হলিউড সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’-এর সেই দৃশ্য মনে আছে? বিমানবন্দরে আটকে পড়া প্রধান চরিত্রটি হঠাৎ আবিষ্কার করে, মানচিত্র থেকে মুছে গেছে তার নিজের দেশ! সিনেমার এই কাল্পনিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করেই যেন বাস্তব রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পূর্ব ইউরোপের এক অদ্ভূত ভূখণ্ড—ট্রান্সনিস্ট্রিয়া। কাগজে-কলমে কিংবা আন্তর্জাতিক মানচিত্রে জায়গা না থাকলেও এটি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাকপ্যাকার ও রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেন ও মলদোভার সীমান্তে অবস্থিত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রিডনেস্ট্রোভিয়ান মলডেভিয়ান রিপাবলিক’ নামের এই অঞ্চলটি ১৯৯০ সালে স্বাধীন হলেও তিন দশকেও জাতিসংঘের কোনো স্বীকৃতি পায়নি। তবে ভূখণ্ডটিতে প্রবেশ করলেই চোখ কপালে উঠবে যেকোনো ভ্রমণপিপাসুর! কারণ, একটি স্বাধীন দেশের নিজস্ব পতাকা, মুদ্রা (রুবল), সেনাবাহিনী, সীমান্ত পুলিশ থেকে শুরু করে ডাকটিকিট, যা কিছু প্রয়োজন সবই রয়েছে এখানে।
মানচিত্রে ঠিকানা না থাকা এই ভূখণ্ডকে পর্যটকেরা ডাকছেন ‘ইউরোপের শেষ সোভিয়েত রাষ্ট্র’ বা ‘জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল’ নামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাভেল ভ্লগারদের আগ্রহের দৌলতে জায়গাটি এখন বেশ জনপ্রিয়।
এখানে প্রবেশ করা মানেই সরাসরি গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে পা রাখা। রাজধানী তিরাসপোলের রাস্তাজুড়ে লেনিনের বিশাল মূর্তি, রহস্যময় বাংকার, আর সরকারি ভবনের চূড়ায় কাস্তে-হাতুড়ির প্রতীকগুলো পর্যটকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সোভিয়েত জমানায়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় এখানে কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। ট্রান্সনিস্ট্রিয়ায় যেতে হলে পর্যটকদের মলডোভার রাজধানী কিশিনাউ থেকে স্থানীয় মিনিবাস (মার্শরুটকা)-এ চেপে বসতে হয়।
এখানে প্রবেশের জন্য আগে থেকে কোনো ভিসার ঝামেলা পোহাতে হয় না। তবে সীমান্তে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় সীমান্ত রক্ষীরা বিদেশি ভ্রমণকারীদের একটি বিশেষ সাময়িক প্রবেশপত্র (ট্যুরিস্ট পারমিট) প্রদান করে। বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের এই আগ্রহ দেখে ইতিমধ্যে রুশ ও ইংরেজি ভাষায় অফিশিয়াল ট্রাভেল গাইডও প্রকাশ করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
বহু বছর ধরে অবৈধ অস্ত্র আর কেজিবির প্রভাবের জন্য কুখ্যাত হলেও বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রেডিট ও ইনস্টাগ্রামের একাধিক জনপ্রিয় ট্রাভেল ভ্লগারের মতে, ট্রান্সনিস্ট্রিয়া এখন ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ অস্বীকৃত দেশ’।
এখানকার স্থানীয়দের অতিথিপরায়ণতা, স্বল্পমূল্যে আন্তর্জাতিক মানের আঙুরের ব্র্যান্ডি বা ওয়াইন এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অবিশ্বাস্য কম খরচে থাকার ব্যবস্থা পর্যটকদের মুগ্ধ করছে।
অবকাঠামো বা সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এলাকাটি এখন রাশিয়ার আর্থিক সহায়তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তবে রাজনীতি আর ভূ-রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সোভিয়েত ইতিহাস, রহস্য আর কম খরচে রোমাঞ্চের খোঁজে প্রতিবছর হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসূ এখন ভিড় জমাচ্ছেন ‘মানচিত্রহীন’ এই দেশে!
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন