যুক্তরাজ্যে পালিত হলো ১১তম ‘ভিজিট মাই মস্ক’ : বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর পদচারণায় প্রাণবন্ত ও মুখর ছিলো ইস্ট লন্ডন মসজিদ

লন্ডন, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||

বিপুলসংখ্যক অমুসলিমের অংশগ্রহণে যুক্তরাজ্যে পালিত হয়েছে ১১তম ‘ভিজিট মাই মস্ক’ ডে । বিশেষ এই দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে ১১৫টি মসজিদ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সারাদিনই অমুসলিম দর্শনার্থীরা মসজিদগুলোতে আসতে থাকেন । বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পদচারণায় মসজিদগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও মুখর।



দর্শনার্থীরা মসজিদ ঘুরে দেখার পাশাপাশি ইসলাম, মুসলমানদের জীবনধারা, নামাজ, অজু এবং মসজিদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারেন। অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো মসজিদে প্রবেশের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং দিনশেষে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা নিয়ে ফিরে যান।

ইস্ট লন্ডন মসজিদে দিনব্যাপী আয়োজন
‘ভিজিট মাই মস্ক’ ডে উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক প্রতিষ্ঠান ইস্ট লন্ডন মস্ক অ্যান্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টারও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

লন্ডন মুসলিম সেন্টারের প্রবেশপথে অতিথিদের স্বাগত জানানো হয় । এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ করে তাদের মসজিদের বিভিন্ন বিভাগ ও কার্যক্রম ঘুরিয়ে দেখানো হয় । মুসলমানরা নামাজের আগে কীভাবে অজু করেন, কীভাবে নামাজ আদায় করেন—এসব তারা প্রত্যক্ষ করেন।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লন্ডন মুসলিম সেন্টারের বারাকা খান গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে বক্তব্য রাখেন ইস্ট লন্ডন মস্ক অ্যান্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টারের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল হাই মুর্শেদ, সিইও জুনায়েদ আহমদ, মারিয়াম সেন্টারের ম্যানেজার সুফিয়া আলম এবং নন-মুসিলম এনগেইজমেন্ট অফিসার শালিমা উদ্দিন মালিক । শেষ দিকে এসে যোগদেন টাওয়ার হ্যামেলটস কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র কাউন্সিলার মাইয়ুম মিয়া তালুকদার। উদ্বোধনী পর্বে বিপুলসংখ্যক অমুসলিম দর্শনার্থী অংশগ্রহণ করেন।

‘পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য’
মসজিদের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল হাই মুর্শেদ বলেন, এই আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কমিউনিটিতে বিভিন্ন ধর্মের বহু মানুষ বসবাস করেন, যাদের অনেকেই কোনোদিনও মসজিদে আসেননি।
তিনি বলেন, “আজ তাদের জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা মসজিদের বিভিন্ন সেবা ও কার্যক্রম দেখছেন, কথা বলছেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন। এর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হবে এবং আমরা সেই সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে চাই । ভবিষ্যতে তাদের অন্যান্য অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা মনে করি, কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও কথাবার্তা হলে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয় । আমরা যে দেশে বসবাস করি, এখানে অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে বসবাস করা আমাদের দীনি দায়িত্ব।”

‘ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করার সুযোগ’
ইস্ট লন্ডন মসজিদের সিইও জুনায়েদ আহমদ বলেন, যুক্তরাজ্যে ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে এবং ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের মধ্যে নানা ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, “দর্শনার্থীরা মুসলিমদের জীবনধারা নিজেদের চোখে দেখতে পারছেন। তারা মসজিদের কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক এবং মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলছেন, প্রশ্ন করছেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রম দেখছেন। এভাবেই তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারছেন।”
তিনি বলেন, এ বছর শতাধিক অমুসলিম ভিজিট মাই মস্ক ডেতে মসজিদে আসার জন্য নাম নিবন্ধন করেছেন। তবে ইস্ট লন্ডন মসজিদ সারা বছরই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। নিয়মিত স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ট্যুর গ্রুপ মসজিদ পরিদর্শনে আসে।

এ ধরনের আয়োজন সুসম্পর্ক বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র মাইয়ুম মিয়া তালুকদার বলেন, এবারের ‘ভিজিট মাই মস্ক’ কর্মসূচির প্রতিপাদ্য হলো ‘ট্যাকেলিং মিসকনসেপশন’, অর্থাৎ ইসলাম, মুসলমান ও মসজিদ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা মোকাবেলা করা। বর্তমান সময়ে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “ভুল ধারণা দূর করার এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আজকের ‘ভিজিট মাই মস্ক’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে অমুসলিম দর্শনার্থীদের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলেছে এবং তাদের বিভিন্ন ভুল ধারণাও পরিষ্কার হয়েছে। এ ধরনের আয়োজন পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্প্রীতি ও সুসম্পর্ক বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”

মৌচাক ছিলো দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ
ইস্ট লন্ডন মসজিদের নন-মুসলিম এনগেইজমেন্ট অফিসার শালিমা উদ্দিন মালিক বলেন, তিনি বিভিন্ন গ্রুপকে মসজিদ ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, “দর্শনার্থীদের আমরা মসজিদের মিহরাব, মিম্বর, ইমাম কোথায় দাঁড়ান, কোথায় অজু করা হয়, মুসলমানরা কীভাবে নামাজ পড়েন, কুরআন ও খুতবা—এসব বিষয়ে জানিয়েছি । তারা পুরো আয়োজনটি খুব উপভোগ করেছেন।”
তিনি আরো জানান, দর্শনার্থীদের অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো মসজিদে এসেছেন। বিশেষ করে ইস্ট লন্ডন মসজিদের মৌমাছি পালন প্রকল্প তাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।
এখানে ১২টি মৌচাক রয়েছে। মৌমাছি পালনকারী দুটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে মৌমাছি পালন এবং মধু সংগ্রহ করা হয়। বিষয়টি দর্শনার্থীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় ছিল।”

‘মসজিদের পাশেই থাকি, কিন্তু কোনোদিন ভেতরে আসিনি’
একজন অমুসলিম নারী দর্শনার্থী জানান, তিনি মসজিদের পাশেই থাকেন, কিন্তু এর আগে কখনো ভেতরে প্রবেশ করেননি। ‘ভিজিট মাই মস্ক’ কর্মসূচির কারণেই প্রথমবার মসজিদে আসার সুযোগ হয়েছে।
ক্যাথলিক খ্রিষ্টান এই নারী বলেন, “আমি প্রায়ই দেখি মানুষ মসজিদে ঢুকছে এবং বের হচ্ছে। আমার মনে প্রশ্ন জাগত—এখানে আসলে কী হয়? শুধু একটি ভবন হিসেবে নয়, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হয় এবং কী কী সেবা দেওয়া হয়, সেগুলো জানার আগ্রহ ছিল। আজ এসে দেখে খুব ভালো লেগেছে।”
মসজিদ পরিদর্শনের কোন বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অজুর বিষয়টি আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। বিষয়টি এমন নয় যে কেউ মসজিদে এসে সরাসরি নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজের আগে অজুর মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিতে হয়। এরপর নামাজের দৃশ্যটিও আমার খুব ভালো লেগেছে।”

এখানে এতো কিছু হয় না এলে জানতামনা
আরেকজন পুরুষ দর্শনার্থী বলেন, তিনিও জীবনে প্রথমবার মসজিদে এসেছেন। তিনি পূর্ব লন্ডনের মাইল এন্ড এলাকায় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যেই বসবাস করেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ তার অনেকদিনের।
তিনি বলেন, অনলাইনে ওপেন ডে’র খবর দেখি। আমি যখনই মাইল এন্ড থেকে স্পিটালফিল্ডসের দিকে যাচ্ছিলাম, মসজিদের পাশে বাসস্ট্যান্ড দেখি। আজ দুই স্টপ আগে নেমে ভাবলাম, মসজিদটা ঘুরে দেখি।
তিনি বলেন, “এখানে এসে বুঝলাম জায়গাটি আমার ধারণার চেয়েও অনেক বড়। স্কুলজীবন থেকেই ইসলাম সম্পর্কে কিছুটা জানতাম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিষয়টিও জানতাম। কিন্তু এখানে মৌচাক আছে, প্রেস কনফারেন্স হয়, শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম, নারীদের স্পোর্টস এবং ফ্যামিলি কাউন্সেলিংসহ এত ধরনের সেবা রয়েছে—এগুলো আমার জানা ছিল না।”
তার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে জামাতে নামাজের দৃশ্য। তিনি বলেন, “নামাজের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে কাতারে দাঁড়িয়ে একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ আদায় করেন—এটি আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি সবাইকে উৎসাহিত করব, আপনার স্থানীয় মসজিদে গিয়ে একবার ঘুরে দেখুন।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন