ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি সাউদি আরবের অবদান 

1,121
gb

  শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল ||

আয়তনের দিক থেকে এশিয়া মহাদেশের ৫ম ও আরব বিশ্বের ২য় বৃহত্তম দেশ সাউদি আরব। সাউদি আরব শুধু তার আয়োতনের দিক থেকে নয় বরং বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রভাবের দিক থেকেও অন্যতম বৃহৎ শক্তি। বিশেষ করে ইসলাম ও মুসলিমদের সেবা, উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণে সাউদি আরবের অবদান অনস্বীকার্য ও অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বেশি। কিন্তু আজকের এই সাউদি আরব একদিনে গড়ে ওঠেনি। পৌনে তিন শতাব্দী পূর্বে ১৭৪৪ সালে ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহ্হাব (রহ.)-এর যৌথ প্রচেষ্টায় প্রথম সাউদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় যা ১৮১৮ সাল পর্যন্ত টিকে ছিলো। পরবর্তীতে প্রথম সাউদি রাষ্ট্র কিছু বছরের জন্য ধ্বংস হলেও ১৮২৪ সালে নাজ্দ কেন্দ্রিক ছোট আকারে দ্বিতীয় সাউদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বিংশ শতাব্দির শুরুতে “ইবনে সাউদ” নামে খ্যাত বাদশাহ আব্দুল আযীয বিন আব্দুর রহমান আলে সাউদ (রহ.)-এর উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় তৃতীয় বা আধুনিক সাউদি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পূর্ণতা লাভ করে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। সেই থেকেই ২৩ সেপ্টেম্বর সাউদি আরবের জাতীয় দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। এ বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে সাউদি আরবের ৮৭তম জাতীয় দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে আমার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাউদি আরবের মাননীয় রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ বিন হাজ্জাজ আল-মুতাইরি হাফিযাহুল্লাহ-এর মাধ্যমে সাউদি আরবের মাননীয় বাদশাহ খাদিমুল হারামাইন আশ-শারীফাইন সালমান বিন আব্দুল আযীয আলে সাউদ হাফিযাহুল্লাহ-কে ও সাউদি আরবের জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
সাউদি আরর শুধু মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রভূমিই নয়, ধীরে ধীরে দেশটি সমগ্র বিশ্বের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে এবং এই ধারাবহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। কারণ এই দেশেই অবস্থিত রয়েছে উম্মুল কুরা (নগরমাতা) মক্কা আল-মুকাররমা যেখানে রয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ইবাদাতগৃহ ও আল্লাহর ঘর “কা’বা” যা সমগ্র মানবজাতির হিদায়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ঘোষণা করেছেন। আর এটিই মুসলিমদের কিবলা-কা’বা যার দিকে ফিরে সারা বিশ্বের মুসলিমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সলাত পড়ে এবং বছরে একবার হাজ্জ সম্পাদন করে ও সারাবছর উমরা পালন করে। উল্লেখ্য যে, সাউদি আরবের জেনারেল অথোরিটি ফর স্ট্যাটিসটিকস্-এর হিসাব মতে, ১৪৩৮ হিজরী মোতবেক ২০১৭ সালে সারা বিশ্ব থেকে ২৩ লক্ষ ৫২ হাজার ১২২ জন মুসলিম হাজ্জ পালন করেছেন, যার মধ্যে ৬ লক্ষ ১০৮ জন সাউদি আরবের অভ্যন্তরীণ হাজী আর বাকী ১৭ লক্ষ ৫২ হাজার ১৪ জন হাজী সাউদি আরবের বাহির থেকে এসে হাজ্জ পালন করেছেন। শুধু বাংলাদেশ থেকেই মোট ১ লক্ষ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হাজী হাজ্জ পালন করেছেন। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও এই বিশাল সংখ্যক আল্লাহ্র মেহমানদের মেহমানদারির ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করায় বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আযীয ও ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমান (হাফিযাহুমুল্লাহ)সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। উল্লেখ্য যে, সাউদি আরব সরকার প্রতিবছরই হাজীদের জন্য ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করছে এবং প্রতিবছরই হাজী ও উমরাকারীর সংখ্যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বাড়ছে।
সাউদি আরবে রাজতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত থাকলেও দেশটির বাদশাহগণ নিজেদেরকে বাদশাহ পরিচয় দেয়ার চেয়ে “খাদিমুল হারামাইন আশ-শারীফাইন” বা “দুই হারাম (মক্কা ও মদীনা)-এর সেবক” হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। তারা হাজী, উমরাকারী ও যিয়ারতকারীদের রাস্তায় রাস্তায় বিলবোর্ডে ও দেয়ালে বড় করে লিখে রেখেছেন “খিদমাতুকুম শারফুন লানা” অর্থাৎ “আপনাদের সেবা করা আমাদের জন্য মর্যাদার বিষয়”। এই ¯েøাগানের বাস্তবায়নে তারা সর্বদা সচেষ্ট থাকেন। সাউদি সরকার হাজী, উমরাকারী ও যিয়ারতকারীদের সুবিধার জন্য বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মক্কার মাসজিদে হারাম সম্প্রসারণ, মদীনায় মাসজিদে নবভী সম্প্রসারণ, মাস’আ অর্থাৎ সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সা’ঈর পথ প্রশস্তকরণ, মীনায় জামারাতে পাথর নিক্ষেপের পথে ব্রিজ তৈরিকরণ, জেদ্দা-মক্কা-মদীনা রেলপথ তৈরি এবং বিশেষ করে হজ্জের বিধান পালনের সাথে সম্পৃক্ত স্থানগুলোর মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকিকরণ ও রেলপথ চালুকরণ ইত্যাদি। হাজী ও উমরাকারীদের যমযমের পানি পানের ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য সাউদি সরকার ১৪০৩ হিজরীতে “মাকতাবুল যামাযেমা আল-মুয়াহ্হাদ” বা “যামাযেমা ইউনাইটেড অফিস” নামে হজ্জ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে। এই অফিসের মাধ্যমেই বর্তমানে যমযমের পানি বিতরণ করা হয়।
সাউদি আরব শুধু হারামাইনের খেদমতেই নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখছে না। দেশটি সারা দুনিয়ায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারেও সাধ্যানুযায়ী অবদান রেখে যাচ্ছে। সারা বিশ্বে কুরআনকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বাদশাহ ফাহদের নিজস্ব উদ্যোগে ১৪০৩ সালে মদিনা মুনাওয়ারার তাবুক রোডের পাশে ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর “মুজাম্মা আল-মালিক ফাহ্দ লি-তাবা’আতিল মুসহাফ আশ-শারীফ” বা “বাদশাহ ফাহদ কুরআন প্রিন্টিং প্রেস” প্রতিষ্ঠত হয়, যা ১৪০৫হি. সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করে। এই সংস্থা থেকে বছরে ৭০ লক্ষ কপি কুরআন ও  বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষাগুলোসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা কপি ছাপানো হয়। এই সংস্থা থেকে ক্যাসেট, সিডি করেও কুরআন বিতরণ করা হয়। আর এই সংস্থাটি এখন হয়ে উঠেছে কুরআন গবেষণার প্রাণকেন্দ্র। এই সংস্থা থেকে ইতোপূর্বে মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.)-এর লেখা “মা’আরিফুল কুরআন”-এর সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ (মাওলানা মুহিউদ্দিন খান অনূদিত) ছেপে বাংলাভাষী মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়। এই সংস্থার উদ্যোগে সম্প্রতি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি-এইচ.ডি ডিগ্রী অর্জনকারী ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাইখ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া কর্তৃক “কুরআনুল কারীম (বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসীর)” (২ খÐ) ছেপে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে । সারা দুনিয়ায় কুরআনের বিশুদ্ধ পাঠ ও অনুবাদ ছড়িয়ে দিতে এই সংস্থা উল্লেখযোগ্য খেদমত করে যাচ্ছে।
দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সারা দুনিয়া থেকে ছাত্রদেরকে পূর্ণ বৃত্তি দিয়ে এনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশুনার ব্যবস্থা করেছে। প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন শিক্ষার্থী বৃত্তি নিয়ে দেশটিতে যায় এবং পড়াশুনা শেষ করে দা’ঈ হিসাবে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সাউদি আরব সারা দুনিয়ায় মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণে অর্থায়ন করে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। নারীদের শিক্ষার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে এবং প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের জন্য আলাদা ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
সাউদি আরব হচ্ছে তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্বের পীঠস্থান। সাউদি আরবের মক্কা-মদীনা ও এর আশেপাশেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এখান থেকেই তাওহীদের বীজ সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাউদি আরবের প্রাক্তন বাদশাহ আব্দুল আযীয ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকেই সাউদি আরব থেকে সকল ধরনের শিরক ও বিদ’আতের মূলোৎপাটন করেন। এখন শুধু সাউদি আরবেই নয়, সারা বিশ্বে নির্ভেজাল তাওহীদ ও ইসলাম ধর্মের বিশুদ্ধ রূপ প্রচার ও প্রসারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কেউ কেউ অজ্ঞতাবশতঃ সাউদি আরবে চর্চিত ইসলামকে শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব (রহ.)-এর নামের সাথে মিলিয়ে “ওয়াহাবী ইসলাম” বলে গালমন্দ করেন। অথচ সত্য কথা হচ্ছে সাউদি আরব কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না বা কোন ব্যক্তির মতামতকে যাচাইবাছাই ছাড়াই গ্রহণ বা বর্জন করে না। তিনি যে-ই হোন না কেন। তারা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। বর্তমান বাংলাদেশেও শতাধিক আলিম রয়েছেন যারা সাউদি আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে দেশে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করছেন।
অনেকেই সাউদি আরবকে কট্টরপন্থি ও সন্ত্রাসের সমর্থনকারী দেশ হিসেবে সমালোচনা করে। অথচ যারা এইসব অভিযোগ উত্থাপন করে তারাই কট্টরপন্থি ও সন্ত্রাসের রপ্তানিকারক। সাউদি আরব সর্বদা ইসলামের উদার ও মধ্যমপন্থি রূপের চর্চা ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। সন্ত্রাস, চরমপন্থা, উগ্রবাদ প্রতিরোধে সাউদি আরবের শক্ত অবস্থান সারা বিশ্বে সমাদৃত। সাউদি আরব সর্বদা ইসলামের পক্ষাবলম্বন করে এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো খÐন করে এবং প্রতিবাদ করে।
সাউদি আরব শুধু ইসলামের প্রচার-প্রসারে অবদান রাখছে তা নয়, বরং তারা মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন স্বার্থেও তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন ফিলিস্তিন ও মাসজিদে আকসা কেন্দ্রিক সমস্যা দূরিকরণে, ইয়ামানে শিয়াদের উপগ্রæপ হাওছীদের জুলুম থেকে ইয়ামানবাসীকে হেফাযত করা, সিরিয়ার সংকট সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ ইত্যাদি। এর সাথে সাথে সাউদি আরব সারা বিশ্বে বিভিন্ন অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারা মাযলুমদের জন্য ত্রাণ সহায়তা প্রদান করেছে। নিরক্ষরতা, অপুষ্টি, রোগ-বালাই, দরিদ্রতা, পরিবেশ বিপর্যয় ইত্যাদি দূরিকরণে সাহায্য-সহযোগিতার অব্যহত রেখেছে।
মুসলিম উম্মাহ আজ শত মতে ও পথে বিভক্ত। এই বিভক্তি ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই কম-বেশি চলে আসছে। কিন্তু বিগত ১০০ বছরের মধ্যে সাউদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আযীয (রহ.)ই সর্বপ্রথম মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তার ডাকেই ১৩৪৫ হিজরীতে মক্কায় সর্বপ্রথম বার্ষিক ইসলামী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনিই আধুনিক যুগের প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলামী সংহতির উপর দাওয়াতের ভিত্তি স্থাপন করেছেন এবং এই সংহতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার ডাকে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের মাধ্যমেই সাউদি আরব প্রতিষ্ঠার বীজ শক্ত হয় এবং বিশ্বমুসলিমদের ঐক্যে একধাপ অগ্রগতি সাধিত হয়। তাঁর পরে তাঁর ছেলেদের শাসনামলেও ইসলামী সংহতির এই প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে সাউদি আরব। এরই ধারাবাহিকতায় সাউদি আরবের উদ্যোগে ১৯৬২ সালে “রাবিতাতুল আলাম আল-ইসলামী” বা “মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ” ও ১৯৬৯ সালে “মুনাযযামাতুত তা’আউন আল-ইসলামী” বা “ইসলামী সম্মেলন সংস্থা” (ও আই সি) প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও সাউদি আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও অনেক ইসলামিক সেন্টার ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও অর্থায়ন করে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।
সাউদি আরব সারা দুনিয়ায় সামাজিক ও মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়ানোর জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তারা এই কাজের জন্য অনেকগুলো সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব সংস্থার মাধ্যমে তারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে মানবিক সাহায্য প্রদান করে থাকে। সেসব সংস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: হাইআতুল ইগাছা আল-ইসলামিয়্যাহ আল-আলামিয়্যাহ (আন্তর্জাতিক ইসলামী ত্রাণ সংস্থা-আই আই আর ও), আন-নাদওয়াতুল আলামিয়্যাহ লিশ-শাবাব আল-ইসলামী (ওয়ার্ল্ড এসেম্বলি অফ মুসলিম ইওথ-ওয়ামী), আল-হাইআইতুস সাউদিয়্যাহ লি-জামঈত তাবাররু’আত, সুনদূকুত তাযামুনিল ইসলামী বা ইসলামিক সলিডারিটি ফান্ড, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় মুসলমানদের জন্য সাহায্য সংগ্রহের উচ্চ কমিটি, বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশন ইত্যাদি। এসব সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ১. বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট নানাবিধ দুর্যোগে আক্রান্তদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আর্থিক সাহায্য দান ও পুনর্বাসন; ২. কৃষি স¤প্রসারণ; ৩. বাঁধ নির্মাণে কারিগরি সহায়তা দান; ৪. কূপ খনন; ৫. বিচ্ছিন্ন স্থানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন; ৬. ক্লিনিক স্থাপন; ৭. স্বাস্থ্যসেবা দান ইত্যাদি মানবিক সেবা প্রদান করা এ সংস্থাগুলোর মূল দায়িত্ব।
সাউদি আরব মুসলিম বিশ্বের ইসলামী ভাবধারা সমৃদ্ধকরণ ও ইসলাম, আরবী ও ইসলামী খেদমতকে ত্বরান্বিত ও বিস্তৃত করার জন্য বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশনের অধীনে কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার ঘোষণা করে। যা বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার হিসেবে পরিগণিত হয়। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য ইসলামের সেবা, ইসলামী শিক্ষা, আরবি সাহিত্য, চিকিৎসা ও বিজ্ঞান-এই ৫টি বিষয়ের ওপর ১৯৭৯ সাল থেকে এ পুরস্কার দেয়া চালু রয়েছে।
সাউদি আরবের অসংখ্য মানবসেবামূলক প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে অমুসলিম দেশে অবস্থিত সংখ্যালঘু মুসলমানদের নানাবিধ সেবা প্রদান করা। পরিচিত মুসলিম বিশ্বের বাইরেও কোটি কোটি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে নিজ নিজ দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বসবাস করছে এবং ক্রমশ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামের সূতিকাগার হিসেবে সাউদি আরব শুধু মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশগুলোর প্রতি নয়, বরং অমুসলিম দেশগুলোতে বসবাসরত মুসলিমদের প্রতিও সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সেবার অংশ হিসেবে গত কয়েক দশক ধরে সাউদি আরব অমুসলিম সমাজে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় প্রয়োজন মেটাতে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জোরদার করতে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তারা সারা বিশ্বে বিশুদ্ধ ইসলামী আকীদা ও আমল ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক সেন্টার, ইনস্টিটিউট ও গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এক হিসাবে দেখা যায় তারা নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলস, সানফ্রান্সিসকো, শিকাগো, মাদ্রিদ, লন্ডন, রোম, প্যারিস, বন, ব্রাসেলস, জেনেভা, টোকিও, টরেন্টো, ভিয়েনা, লিসবন, বুয়েন্স আয়ারস, এডিনবরা এবং রিওডি জেনিরোসহ বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম দেশের বহু শহরে ১৫০০টি মসজিদ ও ২১০টি ইসলামী সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও ৫৬০টি মসজিদ নির্মাণে সাউদি আরবের অর্থায়নের কথা রয়েছে। এ মসজিদ ও সেন্টারগুলো বহুমুখী ভবনরূপে নির্মিত হয়েছে, যা শুধু ধর্মীয় চাহিদাই নয়, বরং মুসলমানদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য চাহিদাও মেটাতে সক্ষম হয়েছে। এর পাশাপাশি তুলনামূলক ক্ষুদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় প্রয়োজনমাফিক ছোট আকারের মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলো সাধারণত এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত। তারা সারাবিশ্বে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে আরবী ও অন্যান্য ভাষায় রচিত ও প্রকাশিত ইসলামী বই বিনামূল্যে বিতরণ করছে।
সাউদি আরবের সাবেক বাদশাহ ও সাবেক খাদিমুল হারামাইন বাদশাহ ফাহদ বিন আবদুল আযীয বলেছিলেন, “মুসলিম ও আরব দেশের ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আমরা সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব এবং মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করব।” এ বক্তব্যে ইসলাম এবং সারাবিশ্বের মুসলিমদের জন্য সাউদি আরবের ত্যাগের ইচ্ছা ও আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে। যদিও এই ঘোষণার পূর্ব থেকেই সাউদি আরব ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছিল। এই ঘোষণার পর থেকে তারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতার হাত আরও প্রসারিত করেছে। সাউদি আরব বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সেবায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছে। আর্থিক সাহায্য হিসাবে রাজকীয় সাউদি আরব শত শত কোটি ডলার সারাবিশ্বে খরচ করেছে।
সাউদি আরব সারা দুনিয়ায় সেসকল সাহায্য-সহযোগিতা করে তা মূলত তিনটি উৎস থেকে আসে। এক. খাদিমুল হারামাইন আশ-শারীফাইন-এর পক্ষ থেকে; দুই: সাউদি সরকারের রাষ্ট্রীয় ফান্ড ও শাসক পরিবারের পক্ষ থেকে ও তিন: সৎকর্মশীল সাউদি নাগরিক, কর্মকর্তা ও সাউদিতে কর্মরত বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার পক্ষ থেকে। সাউদি আরব শুধু বিশ্বব্যাপী মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণ করেই থেমে থাকেনি। বরং যেখানেই মুসলমানরা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে, সেখানেই তাদের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছে। নিচে কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলো:
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সাউদি আরব এবং এর ইসলামী সংস্থাগুলো মধ্য এশিয়ার নব সৃষ্ট মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোকে সাহায্যের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। রাশিয়ার কমিউনিজমের শাসনামলে বৃহত্তর রাশিয়ার কোটি কোটি মুসলিম নির্যাতিত হয়েছিল এবং মুসলিম বিশ্ব থেকে তাদেরকে সাত দশক বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। এ সময় মুসলিমরা কোনোক্রমে আত্মরক্ষা করলেও অধিকাংশ মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং পবিত্র কুরআনে কারীমের প্রকট অভাব দেখা দিয়েছিল। সাউদি আরব অতি দ্রæত পদক্ষেপ নিয়ে ছয়টি মুসলিম প্রজাতন্ত্রের রাজধানীতে বিশাল বিশাল ইসলামিক সেন্টার স্থাপন করেছে এবং প্রজাতন্ত্রগুলোর ছোট শহরগুলোয় মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় অনূদিত এবং মদীনার বাদশাহ ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্সে মুদ্রিত লাখ লাখ কপি কুরআনুল কারীম বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বিমানযোগে ওইসব দেশের মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোতে প্রেরণ করা হয়েছে।
সাউদি আরবের জাতীয় কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, মুসলিম বিশ্বের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিশু ও যুবকদের জন্য ইসলামী ও আরবী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোকে বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি সাউদি আরব উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে বিভিন্ন ইসলামী একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব একাডেমি পরিপূর্ণ স্কুল হিসেবে আরবী ও ইসলামী শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে স্থানীয় ভাষায় অন্যান্য সিলেবাসও পাঠদান করে থাকে। এছাড়া সাউদি আরব সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ছাত্রদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করে বিভিন্ন সাউদি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
ইসলামের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এবং ইসলামের সঠিক জ্ঞান প্রচারার্থে সাউদি আরব নিজস্ব অর্থায়নে ইউরোপ ও আমেরিকার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইসলামী শিক্ষা বিভাগ ও চেয়ার প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ও মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত মুসলমানদের বিবিধ প্রয়োজন মেটানো এবং মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের মধ্যে উত্তম সমঝোতার আবহ সৃষ্টি করাই সাউদি আরবের মূল লক্ষ্য।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার মুসলমানরা যখন সার্ব বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার শিকার হয়, তখন সাউদি আরব সেখানকার মুসলিমদেরকে সাউদি আরবে এনে রক্ষা করে এবং তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। সাথে সাথে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য “বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় মুসলমানদের জন্য সাহায্য সংগ্রহের উচ্চ কমিটি” গঠন করে এবং এর মাধ্যমে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাহায্য সংগ্রহ করে তার নিপীড়িত মানুষের মাঝে বিতরণ করে।

২০১২ সালে মিয়ানমারের মুসলমানরা গণহত্যার শিকার হলে সাউদি আরব ওআইসির চতুর্থ বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে ও তাদের জন্য ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা করে। সাউদি আরব বিগত ৭০ বছর যাবৎ রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাহায্য-সহযোগিতা করছে। ইতোমধ্যেই সাউদি আরব দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে নিজ দেশে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছে এবং অসংখ্য আরাকানীকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। সম্প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত জাতিগত নির্মূল অভিযানে ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে রাখাইন রাজ্য ছেড়ে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১২৩ কোটি টাকা) ত্রাণ হিসেবে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন সাউদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আযীয আলে সাউদ। সাউদি প্রেস এজেন্সির সূত্রে আরব নিউজ, সাউদি গেজেটসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই সংবাদ প্রকাশ করে। সাউদি রয়েল কোর্টের উপদেষ্টা ও কিং সালমান সেন্টার ফর রিলিফ এন্ড হিউমেনিটারিয়ান ওয়ার্ক-এর জেনারেল সুপারভাইজার ড. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আযীয আল-রাবীআহ আরও ঘোষণা করেন যে, সেন্টারের পক্ষ থেকে খুব দ্রæত একটি বিশেষ টিম বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য যাবে এবং তাদের জরুরিভিত্তিতে যে সকল সাহায্য দরকার তার তালিকা করবে। যাতে করে সাহায্যের পরবর্তী ধাপে জরুরি সাহায্যগুলো পাঠাতে পারে। আর এই সাহায্য মূলত দীর্ঘমেয়াদী সাহায্য কার্যক্রমের প্রথম অংশ। এই কার্যক্রম চলতে থাকবে এবং তারা ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন-এর সহযোগিতায় বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে সীমান্ত খুলে দিয়ে তাদের আসতে এবং খাওয়া-দাওয়াসহ চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি অনুরোধ করে সাউদি আরব। এবং সেই খরচ সাউদি সরকার বহন করারও ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই তিনি ৫০ টন খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসক পাঠানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন সাউদি বাদশাহ। সাউদি বাদশাহ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা গণহত্যার নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করান। এছাড়া সাউদি আরব স্থায়ীভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে। সাউদি মন্ত্রীসভার মিটিং-এ আবারও মিয়ানমারে বসবাসরত মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলা বন্ধে ও তাদের মৌলিক মানবাধিকার ফিরিয়ে দিতে মায়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য কক্সবাজারের উখিয়ায় রাবেতা হাসপাতালসহ রাখাইনে বেশ কিছু হাসপাতাল, মসজিদ, মাদরাসা নির্মাণ করে দিয়েছে সাউদি আরব। সব কিছুই রাবেতাতুল আলম আল-ইসলামীর মাধ্যমে করেছে সাউদি আরব। সম্প্রতি দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও প্রসারের অভিযোগে সাউদি আরবকে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ এসব সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সাউদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে ও আ লিকভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় হারামাইন শারীফাইনের সম্মানিত খাদিম, সাউদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আযীয আলে সাউদ-এর উদ্যোগে এবং সাউদি প্রতিরক্ষামন্ত্রি ও ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমান-এর নেতৃত্বে গত ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে বাংলাদেশসহ ৩৪টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে ইতিহাসে সর্বপ্রথম ইসলামী সামরিক জোট গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবেলায় গঠিত এই জোটের কাছে মুসলিম বিশ্বের প্রত্যাশা অনেক।
আমরা আশা করি, সাউদি আরবের নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্ব একতাবদ্ধ হয়ে একদিকে যেমন সন্ত্রাসবাদকে মোকাবেলা করে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে অপরদিকে মুসলিম জনগণ, তাদের ভূখÐ ও সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। উল্লেখ্য যে, সাউদি আরব সবসময়ই মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষণে সাধ্যানুযায়ী অবদান রেখে গেছে এবং বর্তমানেও যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা সিরিয়া যুদ্ধের ফলে উদ্বাস্তু হওয়া ২৫ লক্ষ সিরিয়ানকে আশ্রয় দিয়েছে। অথচ বিশ্ব মিডিয়ায় এর প্রচার নেই। কিন্তু সমগ্র ইউরোপ কয়েক লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার খবর মিডিয়ায় এমনভাবে প্রতিনিয়ত প্রচার করছে যেন মুসলিম দেশগুলো কিছুই করছে না। সবই মিডিয়ার কারসাজি। তাই মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ সংরক্ষণে দরকার আন্তর্জাতিক শক্তিশালী মিডিয়া। আমরা সাউদি আরবের কাছে আশা করছি ওআইসি বা রাবেতা বা স্বতন্ত্র কোন সংস্থা করে তার অধীনে বা পৃথক কোন আন্তর্জাতিক শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম গড়ে তুলবে যারা ইমলাম ও মুসলিম উম্মাহর পক্ষে কথা বলবে।
ড. আবদুল আযীয হুসাইন আস-সুওয়াইগ তার রচিত “সাউদি আরব ও মুসলিম বিশ্বের উন্নয়ন” পুস্তিকায় উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বব্যাপী উম্মার সেবায় সাউদি আরব যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা মূলত চার প্রকার ১. রাজনৈতিক; ২. সাংস্কৃতিক; ৩. অর্থনৈতিক ও ৪. মানবিক। এসব বিষয় বিবেচনায় দেখা যায়, সাউদি আরব মুসলিম বিশ্বের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করছে।
সাউদি আরবের বর্তমান বাদশাহ খাদিমুল হারামাইন আশ-শারীফাইন সালমান বিন আব্দুল আযীয আলে সাউদ, ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রি মুহাম্মাদ বিন সালমান-এর নেতৃত্বে সাউদি আরব আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন শক্তি হিসাবে আবির্ভুত হচ্ছে। তারা ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। আমরা এর সফলতা কামনা করছি। আমরা আশা করছি পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাউদি আরব ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে। সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, মায়ানমারসহ বিশ্বের যেখানেই মুসলিমরা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে স্থায়ীভাবে তাদের সমস্যা দূরিকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে আশা করছি মুসলিমদের ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় এবং সন্ত্রাস, দারিদ্র্যসহ অন্যান্য সমস্যা দূরিকরণে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদান করবে। যেহেতু সাউদি আরব কুরআন অবতরণের স্থান, নবী মুহাম্মাদ সা.-এর কর্মক্ষেত্র এবং যেহেতু তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হাজীদের মেহমানদারি করার ও ইসলামের প্রধান দুটি কেন্দ্র মক্কা ও মদীনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়েছেন সেহেতু তাদের দায়িত্ব ও তাদের প্রতি সারা বিশ্বের প্রতিটি মুসলিমের আশা-আকাক্সক্ষার মাত্রাও বেশি। আগামী বছরগুলোতে সাউদি আরব মুসলিম উম্মাহর আশা পূরণে ও তাদের দায়িত্ব পালনে আরও সচেষ্ট হবে বলে আমরা আশা করছি।

 

শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল গবেষক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট ফর এডুকেশন

এন্ড রিসার্চ, উত্তরা, ঢাকাএম.ফিল গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

shahadatfaysal@yahoo.com