রাজধানীজুড়ে পানির তীব্র সংকট

315
gb

ওয়াসা কর্মচারীদের পানি-বাণিজ্য:ওয়াসার এক গাড়ি পানির দাম ৫শ টাকা হলেও সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেড় হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ

গ্রীষ্ম মৌসুম না আসতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র পানিসংকট। কোথাও ১০ দিন আবার কোথাও এক মাস ধরে পাওয়া যাচ্ছে না পানি। আবার কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও তা মাত্র ১ ঘণ্টার জন্য বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা। পানির এমন সংকটে গৃহস্থালীর কাজ থেকে শুরু করে মসজিদেও সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন মুসল্লিরা। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটতো রয়েছেই। পানিসংকটের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জরুরি সরবরাহের পানি নিয়ে বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে ওয়াসার একশ্রেণির অসাধু কর্মচারী। ওয়াসার এক গাড়ি পানির দাম যেখানে ৫শ টাকা সেখানে সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেড় হাজার টাকা করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। অথচ ভুক্তভোগীদের পানিসংকট এবং পানি-বাণিজ্যের এমন অভিযোগ মানতে নারাজ ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। ২৩০ কোটি লিটার পানির চাহিদা থাকলেও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, ২৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করতে সক্ষম তারা। চাহিদার চেয়েও বেশি পরিমাণ পানির উৎপাদন হলেও রাজধানীতে ওয়াসা গ্রাহকরা কেন পানি পাচ্ছেন না এ নিয়ে ক্ষুব্ধ রাজধানীবাসী। রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে সরেজমিন গিয়ে কথা বলে জানা যায়, গ্রীষ্মের মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গত চার-পাঁচ দিন ধরে পানিই পাওয়া যায়নি।
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৫৮৭ হানিফ ভিলার নিচতলায় ভাড়া থাকেন কুলসুমা বেগম। তিনি জানান, গ্রীষ্ম শুরুর পর থেকেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বাড়িওয়ালাকে ওয়াসার সাথে কথা বলতে বললে তিনি বলেন, তারা কি করবে। তাদের অনেকবার বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ৬৬১ নম্বর বাড়ির মালিক জুয়েল মোহাম্মদ জানান, গরমের সিজন এলে প্রত্যেকবারই এ সমস্যা হয়। এখনো হচ্ছে। তাই আমরা পানি আসলে সংগ্রহ করে রাখার চেষ্টা করি। পানির সমস্যা ওয়াসা কোনো দিনও দূর করতে পারবে না বলে দাবি করেন তিনি। ওয়াসার সাথে আগেও অনেকবার যোগযোগ করে কোনো সমাধান না পাওয়ায় এখন আর তারা ওয়াসার দ্বারস্থ না হয়েই পানির সংকট সহ্য করে যাচ্ছেন বলেও জানান জুয়েল মোহাম্মদ। এছাড়াও পাশ^বর্তী এলাকা কাফরুলের বেশ কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে কথা বলে জানা যায়, ওই সব বাড়িগুলোতে পানির কোনো সমস্যা নেই। তারা নিয়মিত পানি পাচ্ছেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা বলছেন, রাস্তার বিপরীত পাশে কাফরুল এলাকায় নিয়মিত পানি পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে শেওড়াপাড়া অংশে চার-পাঁচ দিন ধরে পানি নেই।
এছাড়া মিরপুরের বরবাগ এলাকার নজরুল ইসলাম নামের একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের এলাকার কিছু অংশকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। ১০ বছর ধরে আমরা পানির জন্য কষ্ট করছি কিন্তু পানি পাই না। এই পানির জন্য ঘুরতে ঘুরতে কয়েক জোড়া জুতা ক্ষয় করেছি, সমাধান পাইনি। উত্তর ইব্রাহিম পুরের শহিদুল ইসলাম নামের আরো একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিনের পর দিন যায় কিন্তু ঠিকমতো ওয়াসার পানি পাওয়া যায় না। পানির জন্য বারবার ওয়াসা কার্যালয়ে গেলেও কোনো লাভ হয় না। এদিকে, অন্যান্য এলাকার ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাত ১১টায় কিছুটা পানি আসে আর ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সে পানির জন্য সিরিয়াল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এমনকি এ পানি সংগ্রহ করতে অনেকেরই সারা রাত জেগে থাকতে হয়। এভাবে গত ১৫ দিন ধরেই চলছে। প্রায় দেড় কোটি মানুষের এ শহরে বিশুদ্ধ পানি পাওয়াটা বর্তমানে দুষ্কর হয়ে পড়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময়েই অনেক এলাকায় পানি থাকে না, পানির জন্য হাহাকার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক এলাকায় রান্না, ধোয়ামোছাসহ জরুরি কাজ কিছুই ঠিকভাবে হচ্ছে না। কোনো কোনো এলাকায় মসজিদেও পানির সংকট তৈরি হয়েছে। মুসল্লিরা অজু করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, একমাস ধরে পানির সংকট চলছে মধুবাগের ঝিলপাড় এলাকায়। পানির জন্য আশপাশের এলাকায় ছুটছেন অনেকে। বাধ্য হয়ে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করছেন পানি। এলাকাবাসী মিলে চাঁদা তুলে কিনে নিচ্ছেন ওয়াসার জরুরি সরবরাহের পানি। এতে বড়জোর খাবার চাহিদাই মেটে। ওই এলাকার এক গৃহবধূ বলেন, একমাসেরও বেশি সময় ধরে পানি পাচ্ছি না। একটু ময়লা পানি এলেও হতো। কারণ তা দিয়ে পরিবারের লোকজন অন্তত বাথরুমে যাওয়ার কাজ সারতে পারতো। রামপুরা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বেশিরভাগ এলাকায় ওয়াসার লাইনে পানি আসে দিনে একবার। আর তখনই হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকজন। ১৫ দিন ধরে পানি নেই। প্রতিদিন ৩শ টাকা ভাড়া দিয়ে দূর থেকে পানি আনাতে হয়। যেসব এলাকায় পানির সংকট নেই, সেখানকার পানিও ময়লা দুর্গন্ধের কারণে খাবারের অযোগ্য, এমনটাই বলছেন ভুক্তভোগীরা। পানির এমন সংকট খিলগাঁও, মিরপুর, বাসাবো, মগবাজার, মধুবাগ, নয়াটোলা, চেয়ারম্যান গলি, মীরবাগ, বনশ্রী, সেগুনবাগিচা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, মিরহাজিরবাগ, দোলাইপাড়, উত্তরা, কুড়িল, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর অনেক এলাকায়। তবে তা মানতে নারাজ ওয়াসা। তাদের দাবিÑ চাহিদার চেয়ে বেশি পানি উৎপাদন করা হচ্ছে।
ওয়াসার পরিচালক প্রকৌশলী তাসকিম এ খান বলেন, ওয়াসার পানির সংকট নেই তবে সমস্যা আছে। আমরা জানি কোথায় কতটুকু পানি লাগবে, কোথায় কি সমস্যা। তাছাড়া আমাদের পকেট সমস্যা আছে। সেটাকে ওভারকাম করার চেষ্টা করছি। হয়তো দুই শতাংশ মানুষের সমস্যা আছে। কর্মচারীদের পানি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের ভুমিকা জানতে চাইলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন কল কেটে দে