আশুরার ফজিলত ও তাৎপর্য

64
gb

হাফিজ মওলানা মুফতি মুহাম্মদ ইকরাম উদ্দিন ||

“ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা

ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা”

কাজী নজরুল ইসলাম

কালের চাকা ঘোরে আবার আমাদের কাছে আগমন করেছে মহররম মাস।ইহাসহিজরী সালের প্রথম মাস।আরবীয় বৎসর শুরু হয় কুরবানী দিয়ে, আবার কুরবানীর মাধ্যমে বছরের সমাপ্তি ঘঠে। অর্থাৎ মহররম মাসে কারবালার কুরবানী আর জিলহজ্ব মাসে ইব্রাহীম (আ:) এর কুরবানী।

মহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা।আশুরা শব্দটি আরবী আশরা শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ দশ, ইসলামের পরিভাষায় ১০ই মহররমকে আশুরা বলা হয়।

সৃষ্টির সুচনা লগ্ন থেকে মুহররম্র ১০ তারিখ তথা আশুরার দিনে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।ফলে

আশুরার মর্যাদা ও মহাত্ম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।যেমন

আদম (আ:) এর দোয়া কবুল, নুহ (আ:) এর প্লাবন থেকে মুক্তি, মুসা (আ:) এর ফেরাউন থেকে মুক্তি লাভ,ইউনুস (আ:) এর মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ, ইব্রাহিম(আ:) এর

নমরুদের আক্রমণ থেকে মুক্তিসহ আরোঅনেক

ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল আশুরার দিনে । সর্বাপরি ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে আমাদের প্রিয় নবীর দৌহিত্র ফাতেমার নয়ন মনি হযরত ইমাম হোসাইনএর শাহাদত এই দিনটিকে বিশ্ববাসীর কাছে সর্বাধিক স্মরনীয় করে রেখেছে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্নিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (দ) যখন মদীনায় আগমন করলেন তখন দেখতে পেলেন সেখানকার ইহুদীগন আশুরার দিনে রোযা পালন করছে।রাসুলুল্লাহ (দ) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন “এ দিনে তোমরা কিসের রোযা পালন করছ?

তারা বলল ইহা একটি মহান দিবস, আল্লাহ তায়ালা এই দিনে মুসা (আ:) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দান করেছিল,এবং আল্লাহ ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন, তাই আমরা এ দিনে রোযা রাখি। তখন রাসুলুল্লাহ (দ) বললেন আমরাই মুসা (আ) এর অধিক ঘনিষ্ট। অতএব আমরাই ইহার অধিক দাবীদার।অত:পর রাসুলুল্লাহ (দ) এ দিনে রোযা রেখেছেন এবং উম্মতদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন উক্ত দিনে রোযা পালন করতে ( বুখারী হা: নং ২০০৪, মুসলিম হা: নং ১১৩০)।

হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্নিত, কুরাইশগন জাহেলিয়তের যুগে ও আশুরার দিনে রোযা পালন কর্তৃক। অত:পর রাসুলুল্লাহ (দ) এ দিনে রোযা রাখতে নির্দেশ প্রদান করেন, অবশেষে রমাদান মাসের রোযা ফরজ করা হল, তখন রাসুলুল্লাহ (দ) বললেন যে ব্যক্তি চায় আশুরার রোযা রাখুক, আর যে ব্যক্তি চায় সে ভংগ করুক,অর্থাৎ আশুরার দিন রোযা রাখা ঐচ্ছিক। (বুখারী হা: নং ১৮৯৩,মুসলিম হা: নং ১১২৫)।

উম্মতে মুহাম্মদী (দ) এর কাছে আশুরার দিনটি আরো বেশি স্মরনীয় , কারন এ দিনেই ঘটেছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বর হৃদয় বিদারক ঘটনা। হিজরার ৬১ সনে ১০ই মহররম তথা আশুরার দিনে শাহাদত বর্ন করেছিলেন জান্নাতি যুবকদের সর্দার, রাসুলুল্লাহ (দ) এর কলিজার টুকরা ফাতিমা (রা:) এর নয়ন মনি ইমাম হোসাইন (রা:)।যার বর্ননায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন এভাবে,

“নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া

আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া”

হোসাইন (র) এর মর্যাদা সমন্ধে অনেক গুলো হাদীসে বর্নিত হয়েছে। নিম্নে কয়েকটি হাদীস তুলে ধরলাম,

হাদীস নং-১

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (দ) বলেছেন হাসান ও হোসাইন হল জান্নাতী যুবকদের সর্দার (তিরমিযি হা:নং ৩৭৬৮)।

হাদীস নং- ২

নবী করিম (দ:) ইরশাদ করেছেন নিশ্চয় হাসান ও হোসাইন পৃথিবীতে আমার দুটি সুগন্ধি ফুল ( তিরমিযি হা: নং ৩৭৭০)।

হাদীস নং-৩

হযরত উসামা বিন যায়দ (রা) বর্ননা করেন, একদা আমি রাত্রি বেলা বিশেষ প্রয়োজনে রাসুলুল্লাহ (দ) এর দরবারে গেলাম, তখন তিনি বেরিয়ে এলেন এমতাবস্থায় তিনি একটি বস্তু চাদরের নীচে লুকিয়ে রেখেছিলেন আমি বুঝতে পারিনি সেটা কি ছিল। আমার প্রয়োজনীয় বাক্যালাপ শেষে আমি জিজ্ঞাসা করলাম “ আপনি কি জিনিষ আপনার চাদরের নীচে লুকিয়ে রেখেছেন?

তখন নবী (দ:) চাদর সরালেন এবং আমি দেখতে পেলাম তার কোলের মধ্যে হাসান ও হোসাইন (রা), অত:পর রাসুলুল্লাহ (দ) বললেন ওরা আমার দুটি সন্তান এবং আমার মেয়ে ফাতিমার দুটি সন্তান। অত:পর রাসুলুল্লাহ (দ) বললেন “হে আল্লাহ আমি এদেরকে ভালবাসি, তুমিও তাদেরকে ভালবাস, এবং এদেরকে যারা ভালবাসবে তুমি তাদেরকেও ভালবাস (তিরমিযি হা: নং৩৭৬৯)।

ইমাম হোসাইন (রা:) ইসলামের ঝান্ডাকে বুলন্দ করার জন্য কারবালার যমিনে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। এজন্য আল্লামা ইকবাল বলেছেন -“ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ”, অর্থ : প্রত্যেক কারবালার পরেই ইসলাম জীবন লাভ করে।

এ যুদ্ধ ছিল বাতিলের বিরুদ্ধে হকের লড়াই, মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই; যালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই।

কারবালার ঘটনা থেকে আমাদেরকেও শিক্ষা নিতে হবে যে, বাতিলের সামনে মাথা নত করা যাবে না।প্রান দিয়ে হলেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে, কারবালার প্রকৃত শিক্ষা ভুলে দিয়ে শুধুমাত্র তাজিয়া বের করে, মর্সিয়া ক্রন্দন করে, বিলাফ করলে সত্য প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, এর জন্য চাই ত্যাগ, চাই কুরবানী, চাই প্রতিবাদ। তাহলেই কারবালার প্রকৃত শিক্ষা লাভ করা যাবে। তাইতো আমাদের জাতীয় কবি কত সুন্দর করে বলেছেন –

“ ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা

ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা”

আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে আশুরার বরকত দান করুন এবং কারবালার শিক্ষা গ্রহন করার তৌফিক দান করুন। আমীন

ইমাম,লেখক ও গবেষক

বৃষ্টল সেন্ট্রাল মস্ক, ইউ কে।

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More