বিয়ানীবাজারে পারিবারিক কলহের জের ধরে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন

9,326
gb

মুকিত মুহাম্মদ, বিয়ানীবাজার প্রতিনিধিঃ ||

পারিবারিক কলহের জের ধরে বিয়ানীবাজারে চাচাতো ভাইদের হামলায় ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে খুন হয়েছে আলম হোসেন (২৫) নামক এক যুবক। সে পৌরসভাধীন খাসাড়ীপাড়া গ্রামের মৃত সুলতান আহমদের পুত্র। আজ শুক্রবার বেলা ৩টায় পৌরসভাধীন খাসাড়ীপাড়া গ্রামস্থ দুলুর কলোনীতে এ ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে এক মহিলাসহ দু’জনকে আটক করেছে। থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নিহত আলম হোসেনের বড় ভাই ফ্রান্স প্রবাসী জামিল হোসেনের সাথে বিয়ে হয় পাশের বাড়ির সোনা মিয়ার কন্যা নাজমিন বেগমের। সোনা মিয়া নিহত আলম হোসেনের পিতার আপন চাচাত ভাই হন। বিয়ের পর থেকে জামিল কেবল স্ত্রী’র সাথে সু সম্পর্ক রাখলেও মা সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বৈরী আচরণ শুরু করে। তাদের সাথে যোগাযোগ হ্রাস করা সহ টাকা পয়সা প্রদান থেকেও বিরত থাকে জামিল। এ নিয়ে নাজমিনের সাথে পরিবারের সদস্যদের মনোমালিন্য ও পারিবারিক কলহ চলে আসে দীর্ঘদিন থেকে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ নাজমিনের প্ররোচনায় জামিল তাদের সাথে এমন আচরণ করছে। এ নিয়ে নাজমিনের পরিবার ও জামিলের পরিবারের মধ্যে বাকবিতন্ডা ও ঝগড়া ইতিপূর্বে একাধিকবার হয়েছে। পারিবারিক ঐ কলহের জের ধরে ঘটনার দিন বেলা ২টায় নাজমিনের ভাই ফুয়াদ ও তার আপন চাচা এবং চাচাতো ভাইরা মিলে প্রতিপক্ষ জামিলের ভাই ও আপন চাচাতো ভাইদের সাথে ঝগড়া বাঁধে। এ সময় উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া লিপ্ত হয়। স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে বড় ধরণের সংঘর্ষ থেকে উভয় পক্ষ নিবৃত করে। এ সময় প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয় মৃত আলা উদ্দিনের পুত্র মোঃ রুবেল আহমদ (২৫) ও মৃত মঈন উদ্দিনের পুত্র জাহেদ আহমদ (২২)। স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ যার যার বাড়িতে চলে যায়। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঐ ঘটনার সাথে আলম হোসেন জড়িত ছিল না তৎসময়ে সে পৌরশহরে ছিল। এ ঘটনার প্রায় ঘন্টাখানেক পর বেলা ৩টার দিকে আলম হোসেন শহর থেকে বাড়ি ফিরছিল। বাড়ির নিচে দুলুর কলোনীর কাছে পৌছামাত্র পূর্ব থেকে ওৎপেতে থাকা নাজমিনের পরিবারের সদস্যরা দা, ছুরি, লাঠি নিয়ে তার উপর হামলা চালায়। প্রাণ বাঁচাতে সে দৌড়ে দুলুর কলোনীর ভিতরে আশ্রয় নেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। সংঘবদ্ধ প্রতিপক্ষরা তাকে ঘিরে ধরে ছুরি ও দা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে নির্মমভাবে উপর্যুপরি আঘাত করে। তাদের আঘাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আলম হোসেন। পরে কলোনীর লোকজনের চিৎকারে আলমের বাড়ির ও আশপাশ লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে। কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করে। খবর পেয়ে বিয়ানীবাজার থানার ওসি তদন্ত জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। ঘটনাস্থল থেকে হামলায় জড়িত সন্দেহে দু’জনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। আটককৃতরা হলো, মতিউর রহমানের শ্যালক জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা জামিল আহমদ ও মতিউর রহমানের স্ত্রী রুমা বেগম। নিহত আলম হোসেনের এক চাচাতো বোন এ প্রতিবেদককে জানায়, নাজমিনকে নিয়েই এ ঘটনার সূত্রপাত। বিয়ের পর থেকে নাজমিন’র প্ররোচনায় জামিল পরিবারের বাকি সদস্যদের সাথে বিরূপ আচরণ করতো। তিনি বলেন, নাজমিনের ভাই ফুয়াদ, তার চাচা মতিউর, মতিউরের শ্যালক জকিগঞ্জের জামিল আহমদ, ফুয়াদের চাচা ফয়জুর রহমানের পুত্র শিপন, শাহজাহান, শরীফ ও গ্রামের আরও দু’জন লোক মিলে কলোনীর ভিতর আলমের উপর হামলা চালায়। ঐ ব্যক্তিরাই তাকে ছুরি ও দা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে উপর্যুপরি আঘাত করে খুন করেছে বলে তিনি দাবী করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিহত আলম হোসেন ৩ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। বড় ভাই জামিল ফ্রান্স প্রবাসী ও ছোট ভাই কাতার প্রবাসী। তাদের এক বোন ফরিদা ইয়াসমিন মিনু, সম্প্রতি তার বিয়ে হয়েছে পাশ্ববর্তী বড়লেখা উপজেলার গল্লাসাঙ্গন গ্রামে। আলম বাজার থেকে বাড়ী ফিরছিল বোনের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানে তার মা বেড়াতে গিয়েছেন। বোনের বাড়ি থেকে মা’কে আনতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে শহর থেকে বাড়ি ফিরলেও মায়ের মুখ আর দেখা হয়নি আলমের। পথিমধ্যেই চাচা ও চাচাতো ভাইদের নির্মম হামলায় খুনের শিকার হয়ে বোনের বাড়ির বদলে পরপারে আপন বাড়িতে পাড়ি জমাতে হলো তাকে। মমতাময়ী মা চম্পা বেগম পুত্রের নির্মম এই খুনের সংবাদ শুনার পর সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। আর জ্ঞান ফিরলেই হাউমাউ করে কাঁদছেন। নববিবাহিতা বোনের বুকফাটা কান্নায় এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। টগবগে যুবক আলম খুন হওয়ার ঘটনায় গোটা এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আলম পেশায় একজন সিএনজি চালক ছিল বলে জানা গেছে। আলম খুনের সংবাদ চাউর হতেই হাসপাতালে শত শত লোকের সমাগম ঘটে। সেখানে ছুটে যান থানার অফিসার ইনচার্জ শাহজালাল মুন্সী, পৌর মেয়র মোঃ আব্দুস শুকুর। বিয়ানীবাজার থানার ওসি তদন্ত জাহিদুল হক বলেন, এ ঘটনার সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আমি পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আশপাশ লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। ঘটনাস্থল থেকে খুনের সাথে জড়িত সন্দেহে জামিল ও রুমাকে আটক করে নিয়ে এসেছি। থানার অফিসার ইনচার্জ শাহজালাল মুন্সী বলেন, ইতিমধ্যে দু’জনকে আটক করা হয়েছে। মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এ খুনের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের গ্রেফতারে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।