এসিআরে জালিয়াতি করে ৪৮ জনের পদোন্নতির সুপারিশ প্রস্তাব ফেরত পিএসসির

64
gb

বিশেষ প্রতিনিধি জিবি নিউজ ২৪ ||

সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) নম্বর বাড়িয়ে এবং স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ৪৮ কর্মকর্তার পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে। এই জালিয়াতির বিষয় ধরা পড়েছে খোদ বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) কাছে। ফলে পিএসসি তা ফেরত পাঠিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু মন্ত্রণালয় গুরুতর এমন অভিযোগ আমলে না নিয়ে উল্টো তদন্ত ছাড়াই সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের কাছে এসিআর সংশোধনের জন্য চিঠি দিয়েছে। এ ঘটনা ঘটেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের ৪৮ কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রে।
 
এই ৪৮ জনের মধ্যে ১৯ কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্য না হলেও এসিআরে তাদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ারও প্রমাণ পেয়েছে পিএসসি। সম্প্রতি পিএসসির পরিচালক (উপসচিব) মো. আনোয়ার ইমাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ৪৮ কর্মকর্তার পদোন্নতির ব্যাপারে আপত্তি তুলে শ্রম মন্ত্রণালয়কে এমন একটি চিঠি দেওয়া হয়। পিএসসির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হলে সেখানে পদোন্নতি প্রক্রিয়ার নানা জালিয়াতির  বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

 

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, শ্রম মন্ত্রণালয় সেই জালিয়াতির বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কেবল অভিযুক্তদের এসিআর সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেয়। জালিয়াতিসহ এসিআর সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো চিঠির কপি দৈনিক সময়ের আলোর হাতেও এসেছে।
 
এসিআরে স্বাক্ষর জালিয়াতি ও নম্বর বাড়িয়ে যেসব কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল তারা হলেন ঢাকা মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের মো. জালাল উদ্দিন, দিনাজপুরের আব্দুস সাত্তার, কিশোরগঞ্জের মিজানুর রহমান, ঢাকার নঈমুল আজিজ, একই কার্যালয়ের মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হক ভুঁইয়া ও মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান, বরিশালের মোক্তার হোসেন সিরাজী, দিনাজপুরের হুমায়ুন কবীর, পাবনার বশির আহমেদ, যশোরের শওকত হোসেন, মুন্সীগঞ্জের রাফিয়া সুলতানা, ঢাকার এবিএম গোলাম পারভেজ, এই জেলার সুদীপ চন্দ্র দেব, মো. আহসান জামিল, যশোরের পরিতোষ কুমার বিশ্বাস, ময়মনসিংহের মোহাম্মদ আব্দুল মোতালেব, ঢাকার ফরহাদ হোসেন, চট্টগ্রামের ইয়াছিন আলী, বগুড়ার মামুনুর রশিদ, ঢাকার এম সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের রফিকুল ইসলাম, যশোরের মো. মাহমুদুর রহমান, কুষ্টিয়ার মো. মনিরুজ্জামান, নরসিংদীর ফারজানা আহমেদ, রংপুরের মো. মোফাখারুল আলম, ঢাকার মো. রফিকুল ইসলাম, গাজীপুরের সঞ্জয় কুমার দাস, দিনাজপুরের মো. জুলফিকার আলী, বগুড়ার মো. নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের মো. কামরুল হোসেন, পাবনার মো. শাখাওয়াৎ হোসেন, যশোরের জাকিরুল ইসলাম, যশোরের মো. আব্দুল মজিদ (বর্তমানে ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত), ঢাকার মো. হেমায়েত উদ্দিন, খুলনার মো. রকিবুল হাসান লিমন, পাবনার এসএম সুহেল, রাজশাহীর মো. তারেক হাসান, গাজীপুরের মো. মেহেদী হাসান, নরসিংদীর জাহের মিয়া, নারায়ণগঞ্জের এসএম কামাল হোসেন, গাজীপুরের বিজ্ঞান জ্যোতি চাকমা, একই জেলার শেখ মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকার স্বপ্না রানী আঢ্য, গাজীপুরের রাজিব চন্দ্রনাথ, কিশোরগঞ্জের মো. আব্দুল মালেক ও খুলনার মো. ইশতিয়াক আহম্মেদ। এই কর্মকর্তারা সবাই শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) পদমর্যাদার বলে জানা গেছে।
 
সংশ্লিষ্ট চিঠির সূত্র থেকে জানা গেছে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৮ জন শ্রম পরিদর্শককে (সাধারণ) প্রথম শ্রেণির সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির জন্য ২৪ জুলাই পিএসসিতে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে সেই প্রতিবেদন যাচাই করে পিএসসি জানতে পারে, পদোন্নতির প্রস্তাব জানিয়ে পাঠানো সেই এসিআরে ১৯ কর্মকর্তার প্রাপ্ত নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের এসিআরেও স্বাক্ষর ও নম্বর ঘষামাজা করা হয়েছে। ফলে বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করার জন্য পিএসসি আবার সেগুলোর আগের এসিআর তদন্ত করে। তাতেও জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় পদোন্নতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায় পিএসসি।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই এসিআরগুলো প্রস্তুত ও পিএসসিতে পাঠানোর দায়িত্বে ছিলেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের প্রশাসন শাখার উপ-মহাপরিদর্শক বেগম জোবেদা খাতুন। তিনি এসিআরগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। সেখানে দায়িত্বে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন শাখার উপসচিব দিল আফরোজা বেগম।
 
এই দুজনের হাত ধরেই পিএসসিতে যায় এসিআরগুলো। অভিযোগ রয়েছে, এই দুজন কর্মকর্তা ৪৮ জনের পদোন্নতির এসিআর পরিবর্তন করেছেন।  এ বাবদ মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তারা ছাড়াও শ্রম অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অধিদফতরের প্রশাসন শাখার অভিযুক্ত কর্মকর্তারা তা মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে পাঠিয়ে সংশোধন করে দেওয়ার জন্য নির্দেশনাপত্রও জারি করেছে।
 
পিএসসির পক্ষ থেকে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে পাওয়া ত্রুটিগুলো যাচাই করে দেখা গেছে, প্রতিবেদনের ৮ নম্বর কলামে রিপোর্ট প্রদানকারী অফিসারের অধীনে চাকরির সঠিক মেয়াদের ঘরে ঘষামাজা করা হয়েছে ৪৪ জন কর্মকর্তার প্রতিবেদনে। এ ছাড়াও ২০১৪-১৮ সালের পদোন্নতির যোগ্যতার ঘরে অনুস্বাক্ষর নকল করা হয়েছে। এমন সংখ্যা ১৯ কর্মকর্তার প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে। স্বাক্ষর জালিয়াতি ও নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ তুলে পিএসসি সেগুলো ফেরত পাঠালেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনও কোনো ব্যবস্থা বা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি বলে জানা গেছে।
 
চলতি দায়িত্ব প্রদানে জ্যেষ্ঠতার বিধি লঙ্ঘন ও ঘুষ বাণিজ্য : শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানটিতে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠ পদে চলতি দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতার বিধি মানেনি মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি অধিদফতরের উপমহাপরিদর্শকের কয়েকটি পদ শূন্য হলে প্রথম শ্রেণির সহকারী মহাপরিদর্শকদের মধ্য থেকে চলতি দায়িত্ব প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের বিধি বলছে, কোনো শূন্যপদে নিম্নপদধারীর মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতির যোগ্যতা বিবেচনা করে চলতি দায়িত্ব দিতে হবে এবং চলতি দায়িত্বের মেয়াদ দু’মাস অতিক্রমের আগেই সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটি-বোর্ডের অনুমোদনের জন্য পেশ করতে হবে। কিন্তু জ্যেষ্ঠতার এ বিধান লঙ্ঘন করে উপমহাপরিদর্শক পদে জুনিয়রদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কারও চলতি দায়িত্বের আদেশই পদোন্নতি কমিটি বা বোর্ডের অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়নি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার ডিআইজি আহমেদ বেলালকে তার ব্যাচের ১৪ জনকে ডিঙ্গিয়ে উপমহাপরিদর্শকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বগুড়ার ইকবাল খানকে ৪৪ জনকে ডিঙ্গিয়ে, কুমিল্লার উপমহাপরিদর্শক মামুনুর রশিদকে ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে, চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক আল আমিনকে আটজনকে ডিঙ্গিয়ে, কিশোরগঞ্জের উপমহাপরিদর্শক শাহ মোফাখারুল ইসলামকে ২২ জনকে ডিঙ্গিয়ে, সহকারী মহাপরিদর্শক পদে সদ্য যোগদানকৃত নরসিংদীর উপমহাপরিদর্শক আতিকুর রহমানকে ১৪ জন কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে, মৌলভীবাজারের উপমহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসানকে ২৭ জনকে ডিঙ্গিয়ে উপমহাপরিদর্শকের চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।         বিধি-বিধান লঙ্ঘন ছাড়াও এসব চলতি দায়িত্ব প্রদানে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও চলতি দায়িত্ব প্রদান করতে সিনিয়র কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন, মো. আসাদুজ্জামান ও ৩৩তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে মেধা তালিকায় প্রথমে থাকা মর্তুজা মোর্শেদকে চলতি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এসবের সবটাই করা হয়েছে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে। 

 

এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে শ্রম অধিদফতরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মিজানুর রহমান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক অধিদফতরের প্রশাসন শাখা এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন ও প্রটোকল শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।
 
এসিআরএ স্বাক্ষর জালিয়াতি ও নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কলকারখানা অধিদফতরের পক্ষ থেকে এসিআরগুলো সংশোধন করে দেওয়ার জন্য চিঠি পাওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা কেউই স্বাক্ষর, নম্বর দেওয়া ও প্রতিবেদনের ৮ নম্বর কলামে কোনো ধরনের ঘষামাজা করেননি।
 
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতরের প্রশাসন শাখার উপমহাপরিদর্শক বেগম জোবেদা খাতুন জানান, এসিআরগুলো পাঠানোর সময় আমি কোনো স্বাক্ষর জাল বা ঘষামাজা করিনি। সেগুলো সিলগালা করেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
 
জ্যেষ্ঠতা ও বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে তিনি বলেন, শূন্যপদ তো খালি ফেলে রাখা যাবে না। সেই জেলা চালানোর জন্য তো আমি পদশূন্য রাখতে পারি না। এ কারণে ওইসব কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠ পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন শাখার উপসচিব দিল আফরোজা বেগম সময়ের আলোকে বলেন, আমি এসিআরগুলো পাওয়ার পরই সেগুলো জনপ্রশাসনে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দিল আফরোজার এমন দাবির সত্যতা মেলেনি। কারণ এই এসিআরগুলো পিএসসিতে পাঠানোর দায়িত্ব তারই ছিল।
 
এ বিষয়ে পিএসসির পরিচালক (উপসচিব) মো. আনোয়ার ইমামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আলী আজম সময়ের আলোকে বলেন, এমন চিঠি আমরা পিএসসি থেকে পাইনি। তবে খুঁজে দেখতে হবে, তারপর যাচাই করে বলতে পারব।

 

পিএসসির চিঠি সচিব পাননি বলে জানিয়েছেন। তবে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে সচিবের স্বাক্ষর দেখা গেছে। এতে তিনি বিষয়টি দেখার জন্য অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মার্ক করেছেন।
gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More