ডিজিটাল ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে ইমনের জীবনমান

47

মোঃ আব্দুল আজিজ, পাইকগাছা (খুলনা) \

হারুন-অর-রশিদ ইমন প্রত্যন্ত এলাকার এক নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্বপ্ন ছিল উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কোন কর্মকর্তা হবে। অনেকটাই অভাব অনাটনের সংসার ও অনেক ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে থমকে যায় ইমনের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ। ভেঙ্গে যায় প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন। তবে কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলেও জীবন সংগ্রামের কাছে হার মানেনি ইমন। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে ছুটে চলে সোনার হরিণ চাকুরীর সন্ধানে। কোথাও কোন চাকুরীর সন্ধান না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোন কাজ করবে এবং এ কাজের মাধ্যমে পরিবর্তন করবে নিজের ভাগ্য। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে শুরু করে ডিজিটাল কম্পিউটার সেন্টার। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে ইমনের জীবনমান। ইমনকে অনুসরণ করে তার আরো দুই ভাই চাকুরীর পিছনে না ছুটে বেছে নিয়েছে ডিজিটাল ব্যবস্থার কম্পিউটার ব্যবসা। ইমন খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন গড়ইখালী ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পাতড়াবুনিয়া গ্রামের শাহজাহান আলী সরদার ও সোনাবান বেগমনের ছেলে। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে ইমন সকলের মেঝো। অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় লেখাপড়া করতে থাকে কিশোর ইমন। বিজ্ঞান মনোস্ক ইমন ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে এই আশায় নিজ গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে গজালিয়া কালুয়া আলিম মাদরাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। এ মাদরাসা থেকে ২০০৩ সালে দাখিল পাশ করে উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী পাইকগাছা কলেজ (বর্তমানে সরকারি কলেজ) ভর্তি হয়। অনেক চেষ্টা করে ২০০৫ সালে অত্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে থমকে যায় ইমনের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সব স্বপ্ন। দারিদ্রতা আর ইমনের অপর ছোট বড় চার ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারের অভিভাবক দরিদ্র পিতা ইমনের লেখাপড়া বন্ধ করার তাগিদ দেয়। অনেক চেষ্টার পরও অভাব অনাটনের সংসার ও অন্যান্য ভাই- বোনের লেখাপড়ার খরচের কথা চিন্তা করে নিজের লেখাপড়া জীবনে ইতি টানতে বাধ্য হয় ইমন। কয়েক বছর ছুটে চলে চাকুরীর সন্ধানে। সোনার হরিণখ্যাত চাকুরীর সন্ধান পায় না ইমন। ছুটতে ছুটতে অনেকটাই ক্লান্ত ইমন কি করবে, কি সিদ্ধান্ত নিবে এমন ভাবনা ইমনকে দিশেহারা করে ফেলে। এদিকে, বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠণ করে। সরকার গঠণ করার পর তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর উন্নত বিশ্বে দেশকে এগিয়ে নিতে দেশের সকল ক্ষেত্রে শুরু করে ডিজিটাল কার্যক্রম। ধীরে ধীরে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রসার ঘটতে থাকে ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তির। হতাশায় উদ্বিগ্ন ইমনকে আলোর পথ দেখায় ডিজিটাল ব্যবস্থা। সে সিদ্ধান্ত নেয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন কোন কাজ করবে যে কাজ বদলে দেবে তার ভাগ্যকে। অনেক ভেবে চিন্তে ইমন সিদ্ধান্ত নেয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক সে উপজেলা সদরের সুমন কম্পিউটার থেকে এক বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এরপর সে দু’একটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বেতনে কাজ শুরু করে। কাজ করতে করতে যখন সব ধরণের কাজ শিখে ফেলে তখন সিদ্ধান্ত নেয় আর অন্যের প্রতিষ্ঠানে নয়, এবার নিজেই একটি কম্পিউটার সেন্টার করবে। তার কাজের মান দেখে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পরিচিত অনেকেই তাকে টাকা ধার দেয়। ২০০৯ সালের দিকে উপজেলা সদরের অভিজাত মার্কেটের একটি ঘর ভাড়া নিয়ে শুরু করে কম্পিউটার ব্যবসা। দেশে সব ধরণের সেবা ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আসায় ধীরে ধীরে জমে ওঠে ইমনের কম্পিউটার ব্যবসা। কম্পিউটার কম্পোজ, ডিজিটাল ফটোস্ট্যাট, ছবি প্রিন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, মেইল, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদন, স্কুল-মাদরাসার রেজিস্ট্রেশন ও ফরম ফিলাপ, স্কুল ও মাদরাসার মাল্টিমিডিয়ার তথ্য প্রদান, অনলাইনে ভিসা ও চাকুরীর আবেদন, স্কুল-মাদরাসার অনলাইন জরিপ, স্ক্যানিং এবং স্কুল- কলেজ পড়–য়া বেকার ছেলে-মেয়েদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রদান ও বিভিন্ন ধরণের কাজ করে বদলে যায় ইমনের ভাগ্য। পরিবারের সংসারের খরচ যোগানোর পাশাপাশি পৌর সদরের শিববাটী এলাকায় জায়গা কিনে বসত বাড়ী তৈরী করে নিজস্ব বাড়ীতে বসবাস করছে ইমন ও তার পরিবার। ইমনকে অনুসরণ করে তার আরো দুই ভাই বেছে নিয়েছে কম্পিউটার ব্যবসা। তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে কম্পিউটার ব্যবসা বদলে দিয়েছে ইমনের জীবনমান। কম্পিউটার ব্যবসায়ী ইমন জানান, চাকুরী না পেয়ে অভাব অনটনের সংসারে এক সময় হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। অনেক চিন্তা ভাবনা করে শুরু করি কম্পিউটার ব্যবসা। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেক সুখে আছি। এক কথায় ডিজিটাল ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে আমার ও আমার পরিবারের জীবনমান।

মন্তব্য
Loading...