ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে করণীয়

596
gb

অধ্যক্ষ মো. ইয়াছিন মজুমদার : বাংলা নববর্ষ ১৪২৩ উদযাপিত হলো। মুসলানগণ  কিভাবে এ উৎসব পালন করবে ও বর্তমানে কিভাবে পালিত হয় এ বিষয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো। নববর্ষ, বর্ষবরণ, পহেলা বৈশাখ- এ শব্দগুলো বাংলা নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এই উৎসবকে প্রচার মাধ্যমসমূহে বাঙালি জাতির ঐতিহ্য হিসেবে প্রচার করা হয়ে থাকে। তাই জাতিগত একটি ঐতিহ্য হিসেবে এই উৎসবকে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত কর্মকা-কে সমর্থন যোগানোর একটা বাধ্যবাধকতা অনুভূত হয় সবার মনেই- এ যে বাঙালি জাতির উৎসব! তবে বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালি জাতির শতকরা ৮৭ ভাগ লোক আবার মুসলিমও বটে, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে নববর্ষ উদযাপন  এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি যেমন: রবীন্দ্র সংগীত ‘‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’’ এর মাধ্যমে বর্ষবরণ, বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূলে পান্তা-ইলিশের ভোজ, জীবজন্তু ও রাক্ষস-খোক্কসের প্রতিকৃতি নিয়ে গণমিছিল- এবং এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, সহপাঠী সহপাঠিনীদের একে অপরের দেহে চিত্রাঙ্কন- এসবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? ৮৭ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমের এই সকল আচরণে খুশি হন, না ক্রোধান্বিত হন? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচনা করতে চাই।
ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা : আমরা অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে তাতে রয়েছে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় সংস্কার ও ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণ স্বরূপ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড় দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার  অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হতো ২৫শে মার্চ এবং তা পালনের উপলক্ষ ছিল ঐদিন খ্রিস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট এ মর্মে ঐশী বাণী প্রেরিত হয় যে, মেরী ইশ্বরের পুত্র জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা  জানুয়ারি নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এ দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হতো। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন ‘সাবাত’ হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির  উৎসবের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলামের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন। রাসুল (সা.) বলেন ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব রয়েছে আর এটা আমাদের ঈদ’ (বুখারী: ৯৫২ মুসলিম: ৮৯২) বিখ্যাত মুসলিম  প-িত ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এ সম্পর্কে বলেন ‘উৎসব অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ। যা সম্পর্কে আল্লাহপাক কুরআনে বলেন- ‘‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’’ (সুরা আল মায়িদা, ৫:৪৮) ‘‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি অনুষ্ঠান (সময় ও স্থান) নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’’ (সুরা আল হজ্ব ২২:৬৭) যেমনটি কেবলাহ্, সালাত এবং সাওম ইত্যাদি। সেজন্য তাদের (অমুসলিমদের) উৎসব অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। আর বাহ্যিকভাবে এগুলোতে অংশ নেয়া নিঃসন্দেহে পাপ। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) ইঙ্গিত করেছেন, তিনি বলেন: ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’
এছাড়া আনাস ইবনে মালিক (রা.)  থেকে বর্ণিত- ‘‘রাসুল (সা.) যখন মদিনায় আসলেন তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি বললেন ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি? তারা বলল ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এ দিনগুলোর পরিবর্তে উত্তম কিছু দিন দিয়েছেন : ইয়াওমুল আযহা ও ইয়াওমুল ফিতর।’ (সুনানে আবু দাউদ) এ হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে,  ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন জাতির জাতীয় উৎসব স্ব স্ব ধর্মের আলোকে পালন করা যেতে পারে। ইসলামের এই যে উৎসব- ঈদুল ফিতর ঈদুল আযহা- এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয় এবং যে বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, তা হচ্ছে: অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকাণ্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে বেশ কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে। অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন: ‘‘আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।’’ (সূরা আয যারিয়াত: ৫১:৫৬) সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা। তাইতো দেখা যায় যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা- এ দুটো উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ রোজা ও হজ্ব পালন সম্পন্ন করাকে কেন্দ্র করে।
নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক : হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর দাদা তার পিতাকে পারস্যের নওরোযের দিন (নববর্ষের দিন) আলী (রা.) এর নিকট নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু হাদিয়া ও পেশ করেছিলেন। (হাদিয়াটি ছিল নওরোয উপলক্ষে) আলী (রা) বললেন ‘‘নওরোযুনা কুল্লা ইয়াওম’’ মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ। (আখবারু আবু হানিফা)  অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব নিকাশ করবে এবং নবউদ্যমে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এর এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নববর্ষ উপলক্ষে পরস্পর উপহার আদান-প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের কোন গুরুত্ব ইসলামে নেই। নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দুরীভূত হয় পুরনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি- এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ।
এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান ইসলামে নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান হীরকখ-, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করে জান্নাতের মালিক হবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোন বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোন উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মুহাররামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবী করীম (সা.) এর ওফাতের বহু পরে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর শাসন আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ উদ্যাপন ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্ব পূর্ণ নয়। এর সাথে জীবনের কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, কেউ যদি এ ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে বা যদি সে মনে করে যে, আল্লাহ এ উপলক্ষ দ্বারা মানব জীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন তবে তবে তার শিরক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি : যার অনেকগুলোই ইসলাম সমর্থিত নয়: আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে: বৈশাখী মেলা, যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের ব্যবস্থা, প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানো, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষকরণ, নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীদের সংগীত, পান্তা-ইলিশ ভোজ, চারুশিল্পীদের শোভাযাত্রা, রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান ‘‘এসো হে বৈশাখ’’ এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্র-পত্রিকার বিশেষ কোড়পত্র। প্রভৃতি আমাদেরকে খুঁজে দেখতে হবে এর কোনটি ইসলাম সমর্থিত এবং কোনটি ইসলাম সমর্থিত নয়। মুসলমান হিসেবে ইসলাম সমর্থিত অংশটুকু পালন করা যেতে পারে।
এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকাণ্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক :
সূর্যকে স্বাগত জানানো ও বৈশাখকে সম্বোধন করে স্বাগত জানানো : এ ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র, যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতি পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে আসছে। যেমন খ্রিষ্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় ‘‘অ্যাটেনিসম’’ মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলতো। এমনিভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদের পাওয়া যায়। মানুষের ভক্তি ও ভালোবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির প্রতি আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “ক্লাসিকাল ট্রিক” বলা চলে।
শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কুরআনে বলেন- “আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে” (সুরা আল নামল: ২৭:২৪)
আজকের বৈশাখী নববর্ষ উদযাপনে গান গেয়ে বৈশাখী সূর্যকে স্বাগত জানানো, আর কুরআনে বর্ণিত প্রাচীন জাতির সূর্যকে সিজদা করা বা সম্মান জানানো, আর উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সৌর-নৃত্য-এগুলোর মধ্যে চেতনাগত কতটুকু পার্থক্য আছে? বরং এ সবই স্রষ্টার দিক থেকে মানুষকে অমনোযোগী করে সৃষ্টির আরাধনার প্রতি তার আকর্ষণ জাগিয়ে তোলা বলে মনে হয়।
নববর্ষে মুখোশ নৃত্য, গম্ভীরা গান ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল : গম্ভীরা উৎসবের যে মুখোশ নৃত্য, তার উৎস হচ্ছে কোচ নৃগোষ্ঠীর প্রাচীন কৃত্যানুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে ভারতীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধগণ এই নৃত্য আত্তীকরণ করে নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করে। জন্তু-পূজার উৎস পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার কিছু ধর্মীয় মতবাদে, যেখানে দেবতাদের জন্তুর প্রতিকৃতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইসলামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সকল প্রকার মিথ্যা দেবতার অবসান ঘটিয়ে একমাত্র প্রকৃত ইলাহ বা মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদাতকে প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষের সকল ভক্তি, ভালবাসা, ভয় ও আবেগের কেন্দ্রস্থলে তিনি আসীন থাকেন। অপরদিকে শয়তানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বিবিধ প্রতিকৃতির দ্বারা মানুষকে মূল পালনকর্তার ইবাদত থেকে বিচ্যুত করা। আর তাই তো ইসলামে প্রতিকৃতি কিংবা জীবন্ত বস্তুর ছবি তৈরি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে (জীবন্ত বস্তুর) ছবি তৈরীকারীরা।” (বুখারী: ৫৯৫০’ মুসলিম: ২১০৯) অন্য হাদীসে রাসুল (সা.) বলেন- “যে কেউই ছবি তৈরি করলো, আল্লাহ তাকে (কিয়ামতের দিন) ততক্ষণ শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে এতে প্রাণ সঞ্চার করে, আর সে কখনোই তা করতে সমর্থ হবে না।” (বুখারী : ২২২৫, মুসলিম: ২১১০)
নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা : শিরকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের পরেই নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ-বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তা হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূল, চারুকলার মিছিল এর সর্বত্রই সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীকে পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত দেখা যায়। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে যে সকল আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন- “আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোন ফিতনা রেখে যাচ্ছি না।” (বুখারী: ৫০৯৬, মুসলিম: ২৭৪০) ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছে, পাশাপাশি নারী ও পুরুষের বিচরণ ক্ষেত্রও আলাদা নির্ধারণ করেছে এবং দৃষ্টি অবনত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যে সমাজ নারীকে অশালীনতায় নামিয়ে আনে, সেই সমাজ অশান্তি ও সকল পাপ কাজের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়, কেননা নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের চরিত্রে বিদ্যমান অন্যতম অদম্য এক স্বভাব, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সামাজিক সমৃদ্ধির মূলতত্ত্ব। আর এজন্যই ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সস্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপাওে শৈথিল্যের ফলাফল দেখতে চাইলে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকানোই যথেষ্ট, গোটা বিশ্বে শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঝাণ্ডাবাহী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয় মিনিটে একজন নারী ধর্ষিতা হয়। নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাল-চলন নিয়ে ইসলামের বিধান আলোচনা করা এই নিবন্ধের আওতা বহির্ভূত, তবে এ সম্পর্কে সামান্য কিছু ঈঙ্গিত দেয়া হয়েছে মাত্র। এই বিধি-নিষেধের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীর যে অবাধ উপস্থিতি, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পরপুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা- তা পরিপূর্ণভাবে ইসলামবিরোধী, তা কতিপয় মানুষের নিকট যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয়ই হোক না কেন। এই অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
সঙ্গীত ও বাদ্য : নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। যেকোন বাদ্যযন্ত্রকেও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন বিশেষ কিছু উপলক্ষে দফ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুমতি হাদীসে এসেছে। তাই যে সকল স্থানে এসব  হারাম সংগীত উপস্থাপিত হয়, যেমন- রমনার বটমূল, বৈশাখী মেলা এবং নববর্ষের অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি, সে সকল স্থানে যাওয়া, এগুলোতে অংশ নেয়া, এগুলোতে কোন ধরনের সহায়তা করা কিংবা তা দেখা বা শোনা সকল মুসলিমের জন্য বর্জনীয়।
তাছাড়া অনর্থক কথা ও গল্প-কাহিনী যা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তা নিঃসন্দেহে মুসলিমের জন্য বর্জনীয়। অনর্থক কথা, বানোয়াট গল্প-কাহিনী এবং গান-বাজনা দ্বারা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে রাখা শয়তানের পুরোনো কূটচালের একটি, আল্লাহ এ কথা কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন- “এবং তাদের মধ্যে যাদেরকে পার পর্যায়ক্রমে বোকা বানাও তোমার গলার স্বরের সাহায্যে” (সূরা আল ইসরা, ১৭:৬৪) যে কোন আওয়াজ, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহ্বান জানায়, তার সবই এই আয়াতে বর্ণিত আওয়াজের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসীরে ইবনে কাসীর) রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন : “আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।” (বুখারী: ৫৫৯০) এছাড়াও এ ধরনের অনর্থক ও পাপপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এবং আল্লাহর রাসুলের হাদীসে। উপরন্তু নববর্ষ উপলক্ষে যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোর কোন কোটির কথাও শিরকপূর্ণ, যে সকল মুসলিমের মধ্যে ঈমান এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের উচিত এসব কিছুকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাগ করা।
মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় : সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষ সংক্রান্ত অধিকাংশ অনুষ্ঠান ইসলামী নির্দেশনা বহির্ভূত। এজন্য যে এতে নিম্নেলিখিত ইসলামবিরোধী বিষয় রয়েছে।
শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি ও চেতনা, সংগীত, মূর্তি বহন, নগ্নতা, অশ্লীলতা, গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান, সময় অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ।
এ অবস্থায় মুসলমানগণ ইসলাম সম্মতভাবে অনুষ্ঠান পালন করতে পারে। এ বিষয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্ব হবে যে কোন ধর্মের নিষিদ্ধ বিষয় নববর্ষের অনুষ্ঠানে না রাখা বা যার যার ধর্মীয় বিধান ঠিক রেখে আলাদা ভাবে পালনের ব্যবস্থা করা। মুসলমানদের উচিত ইসলামবিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকা। মসজিদের ইমামগণ এ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করবেন। পরিবারের প্রধান এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে, তার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের অনুষ্ঠানে অনৈসলামিক কাজে লিপ্ত না হয়। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তার বন্ধুব বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের মানুষকে উপদেশ দিবেন এবং নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান যেন লঙ্ঘিত না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিবেন। পুরাতন বছরের সহ অতীতের পাপরাশির জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা সে সাথে নতুন বছরসহ ভবিষ্যতে পাপ না করার ও দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ব হয়ে দেশের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করা, আল্লাহর আনুগত্যের তৌফিক কামনা করা, দেশ ও সমগ্র মুসলিম জাতির সুখ সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনায় আল্লাহর নিকট বিশেষ প্রার্থনা করা। ঢেঁকি, কুলা, হস্তশিল্প তথা গ্রামীণ ব্যবহৃত ঐতিহ্যগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More