খেয়াল করে দেখেছেন, আপনার/আমার একান্ত ব্যক্তিগত দোয়াতেও আরেকটি নাম যুক্ত হয়েছে- ওসমান হাদি
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক। |
হাদির মাথায় গুলি ঢুকালেই হাদি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে- এটা যারা ভেবেছিল তারা কি জানতো- হাদি বারুদ হয়ে প্রজন্মের মাথায় ঢুকে গেছে। আপনি খুঁজে দেখুন- আপনার মস্তিষ্কেও একটা হাদি বাস করতে শুরু করেছে। এই হাদি এখনো বীজ পর্যায়ে। এটা ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হবে। একটা পরিবারে যতগুলো প্রজন্ম ও জেন্ডার থাকতে পারে- দাদা থেকে নাতি, বোন থেকে কন্যা- সবার মাথায় হাদি হাঁটছে। বীরদর্পে। হাদি হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।
ওসমান হাদির যতগুলো সাক্ষাৎকার শুনেছেন, তার মধ্যে যেটাতে তার পরিবার নিয়ে কথা আছে- লক্ষ্য করে শুনুন- প্রত্যেকটিতে ওসমান হাদি আলাদা করে তাঁর বাবার ভালোবাসার কথা বলেছেন। এবার দেখুন- ওসমান হাদির পূর্ণ নাম হারিয়ে তার বাবার নাম 'হাদি' সম্বোধনেই সবাই তাকে ডাকছে। ভালোবাসার অন্যরকম শক্তি আছে। হাদির সাথে দোয়া পাচ্ছে তার বাবাও। কী সৌভাগ্যবান বাবা, কতখানি স্বার্থক পিতৃত্ব।
মনে করুন, সব পক্ষের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হাদির খুনী গ্রেফতার হলোই না। আর কোনদিন বিচার হলো না হাদির খুনীদের। তবুও হাদির খুনীর বাবাকে, মাকে, ভাইকে, বোনকে, স্ত্রীকে কিংবা সন্তানকে হাদির খুনীর বাবা, মা, ভাই, বোন, স্ত্রী এবং সন্তানের পরিচয়েই বাঁচতে হবে। এটা তাদের জন্য কত ভারী বোঝা হবে তা ভাবতে পারছেন না। সময় গড়াতে দিন। এটা ফয়সাল করিম ও তার সহচরদের আত্মীয়-স্বজন এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য পাথরের চেয়েও ভারী বোঝা হবে। এই ভার বইবার অযোগ্যতা শীঘ্রই প্রকাশ পাবে। ইতিহাসের পরতে পরতে মীর জাফরের মতো তাদেরকেও দায় বয়ে বেড়াতে হবে। ওসমাস হাদির খুনীদের, খুনের সহযোগীদের এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের এতো সহজে নিস্তার নাই। ক্ষমা যাদের নসীবে নাই তাদের ধ্বংস ফিরাবে কে?
খেয়াল করে দেখেছেন, আপনার/আমার একান্ত ব্যক্তিগত দোয়াতেও আরেকটি নাম যুক্ত হয়েছে- ওসমান হাদি। কেউ না থেকে পরমাত্মীয়তে পরিণত হওয়া যে কারো জন্যই সৌভাগ্যের আলামত। দেশপ্রেমের প্রশ্নে হাদির নামটিই এখন বাতিঘর। তরুণটি চির ঘুম ঘুমায় প্রেমের কবি নজরুলেে পাশে অথচ দ্রোহে নাড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর আদ্যোপান্ত। অপরিচিত এক ভিনদেশী শিখ নেতা হাদির খুনীকে ধরে দিতে পারলে পুরস্কার দিবে ৫৫ লাখ টাকা!
বাংলাদেশের রাজা থেকে প্রজা- যারা বাংলাদেশ পন্থাকে ধারণ করে, যারা প্রতিবেশীদের আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের প্রত্যেকের প্রেরণা হাদি। হাদি ইনসাফের বিকল্প প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে। বাংলার মাটিতে হাদির মতো সৌভাগ্য নিয়ে স্মরণকালের ইতিহাসে আর কেউ ঘুমাতে পারেনি। হাদির এই জীবন সফল জীবন। হাদির এই বিদায় ওপারের রাজসিক প্রত্যাবর্তন। তাঁর এমন সুখ্যাতির জন্য ঈর্ষা হয়। ইস! এর সিকিভাগ সৌভাগ্যও যদি আমরা পেতাম! ধন্য ধন্য হাদির জীবন।
হাদির পরিবারে একার্থে কেয়ামত ঘটে গেছে! তার স্ত্রী ও মাকে দেখতে পেয়েছেন? একটা সিঙ্গেল ছবি? অথচ আমরা প্রতিযোগিতা করি- কার চেয়ে কে বেশি নিজেকে দেখাতে পারি! এ আলাপ বাদ। হাদি নামক যে ঘুন পোকা মস্তিষ্কের দখল নিচ্ছে, সে পোকা মস্তিষ্ককে কোন শেইপে নেবে তা এখনও আন্দাজ করতে পারছেন না। হাদি যাদেরকে বাংলাদেশের শত্রু মনে করতো তারা গণশত্রুতে পরিণত হবে।
বন্ধুত্ব নির্বাচন ও শত্রুকে চিহ্নিত করার প্রশ্নে হাদির পছন্দ-অপছন্দ এখন আপনার/আমার পছন্দ/অপছন্দের রূপ পরিগ্রহ করেছে। হাদির নামে যে আযাদীর সুর ঝংকারিত হচ্ছে তা ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। হাদির কণ্ঠস্বর মুয়াজ্জিন জাগরণী সংগীতের মতোই স্পষ্ট- কান থেকে যেন হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছায়। হাদিকে যারা বাঁচতে দেয়নি তাদের লাশ কবর পাবে কি না সন্দেহ। শিয়াল কুকুরের খাদ্য হবে কি-না তা নিয়েও শঙ্কা আছে।
হাদির খুনীর কী করা উচিত? ভিডিও বার্তা দিয়ে সত্যটা তুলে ধরা উচিত। কারা প্ররোচিত করলো, কী উদ্দেশ্য ছিল এবং কারা সুবিধাভোগী- জাতিকে সব জানানো উচিত। অন্তত এতে খুনীর তারা বাবা ও মাকে গণঘৃণা থেকে রক্ষা পাবে। বাবা-মায়ের প্রতি সামান্য ঋণ স্বীকার করলেও তাদের জন্য এটুকু করা উচিত। বেঘোরে মরার আগে আসল সত্য উন্মোচন করে গেলে খুনীর উপকার হবে। সত্য যাকে তাড়া করে তাকে স্পর্শ করেই! ধর্মের কল চাপা থাকে না।
ধরুন, হাদির খুনীকে পৃষ্ঠপোষণকারীর বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে খুনী পার পেয়ো গেলো! তাতে কী আসে যায়? গণমানুষের ঘৃণা থেকে আর কোনোদিন বাঁচা সম্ভব? মুক্ত বাতাসের যে প্রশান্তি তা আর কোনোদিন মিলবে! হাদির খুনী- সারাজীবন দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়ানোর জন্য এইটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট। পতনের জন্য পাপের আকৃতি বৃহৎ হতে হয় না অথচ হাদিে খুন বাংলাদেশ ও দেশাত্মবোধের পার্সপেক্টিভে অসীম অপরাধ। ক্ষমাহীন।
ধারণা করা যায়, হাদির খুনীচক্র একটা বৃহৎ চেইনের অংশ। আমরা চিরকাল এই চক্রের শুরু থেকে শেষ অবধি ঘৃণা করে যাব। এই প্রজন্মের যারা জমে যাওয়া ঠান্ডা উপেক্ষা করে হাদি হত্যাে বিচারের দাবিতে পিচঢালা পথের ওপর রাতদিন বসে থাকে, যারা মৃত্যু কবুল করে বুলেট ও বেয়নেটের সামনে বুক পেতে দেয়- তাদেরকে পরাজিত করা এতোটা সহজ? তাদের সত্য থেকে আলাদা করা এতোটা সোজা? যারা মরতে শিখে যায় তাদেরকে পরাজিত করা যায় না। হাদি হত্যার বিচার নিয়ে ঘরে ফেরার প্রতিশ্রুতি যারা নিজের সাথে করেছে তাদেরকে খালি হাতে, ভুল বুঝিয়ে কিংবা দিয়ে লক্ষ্য থেকে ফেরানো যাবে না।
এক হাদির অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে হাজার হাদির জন্ম হবে। ওসমান হাদির বদলে আপাতত হয়তো একজন সম্পূর্ণ হাদি হয়ে উঠবে না- যার মধ্যে হাদির মতো দেশপ্রেম, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দূরদর্শীতা, সহনশীলতা, সহিষ্ণুতা ও সরলতার উপস্থিতি থাকবে। কিন্তু রাজপথে চলতে থাকা হাজার হাদি মিলে আমাদের ওসমান হাদির জন্ম হবেই। খুনীদের পশমও শেষমেশ অবশিষ্ট থাকবে না। সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। পুড়িয়ে, কুড়িয়ে এবং তাড়িয়ে তাদের ছায়াও বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হবে।
হাদি নাই আজ তেরোদিন
খুনী লুকিয়ে থাকবে কতদিন?

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন