উন্নয়নশীল বাংলাদেশ ও মুক্তির সংগ্রাম

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

412
gb

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন একবার, আর ‘মুক্তি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন পাঁচ বার। ‘স্বাধীনতার’ চেয়ে অনেক তাত্পর্যপূর্ণ শব্দ ‘মুক্তি’। মুক্তি বলতে সকল বঞ্চনা, বৈষম্য, শোষণ, সংকীর্ণতা, কুপমণ্ডুকতা, চেতনার দীনতা থেকে মুক্তি বুঝিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের মুক্তির সংগ্রাম চলছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের সিঁড়িতে পা রেখেছে। ২০২৪ সালে চূড়ান্ত সমাবর্তন হবে। নির্দিষ্ট তিনটি মানদণ্ডের সবকটিতে উত্তীর্ণ হয়েই বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা, যে হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে এই উত্তরণ ঘটল, এগুলো বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত কোনো পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি। সূচকসমূহ জাতিসংঘের নিজস্ব পদ্ধতিতে তাদের সংগৃহীত পরিসংখ্যান-নির্ভর। যদিও পরিসংখ্যান সবসময় সত্য কথা বলে না। ১৯০৬ সালে মার্ক টোয়েন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘সংখ্যা কখনো কখনো আমাকে বিভ্রান্ত করে।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন ডিজরেইলি নাকি বলেছিলেন, “মিথ্যা তিন প্রকার : মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান।’ যার কারণে পরিসংখ্যান ব্যবহার না করেই বলা যায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ, বদলে গেছে বাংলাদেশ। ৭ মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় রাজনীতির কবি (পোয়েট অব পলিটিক্স)। বঙ্গবন্ধু রচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ওপর গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা এবং ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যটি তৈরি করেছেন তাঁর কন্যা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু’র দিকে তাকালেই মনে পড়ে যাবে ‘৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’র স্থাপত্য রূপ এটি।

আশ্চর্যের হলো সমগ্র জাতি যখন উন্নয়নশীল দেশের যাত্রাকে স্বাগত জানাচ্ছে, প্রেস ব্রিফিং করে পল্টন থেকে তার বিরোধিতা করছে বিএনপি। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকাভুক্তির সার্টিফিকেটটি দিয়েছে জাতিসংঘ। এটি গ্রহণ না করে এ নিয়ে উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে বাংলাদেশের আর কী করার ছিল। বিরোধী দল থেকে সরকারের পরিসংখ্যানকে বিশ্বাসযোগ্য নয়- বলা হচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়াকে বুঝতে তো পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই। বিদ্যুত্-এর যে লোড শেডিং নেই, রাস্তা পাকা, সবাই যে কর্মব্যস্ত তা তো সে নিজেই দেখতে পাচ্ছে। যে দেশে মহিলাদের পেশার ঘরে নব্বই শতাংশে ক্ষেত্রে লিখতে হতো গৃহিণী। এখন কেবলই গৃহিণী বলতে আর কেউ অবশিষ্ট আছে বলে মনে হয় না। গ্রামের প্রত্যেক মহিলাই কোনো না কোনো ইনকাম জেনারেটিং কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট। তীব্র অভাব-অনটন বলতে যা বুঝায় তা এখন একেবারে নেই বললেই চলে।
মাথাপিছু আয় বেড়েছে, গড় আয়ু বেড়েছে, পরিবারের জন্য পণ্য ও সেবা ক্রয়ের সংখ্যা ও পরিমাণ বেড়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে, চিকিত্সাসেবা নাগালের মধ্যে এসেছে, ব্যয়ও বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আয় না বাড়লে ব্যয় বাড়ল কীভাবে। তাছাড়া একজনের ব্যয় তো অন্য জনের আয়ও বটে। তবে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। আয় বাড়ার সাথে আয়ের বৈষম্য কমাতে হবে। শিক্ষার পরিমাণগত ব্যাপকতা বাড়লেও মানগত গভীরতার দিকে আমাদের আরও অনেক মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অধিকতর বিনিয়োগ করে আমাদের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে আরো উন্নতি করতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভেডেন্টকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়নখাতে অধিকতর বিনিয়োগ করতে হবে। মানবসম্পদের উন্নয়ন ও সুশাসনই কেবল আমাদের ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণের এনট্রাস পরীক্ষা চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণের নিশ্চয়তা দেবে। মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের ভাষায় বলতে হয়, ‘বাট আই হ্যাভ প্রমিজ টু কিপ। অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ।’