Bangla Newspaper

শেখ হাসিনার ভারত সফর ও মিডিয়া সৃষ্ট বিভ্রান্তি

618
অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান | উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ||

২৫ মে শান্তিনিকেতনে নব উদযাটিত বাংলাদেশ ভবনে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার শীর্ষ বৈঠক এবং পরদিন বিকেলে তাজ বেঙ্গল হোটেলে মমতা ব্যানার্জীর মধ্যকার একান্ত বৈঠক হয়েছে। সেখানে সাংবাদিক বা বাইরের কেউ ছিল না। সেখানকার কোনো তথ্য বা সংলাপ বাইরে আসা সম্ভব না। তাই আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একান্ত বৈঠক নিয়ে যে সব মনগড়া সংবাদ প্রচার করা হয়েছে তা নিতান্তই ভিত্তিহীন। ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার না থাকলে ভারতের পশ্চিমে পাকিস্তান আছে পূর্বেও আর একটি পাকিস্তান নিয়ে ভারতকে থাকতে হবে’ বলে শেখ হাসিনার বক্তব্য হিসেবে যা এসেছে তা একান্তই মিডিয়া সৃষ্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিকর তথ্য। এ দুটি শীর্ষ বৈঠক ছাড়া বাকি অনুষ্ঠানগুলোতে আমি উপস্থিত ছিলাম। বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের সময় মমতা ব্যানার্জী যখন বক্তৃতা রাখলেন সেখানে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা, পাশে থাকার কথা সবই বলেছেন। মোদির বক্তব্যের মধ্যেও এই কথাগুলোই এসেছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সূ²ভাবে আমাদের মধ্যকার যা কিছু সমস্যা আছে তা বোঝাতে চেয়েছেন। ভারতের মিডিয়াও ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছে। মমতা ব্যানার্জীর পর যখন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শুরু করলেন তখন সাধারণ মানুষজনও প্রায় সবাই বুঝতে পেরেছে কোন বিষয়টা উঠে আসবে। আমাদের যে কয়টা সমস্যা ছিল যেমন সমুদ্রসীমা, সীমান্ত সমস্যাগুলোর কথা তো তার বক্তব্যে উঠে এসেছেই। তবে আমাদের মূল যে সমস্যা, পানির সমস্যা এটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

মমতা ব্যানার্জীও মিডিয়ার কাছে বলেছেন যে, ‘এখনো মিডিয়াকে সবকিছু বলার সময় আসেনি। আসলেই পানির সমস্যা একটি জটিল সমস্যা।’ আমরা যখন কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন গেলাম, আবার কাজী নজরুল বিশ^বিদ্যালয়ে গেলাম আমরা কিছু অংশ সড়কপথে গিয়েছি আবার কম উচ্চতায় বিমানে করেও গিয়েছি। সেখানে যা দেখলাম ওখানে কোথাও কোনো পানি নেই। আমাদের নদীতে তো বৃষ্টির কারণে কিছু পানি আছে ওখানে দেখেছি মাইলের পর মাইল নদীতে কোনো পানি নেই। নদী শুকনো, এর ওপর দিয়ে গাড়ি চলছে।

তাই আমরা যত সহজেই বলি না কেন, সেখানে অনেক কাজ করার আছে। পানির উৎস নিয়ে কাজ করার আছে, পানির রিজার্ভার তৈরিসহ অনেক কাজ আছে। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে টানাপড়েনও আছে। কাজেই চুক্তি হলেই যে সঙ্গে সঙ্গে পানি চলে আসবে বিষয়টা ঠিক তা না।

প্রধানমন্ত্রী ইমোশনালিই বিষয়টা এভাবে এনেছেন যে, আমাদের ল্যান্ড বাউন্ডারি নির্ধারণ নিয়ে যে সমস্যা ছিল সেটার সমাধানে কংগ্রেস, বিজিপি, তৃণমূল সবাই যেভাবে এক হয়ে সমর্থন করেছে সেভাবেই বাকি সমস্যাগুলো বিশেষ করে পানি বণ্টন সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলা যায় সে ব্যাপারে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। কারণ শুধু কেন্দ্রীয় সরকার বা প্রাদেশিক সরকার কারো একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না।

আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, ‘একটা নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি এখন কী করে তাদের নিজ ভূখণ্ডে ফেরত পাঠানো হবে এ ব্যাপারে আমরা সবার সাহায্য চাই।’ আসলে ব্যাপারটাকে বন্ধুত্বের মাধ্যমেই মীমাংসা করতে হবে। পরাশক্তিগুলো যেমন ছোট রাষ্ট্রগুলোকে নানারকম অবরোধ ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে বাধ্য করে থাকে সেরকম অবস্থানে তো বাংলাদেশ নেই। আর মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করলে একমাত্র চীনই করতে পারে। তাছাড়া অন্য কোনো বিচার করে মিয়ানমারকে খুব বেশি নড়ানো কঠিন। কারণ এর আগেও প্রায় ত্রিশ বছর সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেও দেখা গেছে মিয়ানমার নড়ে না। তাই আন্তর্জাতিক বিচারের কাজে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে ওদের বিচার করার চেয়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গাকে দেশে ফেরত পাঠানোটাই বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নিয়ে বলতে গেলে আরেকটি বিষয় হলো আমাদের নির্বাচনে ধর্ম এবং ভারত বড় দুটি ফ্যাক্টর সুদূর অতীত থেকেই আছে। সাধারণত মুসলিম লীগ ঘরানার এবং সামরিক ঘরানার যে দলগুলো আছে তাদের কাজই হলো সব সময় ধর্মকে ব্যবহার করা ও ভারতের বিরোধিতা করা। এবারো তারা তাই করবে। কিন্তু এদিক থেকে সরকারি দল একটা সুবিধা পাবে কারণ বিশাল একটা মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এই সরকার আশ্রয় দিয়েছে। সেদিক থেকে মুসলিম বিশ^সহ আমাদের মুসলিম নাগরিকদের একটা সমর্থন আছে। সুতরাং রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির কোনো সুযোগ তারা পাবে না। আর তিস্তা ইস্যু তো আজকের ইস্যু না। এর আগেও বিশ বছর বিভিন্ন সামরিক বেসামরিক সরকার দেশের ক্ষমতায় ছিল তারাও এটার সমাধান করতে সক্ষম হয়নি। বরং এ সরকারের আমলেই বড় অনেক কিছু অর্জন সম্ভব হয়েছে। যেমন এ সরকারের আমলেই আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র পেয়েছি। রক্তাক্ত যুদ্ধ ছাড়া, প্রাণহানি ছাড়া পৃথিবীর কোথাও ছিটমহল বা জায়গা হস্তান্তরের ঘটনা নেই। সারা পৃথিবীতে এখনো অন্তত চল্লিশটি সীমান্তে প্রতিপক্ষরা অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি বসে আছে। সেখানে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে এ সমস্যা সমাধান নিঃসন্দেহে এ সরকারের একটা বড় অর্জন। শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়েছে বলেই আমরা বুঝতে পারছি না কত জটিল একটা বিষয়ের সহজ সমাধান এসেছে। তিস্তাসহ আমাদের অন্যান্য যে সমস্যা রয়েছে তার সমাধানও এভাবেই বন্ধুত্ব ও শান্তিপূর্ণভাবেই করতে হবে। কারণ ঐতিহাসিকভাবেই বিপদে আমাদের পক্ষে দাঁড়ানো শক্তির সংখ্যা খুবই কম। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর, আমাদের বিজয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে, জাতিসংঘের ভোটাভুটিতে আমাদের বিপক্ষে ছিল চীন ও আমেরিকাসহ ১০৪টি দেশ। ভারতসহ মাত্র এগারোটি দেশ ছিল আমাদের পক্ষে। আর ভোটদানে বিরত ছিল ১০টি দেশ। তাই আমরা চাইলেই অনেক বন্ধু আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ সবাই পক্ষ নেবে নিজের স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখেই। তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক জনমত বাড়ানো এবং ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমেই তিস্তা সমস্যার সমাধান করা।

Comments
Loading...