শায়খ আব্দুল কাইয়ুম
আল-হামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই বছরও রোজা রাখার তাওফিক দিয়েছেন । এই মাস শুরু হওয়ার আগে আমাদের সাথে অনেক মানুষ ছিলেন । আমরা তাদেরকে মসজিদে দেখেছি, তাদের সাথে নামাজ পড়েছি। কিন্তু আজ তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে নেই। এটি আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা—জীবন খুবই অস্থায়ী।
আমরা ইতিমধ্যে এই বরকতময় মাসের মাঝামাঝি এসে পৌঁছেছি। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাওফিক দেন এই মাসকে সুন্দরভাবে শেষ করতে এবং আমাদের আমল কবুল করেন।
অনেক মানুষ মনে করে রোজা মানে শুধু না খাওয়া, না পান করা এবং দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা। ফিকহের দৃষ্টিতে এটি রোজাকে সহিহ করে, কিন্তু এটিই রোজার মূল উদ্দেশ্য নয় ।
রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যার ওপর আমল করা ছেড়ে দেয় না, আল্লাহর কাছে তার খাবার ও পানীয় ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদের ক্ষুধা চান না। রোজার আসল উদ্দেশ্য হলো গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং তাকওয়া অর্জন করা।
আজকের সময়ে বড় একটি সমস্যা হলো জিহ্বা। আগে যদি কেউ কারো বিরুদ্ধে অপবাদ দিত, তা হয়তো কয়েকজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত । কিন্তু আজ একটি মেসেজ, একটি ফেসবুক পোস্ট বা একটি মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
মানুষ বিষয়টাকে হালকাভাবে নেয়। কেউ বলে “আমি শুধু মজা করছিলাম”, কেউ বলে “আমি শুধু ফরওয়ার্ড করেছি”।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা:) স্বীয় জিহ্বা মোবারক মুখ থেকে বের করে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে হযরত মু'আয (রা.)কে বলেছিলেন, “এটাকে নিয়ন্ত্রণ করো।” তারপর তিনি বলেন, অনেক মানুষ তাদের জিহ্বার কারণে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার পাশে একজন পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য। অর্থাৎ প্রতিটি কথা লেখা হচ্ছে। (সূরা ক্বাফ: ১৮) ।
রাসূল (সা:) আরও সতর্ক করেছেন, অনেক রোজাদার আছে যারা তাদের রোজা থেকে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া কিছুই পায় না। কারণ রোজা শুধু পেটের রোজা নয়। এটি চোখের রোজা, কানের রোজা এবং জিহ্বার রোজাও। আমরা আল্লাহর জন্য হালাল খাবার ছেড়ে দিই, কিন্তু হারাম কথা বলা ছাড়তে পারি না—এটি আমাদের চিন্তা করা উচিত।
রমজান আমাদেরকে আত্মসংযম শেখায়। কেউ যদি ঝগড়া করতে চায়, রাসূল (সা:) বলতে শিখিয়েছেন ওই ব্যক্তিকে বলতে, “আমি রোজাদার।” অর্থাৎ আমি আমার রোজা রক্ষা করছি।
তাহলে আসুন, এই রমজানে আমরা একটি দৃঢ় নিয়ত করি। আমরা আমাদের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করব। আমরা গীবত করব না। আমরা অপবাদ দেব না। আমরা যাচাই-বাছাই না করে কোনো খবর ছড়াব না।
যদি আমরা জিহ্বাকে রক্ষা করি, তাহলে আমরা আমাদের রোজাকেও রক্ষা করতে পারব। আর তখনই আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারব।
রমজান খুব দ্রুত চলে যায়। তাই এই সময়টাকে আমাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি। হে আল্লাহ, আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা থেকে পবিত্র করুন। হে আল্লাহ, আমাদের গীবত ও অপবাদ থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ, আমাদের রোজাকে কবুল করুন এবং আমাদেরকে সেইসব মানুষের অন্তর্ভুক্ত করুন যাদের রোজা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য। হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাকওয়া দান করুন এবং এই বরকতময় মাসের সম্পূর্ণ ফজিলত অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।
শায়খ আব্দুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন