শেখ হাসিনা যদি মাদার অব হিউম্যনিটি হন, তাহলে তুরস্কের মিসেস আরদোগান হচ্ছেন মাদার অব ইউনিভার্স

310
gb

রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী ||
লিখতে বসে জার্মানবাসী কবি দাউদ হায়দারের কবিতা খুব মনে পড়ছে। “জন্মই বার্মীজদের আজন্ম পাপ“ কিছুদিন আগেও তো প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে রাখাইন রাজ্যে পূর্ব আকাশে সুর্য উদিত হয়ে পশ্চিমাকাশে অস্ত যেত। কিন্তু আজ, রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যের কি অবস্থা? কিছুদিন আগের সুর্যাস্তের রঙ্গের সাথে আজকের রাখাইন রাজ্যের সুর্যাস্তের কোনো মিল নেই। রাখাইন রাজ্য হয়তো পরিণত হয়েছে এক ভূতুরে পরিবেশ। যে দিন রাখাইন রাজ্য ছেড়ে এসেছে বাসিন্দারা সেদিন তো নীবিড় অন্ধকার নেমেছিল সে রাজ্যে। সে অন্ধকার ছিল মৃত্যুর। সে অন্ধকারে হয়তো মিলিয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যের প্রেমিক প্রেমিকার সব স্মৃতি। মৃত্যুর মিছিলে শরীক হয়েছেন কত লোক। নোবেল বিজয়ী সুচি- গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যাক্তিত্ব সুচীর মেলেটারীর বুটে এবং বেয়েনেটের খোঁচায় কত নর-নারীর বুক ঝাঝরা হয়েছে তার হিসেব কেউ রাখেনা, রাখবেওনা। সময়ের বিবর্তনে একদিন সব হারিয়ে যাবে। সময়ের বিবর্তনে সেটি হবে ইতিহাস। সে ইতিহ্সা পড়বে পরবর্তী প্রজন্ম। যেমনিভাবে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। কি অপরাধ ছিল এসব লোকগুলোর। জাপানীরা মারলো বৃটিশরা স্বীকৃতি দিলনা। আজ মারছে বোদ্দিষ্টরা। অথচ সুচী যদি চাইতেন তিনি কি পারতেন না এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে? কি এমন ঘটলো যে রোহিঙ্গাদের এভাবে হত্যা করতে হবে? তাহলে কি রোহিঙ্গারা যখন সুচীর মুক্তির আন্দোলনে শামিল হয়েছিল তখন থেকেই কি মেলেটারীরা প্রতিহিংসার আগুনে জলছিল? না কি রোহিঙ্গাদের অন্তিম অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছে ইন্ডিয়া? চীন সহ বিশ্বের অপরাপর দেশগুলো? বার্মীজ রোহিঙ্গাদের কোনো বন্ধু নেই! একমাত্র বন্ধু হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ, কেউ তো রোহিঙ্গাদের কষ্ট বুঝেনা। যে দুজন মানুষ যে দুটি দেশ রোহিঙ্গাদের কষ্ট বুঝতে পেরেছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ, অপরটি হচ্ছে তুরস্ক। যে কারনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলা হয়েছে “মাদার অব হিউমেনিটি“
প্রিয় পাঠক
দীর্ঘদিন পরে কোনো ওয়ের্স্টান মিডিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা শুনে ভালোই লেগেছে। দেশ থেকে বন্ধুবর কবি মাশুক ইবেন আনিস খবর দিলেন, এখানে লন্ডনের এক আওয়ামী বুদ্ধিজীবি বললেন ভাই সুযোগ পেলেই তো আপনি আওয়ামীলীগকে,বিএনপিকে এক হাত দেখিয়ে দেন। এখন তো আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বৃুটিশ মিডিয়া বলছে, মাদার অব হিউম্যানিটি। কিছু লিখুন। বললাম লিখব। প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কারন এত কড় কথা বৃটিশ মিডিয়ায় তা ও আবার চ্যানেল ফোর এর মত প্রতিষ্টানে। বৃটেনে যে কয়জন হাতে গুনা সাংবাদিককে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডাউনিংষ্ট্রীট সহ বৃটিশ ষ্টাবলীস্টমেন্ট সমীহ করে কথা বলে তার মধ্যে চ্যনেল ফোর এর জন স্নো হচ্ছেন অন্যতম। টনি ব্লেয়ার তখন প্রধানমন্ত্রী, ইরাক যুদ্বের দুর্বিসহ সময়, গোটা বৃটেনের মানুষ তখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে , একজন মাত্র মানুষ তিনি টনি ব্লেয়ার, তিনি বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। তিনি যাবেন যুদ্ধে। সিদ্ধান্তে অটল টনি ব্লেয়ার। কেউ তাকে ফেরাতে পারছেনা। উপেন অব মাসডিষ্ট্রাকশন নিয়ে টনি ব্লেয়ার আর বুশ সাহেব চিন্তিত, চিন্তিত পৃথিবীর নিরাপত্তা নিয়ে। বৃটিশ পলিটিশীয়ানরা দ্বিধাভিবক্ত। চ্যানেল ফোর এর সাথে সাক্ষাতকার দিতে গেলেন তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের চরম প্রতাপশালী ডিরেক্টর অব কমিউনিকেশন্স আন ইলেক্টেড বরুক্রেট (প্রেস সচিব) আলেস্টার ক্যম্পেবেল। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় চ্যানেল ফোর এর জন ন্সো আর আলাষ্টারের মধ্যে। গোটা বৃটিশ জাতী অবাক বিস্ময়ে দেখলো ডজি ডসিয়ার নিয়ে কি চরম মিথ্যাচার করছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব (ডিরেক্টর অব কমিউনিকেশন্স)। লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সেই জন ন্সো এর চ্যানেল ফোর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলছে রোহিঙ্গা ইসৃ্যুতে “মাদার অব হিউম্যানিটি“ আমি রির্পোটটি দেখলাম। একবার নয় তিনবার। না ভূল করে বলেননি। জুলস গার্নেল নামের রির্পোটারের কথাগুলো শুনলে মনে হয় বারবার শুনি। প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে? আর তা যদি হয় খরা বন্য দুর্ভিক্ষ পীড়িত দেশের প্রধানমন্ত্রীর।
বাংলাদেশের কোনো সাংবাদিক বলেননি শেখ হাসিনাকে “মাদার অব হিউম্যানিটি“ বলেছেন বৃটিশ জার্নালিস্ট। হোয়াট এ রিপোর্ট? বাংলাদেশের কোনো সাংবাদিক বা লেখক যদি হতেন তিনি হয়তো বলতেন গনতন্ত্রের মানস কন্যা, অগ্নি কন্যা, বঙ্গ কন্য, দেশ নেত্রী, দেশ নায়ক, বাতাস দেয়ার অথবা চামচামীর গন্ধ থাকতো সে সব লেখায়। আমি মাঝে মধ্যে ভাবি বাংলাদেশের এ সব সাংবাদিকরা কি নির্লজ্জ বেহায়াদের মত রাষ্ট্র প্রধান সরকার প্রধানকে তৈল মর্দন করে!! ইদানিং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স গুলো লাইভ হয়। লাইভে দেখা যায় বিভিন্ন চ্যানেলের মালিক, রিপোর্টারের তৈল মর্দন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। ওরা খাটি সরিষার তৈল নিয়ে যায়। সাংবাদিক রিপোর্টার প্রশ্ন করে দলীয় দৃষ্টিকোন থেকে। লন্ডনে যে তৈল মর্দন হয়না তা কিন্তু না । একবার আমার মনে আছে, মাইকেল হাওয়ার্ড তখন কনজারভেটিব পার্টির নেতা। নির্বাচন আসলো। সাধারন নির্বাচন। ডেইলী সান নামক ট্যবলয়েড পত্রিকাটি সম্পাদকীয় লিখে বসলো হ্ওায়ার্ডকে নিয়ে “লিখলো, হি লুকস লাইক এ প্রাইম মিনিষ্টার, হি ওয়াকস লাইক এ প্রাইম মিনিষ্টার, হি টকস লাইক এ প্রাইমমিনিষ্টার। অনেকেই সে সম্পাদকীয়টির সমালোচনা করেছিলেন। অথচ এই হাওয়ার্ড ছিলেন এক সময় তথা ৯০ দশকে হোম সেক্রেটারী অর্থাৎ স্বররাষ্টমন্ত্রী। তৎকালীন সময়ে লন্ডনে বর্ণবাদীদের হামলা বেড়ে গিয়েছিল। পূর্ব লন্ডনের বাঙালী অধ্যুষিত এলাকা টাওয়ার হ্যমলেটসে বৃটিশ বাংলাদেশী কুদ্দুস আলীকে মেরে ভর্তা বানিয়ে দিলো বর্ণবাদীরা। হোম সেক্রেটারী মাইকেল হাওয়ার্ড এসেছিলেন পূর্ব লন্ডন সফর করতে। ব্রিকলেইন মসজিদ ভিজিট করে বাইরে এসে তিনি বলেছিলেন এথনিক মিডিয়ার সাথে কথা বলবেন। বৃটিশ মেইনষ্ট্রিম মিডিয়ার উপস্থিতি ছিল সরব। আমার তখন মোচ দাড়ী গজায়নি ভালোভাবে। আমি দাড়িয়েছিলাম মসজিদের সামনে। মাইকেল হাওয়ার্ডকে জিজ্ঞাস করেছিলাম বৃটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বেন্ড করার কোনো পরিকল্পনা কি তার সরকারের রয়েছে? তিনি বলেছিলেন বৃটেন ইজ এ ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি। প্রত্যেকটি পার্টির রাইট রয়েছে ডেমোক্রেসির প্রেকটিস করার। আমি সম্পূরক প্রশ্ন করেছিলাম, জিজ্ঞাস করেছিলাম হোয়াট এবাউট আই আর এ, তৎকালীন সময়ে আই আর এর বোমা হামলায় বৃটিশ জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। বলেছিলাম বৃটিশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি যদি রাজনৈতিক দল হয় তাহলে আই আর এ ও তো দল তাদেরও তো রাইট রয়েছে বোমা মেরে ডেমোক্রেসির প্রাকটিস্ করা। হাওয়ার্ড অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন। আজকের আন সান সুচির মেলেটারী তো গনতন্ত্রের প্রাকটিস করেছনা রোহিঙ্গায়? বোদ্দিষ্টরা কিভাবে মুসলমানদের উপর অত্যাচার করছে তা কি বিশ্ববাসী দেখছেনা? বোদ্দিষ্টরা কি রকম কাপর পড়ে মুসলমানদেরকে হত্যা করছে। হিন্দুদের দূতির মত দুতি পড়ে যখন রাস্তায় হাটে আমার তখন মনে হয় দূতিটা একটু ফাক করে——–।
গোটা বিশ্ব এতদিন বলে আসলো মুসলমানরা সন্ত্রাসী। ইসলাম ধর্ম হচ্ছে সন্ত্রাসের ধর্ম। মুসলমান মানেই হচ্ছে জঙ্গী, মুসলমান মানেই হচ্ছে উগ্র, মুসলমান মানেই হচ্ছে লাদেন, সাদ্দাম, গাদ্দাফী। আজ কেন শেখ হাসিনাকে বলা হচ্ছে মাদার অব হিউম্যানাটি??? শেখ হাসিনা তো মুসলমান। আমার ধারনা ছিল ওয়েষ্টের সাংবাদিকরা বলবেন বার্মায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হচ্ছে কারন ওরা জঙ্গী। কিন্তু তারা তা না করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছেন “মাদার অব হিউম্যানেটি“। আমি জানিনা এখানে কি কোনো পলিটিক্স কাজ করছে? মাদার তেরেসা, ফ্লোরেস, নাইটিংগেল , থেকে আজকের মাদার অব হিউমিনিটি। কাজ কি? সবাই মানবতার জন্য কাজ করেছেন।
তবে একটি সমালোচনা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সহ সারা মুসলিম বিশ্বে কাজ করেছে সেটি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের উপর যখন অমানবিক নির্যাতন চলছিল তখন একমাত্র তুরস্ক থেকে প্রতিবাদের আওয়াজ উঠেছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের দেখার আগে তুরস্ক থেকে ছুটে এসেছিলেন তুরস্কের ফাস্ট লেডি। তিনি ঢাকা অবতরন করেই ছুটে গিয়েছিলেন নির্যাতীত রোহিঙ্গাদের পাশে। তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো হাই-অফিসিয়েল যাননি কক্সবাজার অথবা টেকনাফে। নাফ নদীর তীরে তখন ভাসছিল বিশ্ব মানবতা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আরদোগান প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেরীতে হলেও রোহিঙ্গাদের পাশে দাড়িয়েছেন। বলেছেন তাদের যাতে কোনো কষ্ট না হয়! কি অপরাধ ছিল কমন পিপুলদের? কি অপরাধ মহিলাদের? কি অপরাধ ছোট ছোট শিশুদের?
প্রিয় পাঠক আমি ৭১ দেখিনি, আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিনি, আমি হিটলারের অত্যাচার দেখিনি। কিন্তু আমি ইরাক ওয়ার দেখেছি, আমি প্যালেষ্টাইনীদের উপর অত্যাচার দেখছি,সিরিয়ার মত সোনার একটি দেশকে ধ্ব্ংস করতে দেখেছি, আফ্রিকার কালো মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রমী নেতা ন্যলসেন ম্যন্ডালাকে ২৭ বছর জেল খাটতে দেখেছি, বার্মার আন সাং সুচীর গৃহবন্দীর গল্প আমি শুনেছি, আবার সেই সুচির দ্বারা গনহত্যার রুপ কথার গল্প লন্ডনে বসে শুনেছি এবং টিভির পর্দায় দেখছি। এসব আর ভালো লাগেনা। এত অত্যাচার নির্যাতন মানুষ মানুষকে করতে পারে? তা ছিল আমার ধারনার বাইরে।
প্রিয় পাঠক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যে মাদার অব হিউমিনিটি বলেছে বৃটিশ মিডিয়া তাতে আমি আন্তরীক অভিবাদন জানাই চ্যানেল ফোর কে। অভিবাদন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। সেই সাথে আমি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সবাইকে অনুরোধ জানাই রোহিঙ্গাদের অত্যাচারের প্রথম প্রতিবাদ যিনি করেছেন তিনি হচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট মিঃ আরদোগান। তিনি তার স্ত্রী ফাস্ট লেডি মিসেস আরদোগানকে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদেরকে স্বচক্ষে দেখার জন্য। তিনি এসেছিলেন এবং দেখেছেন এবং তিনি জয় করেছেন বিশ্ব্ বিবেককে। আমি মনে করি মাদার তেরেসা থেকে ফুলোরেন্স যদি নাইটিংগেল হতে পারেন শেখ হাসিনা যদি মাদার অব হিউমিনিটি হন তাহলে মিসেস আরদোগান হচ্ছেন মাদার অব ইউনিভার্স।

লেখক সভাপতি ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাব
ব্যবস্থাপনা পরিচালক চ্যানেল আই ইউররোপ