হাদি অনুপস্থিত তবু অদম্য

gbn

হাদি হত্যার বিচার আদৌ হবে কি না, খুনিকে পাকড়াও করা যাবে কি না কিংবা হাদিকে খুনের আড়ালে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল কতটা---

রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক ||

ঢাকার রাস্তায় বিশেষ করে শাহবাগের আশেপাশে— হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে পথে বসে আছে। স্লোগান দিচ্ছে। জমে যাওয়া শীতের মধ্যেও তাদের ঘরে ফেরার তাড়া নাই। বাংলাদেশ ইতিহাসে হাদির জন্য যত মানুষের চোখের পানি ঝরেছে, তা অকল্পনীয়। হাদির জন্য হাত তুলে দোয়া হয়েছে, হাদির জন্য মন খারাপ করেছে, হাদিতে মুগ্ধ হয়েছে— সংখ্যার বিচারে তা অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বিরল দৃষ্টান্ত কতবার স্থাপিত হয়েছে, তা বয়স্করাই ভালো জানেন।

 

হাদি হত্যার বিচার আদৌ হবে কি না, খুনিকে পাকড়াও করা যাবে কি না কিংবা হাদিকে খুনের আড়ালে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল কতটা বিস্তৃত ছিল— তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে হাদির কবরের পাশে প্রতিদিন যত মানুষ দু’হাত তুলে দাঁড়ায়, দাফনের পাঁচ দিন পরেও যত মানুষের হৃদয়ে হাদি বেঁচে থাকে— তা অকল্পনীয়। হাদি হত্যার বিচারের জন্য সারা দেশের মানুষের যে আকুতি, তার সামান্য প্রতিচ্ছবি জেগে থাকা শাহবাগ। বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণটিকে যারা বাঁচতে দেয়নি তাদের নির্বংশতা কামনা করি।

হাদির খুনি ধরা পড়ল না কিংবা হাদি হত্যার বিচার হলো না— মজলুমের তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। 

 

মানুষ হাদির জন্য যত দোয়া করেছে, যত মানুষ হাদির হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে চোখ ভেজা ভাষায় নালিশ জানিয়েছে, তাতে গাদ্দারদের জীবনে নেমে আসবে সবচেয়ে নারকীয় পরিণতি। তাদের মৃত্যু হবে জিল্লতির, আর পরকাল হবে পাথরের জ্বালানিতে ঘেরা। পাঁচশ বছর বাঁচলেও যে ইমপ্যাক্ট তৈরি করা যায় না, সেই ইমপ্যাক্ট হাদি তেত্রিশ বছরের জীবনে তৈরি করে গেছেন। হাজার বছরে যে ভালোবাসা কুড়ানো যায় না, সে ভালোবাসা হাদি রোজ পাচ্ছে। উপস্থিত হাদির চেয়ে অনুপস্থিত হাদি আরও বেশি শক্তিশালী।

 

কালের স্রোতে হাদি হারিয়ে যাবেন? না। হাদি চিরন্তন, হাদি চির উন্নত মম শির। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যতদিন চলবে, ততদিন তারুণ্যের শক্তি হাদির প্রেরণায় জ্বলবে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যতদিন লড়াই হবে, ততদিন হাদির কণ্ঠ উচ্চারিত হবে। দেশপ্রেমের পরীক্ষায় হাদি যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশপন্থী প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে গেঁথে গেছে। হাদির জন্য বাংলাদেশ কাঁদছে। সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন রেখেছিলাম—২০২৫ সালে দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কী? সবাই বেদনাহত চোখের জলে লিখেছে, হাদি। 

 

হাদির পক্ষে যে জাগরণ, তা হাদিকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখবে। ২০২৫ নয় বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে অন্যতম বড় ক্ষতি হাদির শূন্যতা। হাদির মতো করে দেশকে ধারণ করার বোধ খুব বেশি মানুষের মধ্যে দেখা যায় না।

 

হাদি হত্যার বিচার হোক। খুনি গ্রেফতার হোক এবং এই খুনের অন্তরালে থাকা কুশীলবদের পরিচয় প্রকাশ হোক। তবে বিচারের দাবিতে লাগাতার রাস্তা অবরোধ করে রাখা হাদি-প্রচারিত আদর্শের বিপরীত। হাদিকে নিশ্চয়ই ভালোবাসি; কিন্তু তাঁর হত্যার বিচারের দাবিতে সরকারকে চাপ দিতে, জনমত গড়ে তুলতে গিয়ে পথচারীদের কষ্ট না দেওয়াই শ্রেয়। অতীতের সেই শাহবাগের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমরা ভুলিনি। 

 

হাদিকে ভালোবাসে না, হাদি হত্যার বিচার কামনা করে না—এমন অকৃতজ্ঞ ও পাষাণ হাতে গোনা। দেশপ্রেমের প্রশ্নে হাদি দল-মতের ঊর্ধ্বে সবার ভালোবাসা পেয়েছিল। এত মানুষের ভালোবাসা নিয়ে কবরে যেতে পেরেছে—এমন সৌভাগ্যবান সন্তান এই মাটিতে খুব কম জন্মেছে। খুনি ও তার কতিপয় সাঙ্গপাঙ্গ ছাড়া হাদি বাংলাদেশের বাকি সবার ভাই, বন্ধু—পরমাত্মীয়। রাষ্ট্রের কাছে হাদির হত্যাকারীকে গ্রেফতার করার চ্যালেঞ্জটি টপ প্রায়োরিটি হওয়া উচিত। কাজেই দিন-রাত পথচারীদের কষ্ট দিয়ে, রোগীদের বিপদে রেখে স্লোগান দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। 

 

পথরুদ্ধ করার বিকল্প কর্মসূচির মাধ্যমে হাদির হত্যাকারীকে গ্রেফতারের পথ খুঁজতে হবে। যে হাদি সবার হৃদয়ে বাসা বেঁধেছে, সেই হাদির খুনিদের স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ার অধিকার রাখা যাবে না। সহস্রাধিক বছরের পরে আমরা যে হাদিকে পেয়েছিলাম, যাদের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে তাকে হারিয়েছি—তাদের ক্ষমা নেই। এই হৃদয় সবাইকে ক্ষমা করতে জানে না।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন