শায়খ রশিদ খান ||
এই সপ্তাহের খুতবায় আমি এমন এক বিষয়ে চিন্তা করতে চাই, যেটা আমরা অনেক সময় উপেক্ষা করি। কুরআন শুধু নিয়ম-কানুন আর কাহিনীর গ্রন্থ নয়। এটা হচ্ছে আরোগ্য দানকারিও। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- হে মানুষ, তোমাদের নিকট এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এবং অন্তরের রোগসমূহের জন্য শিফা। (সূরা ইউনুস, ১০:৫৭)
এই আয়াত খুবই শক্তিশালী। আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন তাঁর বাণী কেবল দিকনির্দেশনা নয়, বরং প্রকৃত আরোগ্য। যখন অন্তর ভারী হয়ে যায়, কুরআন তাকে হালকা করে । যখন শরীর অসুস্থ হয়, কুরআন আরোগ্য দিতে পারে। তবে শর্ত হলো, আমরা যদি এতে বিশ্বাস রাখি।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে চারপাশ বিভ্রান্তিতে ভরপুর । ছুটি, উইকএন্ড, স্কুলের বিরতি—এসবকে আমরা অনেক সময় শুধু আরাম আর অবসরের সুযোগ মনে করি । অথচ এগুলো আমাদের জন্য ফাঁদও হতে পারে। বিশ্রাম ভুল নয়, কিন্তু যখন আমরা উদাসীন হয়ে যাই, তখন শয়তান প্রবেশের সুযোগ পায়।
আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন: অতঃপর তারা যখন ভুলে গেল যা দ্বারা তাদেরকে স্মরণ করানো হয়েছিল, তখন আমি তাদের জন্য সর্ব প্রকার কল্যাণের দুয়ার খুলে দিলাম; এমনকি যখন তারা যা পেয়েছে তাতে উল্লসিত হলো, তখন আমি হঠাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম, অতঃপর তারা হতাশ হয়ে গেল। (সূরা আনআম, ৬:৪৪)।
এই আয়াতে রয়েছে স্পষ্ট সতর্কতা। যখন আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ডুবে যাই, আল্লাহকে ভুলে যাই, তখন আমরা দুর্বল হয়ে যাই। তখন আমরা উদাসীন হয়ে পড়ি। তখন আমরা আমাদের আধ্যাত্মিক ঢাল পবিত্র কুরআনকে ভুলে যাই।
কিন্তু কুরআন শুধু নিয়মের বই নয় । এটা আমাদের সুরক্ষা। এটা আমাদের আরোগ্য দাতা। এই আরোগ্য হচ্ছে আত্মিক ও শারীরিক দুই দিকেই । দুঃখ, বিভ্রান্তি, চাপ বা অসুস্থতা—যখনই আসে, কুরআন আমাদের প্রথম ওষুধ । তবে তখনই কার্যকর হবে, যদি আমরা এতে ঈমান রাখি ।
রাসূল (সাঃ) আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় শিখিয়েছেন, যার মাধ্যমে কুরআনের এই শিফা পাওয়া যায়। সেটি হলো রুকইয়াহ । রুকইয়াহ তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে হয়: আন্তরিকতা ও উদ্দেশ্যসহ কুরআন তিলাওয়াত করা।
মনোযোগ সহকারে শোনা। আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে দো'আ করা। এর একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত সাহাবি আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ)-এর ঘটনা । তিনি অসুস্থ এক ব্যক্তির উপর সূরা আল-ফাতিহা তিলাওয়াত করেছিলেন । কোনো দীর্ঘ রীতি নয়, কোনো জাদু নয়—শুধু আন্তরিক তিলাওয়াত । আর আল্লাহর ইচ্ছায় সেই ব্যক্তি আরোগ্য লাভ করেছিলেন।
এটাই রুকইয়াহ। এটা রহস্যময় কিছু নয়, বা শুধু আলেমদের জন্য নয়। প্রতিটি মুসলিমই নিজের ঘরে, নিজের কণ্ঠে, আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে এটি করতে পারে। কিন্তু আজ অনেকে এই সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। এর বদলে তারা তাবিজ, তন্ত্র-মন্ত্র এমনকি জ্যোতিষীদের কাছে ছুটে যায়।
কিন্তু রাসূল (সাঃ) সতর্ক করেছেন: রুকইয়াহতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ না তাতে শিরক থাকে। যা কিছু আমাদের তাওহীদ থেকে দূরে সরায়—যদিও তা শিফার দাবি করে—তা আসলে বিপদ, ওষুধ নয়।মানসিক স্বাস্থ্যও ইসলামের অংশ। অনেক সময় আমরা মনে করি একজন প্রকৃত মুমিন কখনও দুঃখিত বা উৎকণ্ঠিত হয় না। কিন্তু রাসূল (সাঃ) এ কথা শেখাননি । বহু সাহাবি তাঁর কাছে তাদের দুঃখ ও ভয় প্রকাশ করেছেন। তিনি (সাঃ) তাদের দোষারোপ করেননি, বরং তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ আর কুরআন তিলাওয়াত—এ দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই । দুটোই শিফার মাধ্যম। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: আল্লাহ এমন কোনো রোগ পাঠাননি, যার চিকিৎসা তিনি পাঠাননি । অতএব, ওষুধ নাও। কিন্তু কুরআন ভুলে যেও না । দুটোই এসেছে একই চিকিৎসক—আল্লাহর কাছ থেকে।
একবার এক ব্যক্তি তাবেঈনদের আলেম মুতাররিফ ইবন আবদুল্লাহ আশ-শিখখীরকে তাঁর জন্য দোআ করতে বললেন। মুতাররিফ তাঁর আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার জন্য সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন: “না, তুমি নিজেই নিজের জন্য দোআ করো।”
আমরা কত দ্রুত অন্যদের কাছে দোআ চাই, অথচ নিজের হাত তুলে দোআ করতে ভুলে যাই! অথচ বিপদের সময় আমাদের দোআ অন্য সবার দোআর চেয়ে ভারী হয়। আর আল্লাহ শোনেন সেই বান্দার দোআ, যে তাঁকে হতাশা ও আন্তরিকতার সাথে ডাকে।
আমরা প্রায়ই আল্লাহকে সর্বশেষ ভরসা বানাই। সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে তবেই তাঁকে স্মরণ করি । অথচ হওয়া উচিত উল্টোটা। প্রথমেই তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া উচিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্টে স্পর্শ করান, তবে তাঁর ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না । আর যদি তিনি তোমার জন্য কল্যাণ ইচ্ছা করেন, তবে তাঁর অনুগ্রহ ঠেকানোর মতো কেউ নেই। (সূরা ইউনুস, ১০৭)। আল্লাহ-ই নিয়ন্ত্রণকারী। কোনো চিকিৎসা, কোনো ওষুধ, কোনো পরিকল্পনা তাঁর অনুমতি ছাড়া কাজ করে না। সুতরাং যখন ব্যথা আসে—হোক তা অন্তরে বা শরীরে—তখন তাঁর দিকেই ফিরে যাও।
রাসূল (সাঃ) আমাদের সুরক্ষার সহজ কিছু উপায় শিখিয়েছেন। তা হচ্ছে সকাল-সন্ধ্যার আজকার পড়া। পোশাক খোলার বা খাবার শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ বলা। ঘরে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করা। ছবি বা মূর্তি সরিয়ে ফেলা, যেগুলো বরকত আটকে দেয় । মাগরিবের পর শিশুদের ঘরে রাখা । ঘুমের আগে ওজু করা এবং হাত দিয়ে বিছানা ঝাড়া । সর্বদা সময়মতো নামাজ পড়া, আর পুরুষদের জন্য জামাতে নামাজ আদায় করা ।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—গুনাহ থেকে বাঁচা।
মনে রেখো, শয়তান আর তার অনুসারীরা সেই ব্যক্তির মধ্যে প্রবেশ করে, যে অসুরক্ষিত। যদি কেউ নামাজ না পড়ে, কুরআন তিলাওয়াত না করে, ইবাদতে গাফিল থাকে—তাহলে সে এমন একটি ঘরের মতো, যেখানে কোনো তালা নেই। শয়তান সহজেই প্রবেশ করে । কিন্তু যখন আমরা আল্লাহর নিকটে থাকি, তখন ফেরেশতারা আমাদের অন্তর পাহারা দেয়।
হে আল্লাহ! কুরআনকে আমাদের অন্তরের আলো বানিয়ে দিন, আমাদের রোগসমূহের আরোগ্য করুন, আর আমাদের পরিবারগুলোর সুরক্ষা বানিয়ে দিন। আপনি যে শিফা আমাদের দিয়েছেন, তা কখনও যেন আমরা পরিত্যাগ না করি ।আমরা যেকোনো প্রয়োজনে যেন সর্বপ্রথম আপনার দিকে দৌড়াই, শেষে নয় । আমীন।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা। শুক্রবার ১৫ আগস্ট ২০২৫। শায়খ রশিদ খান : অতিথি খাতিব, ইস্ট লন্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার।

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন