদল) বলেছি ডাকসু নির্বাচনের গঠনতন্ত্র রয়েছে এবং আচরণবিধি প্রণীত হয়েছে। গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি অনুসরণ করে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গঠনতন্ত্রের বিধিবিধান এবং আচরণবিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য প্রযোজ্য হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য আরও বলেন, নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি পরিষদ রয়েছে। চিফ রিটার্নিং অফিসার এবং তার সঙ্গে রিটার্নিং অফিসাররা আছেন। তারা এ বিষয়ে তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবেন। গঠনতন্ত্র এবং আচরণবিধি অনুসরণ করে তারা সব কর্মপ্রয়াস গ্রহণ করবেন। এটিই হল আমাদের রীতি।

নির্বাচনে সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। ছাত্রদল ক্যাম্পাসে এসেছে। পদযাত্রা করেছে। তাদের ওপর কেউ হামলা করেনি। তিনি বলেন, আমরা ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন করার দাবি করছি। ঘোষিত তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে প্রগতিশীল ছাত্রজোট অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমাবেশ করেছে।

বৈঠক শেষে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা একটি কার্যকর নির্বাচন চাই। কিছুদিন আগে ছাত্রদলের বুরহান উদ্দীন সৈকত নামে জহরুল হক হল শাখার এক নেতাকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ রকম একটা পরিবেশ আমরা চাই না। ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হোক ও নির্বাচন ব্যাহত হোক তা আমরা চাই না। এ জন্য আমরা সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানিয়েছি। এ জন্য যৌক্তিকভাবে তিন মাস সময় প্রয়োজন।

ছাত্রদলের দাবি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, কোনো আবাসিক হলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা থাকতে পারছেন না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মুহূর্তে নির্বাচনের পরিবেশ নেই। পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সময় দরকার। কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের প্রকৃত জনমতের ডাকসু চাইলে সেই সময়টা দেবে বলে আমরা আশা করছি। তবে বৈঠক শেষে এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের মতো করে সংগঠন পরিচালনা করবে। এ কথা ছাত্রদলকেও বলা হয়েছে। তবে কোনো উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধ সংগঠন ক্যাম্পাসে কোনো কর্মকাণ্ড করতে পারবে না। এ সময় তিনি ছাত্র সংগঠনগুলোকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে যত্নশীল থাকার আহ্বান জানান।

ছাত্রদলের সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- অংশগ্রহণমূলক ও ভীতিহীন পরিবেশে ডাকসু নির্বাচনের লক্ষ্যে হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে ভোট কেন্দ্র স্থাপন; বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীর ভোটার ও প্রার্থী হওয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৩০ বছর বয়সসীমার পরিবর্তে ভর্তি সেশন নির্ধারণ; ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় নেতাদের প্রচারণায় অংশগ্রহণে কোনো বাধা না দেয়া এবং হামলা, মামলা ও গ্রেফতার না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা; শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ডাকসু নির্বাচনের লক্ষ্যে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও নেতাদের ওপর হওয়া হামলার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া; ডাকসু নির্বাচনের লক্ষ্যে গঠিত কমিটিগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষকদের এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা; ডাকসু গঠনতন্ত্রের ৫-এর (এ) অগণতান্ত্রিক ধারাটি সংশোধন করে সভাপতি ও ছাত্র সংসদের যৌথ সিদ্ধান্তের বিষয় সংযোজন করা এবং ৮-এর (এম) ধারাটি সংশোধন করা।

ছাত্রলীগের আহ্বান ও উপাচার্যের পরামর্শ : ১০ জানুয়ারি প্রক্টরিয়াল বডির পাহারায় ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আলোচনায় যোগ দেন ছাত্রদলের দুই নেতা। ডাকসু নির্বাচনের ইস্যুতে এর আগেও ছাত্রদল নেতারা যোগ দেন। বৈঠক শেষে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে ছাত্রদল নেতাদের সেলফি তোলার স্থিরচিত্র গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়। তখন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ছাত্রদলকে মধুর ক্যান্টিনে চা পানের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, স্মারকলিপি দেয়ার পর বৃহস্পতিবার মধুর ক্যান্টিনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাননি তারা। এ ব্যাপারে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকী বলেন, মধুর ক্যান্টিনে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। যেহেতু তারা অনেক দিন ধরে ক্যাম্পাসে নেই। ধীরে আগোতে পরামর্শ দিয়েছেন উপাচার্য।

২০১০ সালে ১৮ জানুয়ারি ছাত্রদল সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল ও সমাবেশ করে। সেদিন ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল বের করলে ছাত্রলীগের হামলার মুখে পড়ে। এতে ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুসহ ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। ওই হামলার বছরপূর্তিতে হামলাকারীদের বিচারের দাবিতে ছাত্রদল শাহবাগ থেকে থেকে মিছিল বের করে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশি বাধার কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে জানান ছাত্রদলের নেতারা। এরপর দীর্ঘদিন ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসে মিছিল করতে দেখা যায়নি। যদিও ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি বিগত নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে কয়েকটি গুপছি মিছিল বের করার চেষ্টা করে।

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More