সময়, রাজনীতি ও উত্তরাধিকার: অভিযাত্রায় তারেক রহমান

gbn

সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ড ||

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও এক সন্ধিক্ষণে। দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধীদলের সংগঠন, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ সব কিছু যেন নতুন এক পুনর্গঠনের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু সেই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াকে আরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বিএনপির চতুর্থ চেয়ারম্যানের পদে তারেক রহমানের নির্বাচন শুধুমাত্র একটি সাংগঠনিক বদল নয়, এটি প্রতীক হয়ে উঠেছে দলের পুনর্জাগরণের প্রত্যাশার।  

তারেক রহমানের নেতৃত্ব এখন এমন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে একদিকে তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শন, আরেকদিকে খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা ও সংগঠনী প্রজ্ঞা এই দুই মেরুর সংমিশ্রণ তাঁকে নতুন সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য করছে। তবে শুধু উত্তরাধিকার নয়, নতুন বাস্তবতাও তাঁকে কঠিন পরীক্ষা দেবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে প্রবল মেরুকরণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাব, এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সব মিলে এখন এক অত্যন্ত জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে।  

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু। জনগণ এখন এমন এক পর্বে আছে যেখানে তারা পরিবর্তন চায় কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভাষা ও নেতৃত্ব নিয়ে দ্বিধান্বিত। ক্ষমতাসীন দলের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র অবস্থান, নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধীদের সীমিত অংশগ্রহণ, এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ভোটারদের মানসিকতাকে প্রভাবিত করছে। এমন এক বিপর্যস্ত সময়েই তারেক রহমানকে নেতৃত্ব দিতে হবে এমন একটি দলকে, যা একদিকে আদর্শের ধারক, অন্যদিকে বাস্তবতার সাথে খাপ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জে জর্জরিত।  

বাংলাদেশের ভেতরের এই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ আসলে বিচ্ছিন্ন নয়; এটি যুক্ত পুরো দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। আজ ভারতের রাজনীতি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের বিস্তারে ব্যস্ত, পাকিস্তানে সামরিক প্রভাব ও অস্থিতিশীল গণতন্ত্রের চক্র এখনো মুক্তি পায়নি, শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে হোঁচট খাচ্ছে, আর নেপাল ও মালদ্বীপ ক্ষমতার পালাবদলে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে আজ অনেক অগণতান্ত্রিক পথের নিদর্শক। এই অঞ্চলে গণতন্ত্র যেন এক টানাপড়েনের নাম কখনও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কখনও বৈশ্বিক প্রভাব, কখনও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের কারণে উত্তপ্ত।  

বিশ্ব রাজনীতিও আজ আর স্থিতিশীল নয়। ইউরোপে অভিবাসন ও জ্বালানি সংকট, আমেরিকায় আসন্ন নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, চীনের অর্থনৈতিক মন্দা, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন আর এককভাবে রাজনীতি করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের প্রভাব এখন দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ, তার ভূ-অবস্থানগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্বে, এই ভুবনের এক ঘূর্ণিঝড়ে দাঁড়িয়ে আছে।  

তারেক রহমানের সামনে তাই কেবল দলীয় পুনর্গঠন বা নির্বাচনী প্রস্তুতি নয় বরং বৈদেশিক ভারসাম্য রক্ষারও গুরুদায়িত্ব। একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের প্রভাব এবং চীনের অর্থনৈতিক আগ্রহ সব মিলে তাঁকে এমন এক বাস্তবতায় কাজ করতে হবে যেখানে দেশীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একে অপরের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়াবে।  

অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কাঠামোও পুনর্বিন্যাসের দাবি রাখে। তরুণ নেতৃত্ব প্রস্তুত করা, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আস্থা জয় করা, এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ এগুলো এখন সময়ের অপরিহার্য পদক্ষেপ। তাঁর নেতৃত্বে যদি জিয়াউর রহমানের শক্ত রাজনৈতিক দর্শন ও খালেদা জিয়ার ত্যাগনিষ্ঠ আদর্শের সেতুবন্ধন ঘটে, তাহলে নতুন এক বিএনপি গড়ে উঠতে পারে যে দল শুধু অতীতের গৌরব নয়, বরং ভবিষ্যতের সাহসিকতাকে প্রতিনিধিত্ব করবে।  

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায় তারেক রহমান কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন আস্থার ভাষা তৈরি করতে পারবেন? তিনি কি গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং উন্নয়নের বাস্তব কৌশলকে এক সুসংহত পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন? কারণ রাজনীতিতে উত্তরাধিকারই সব নয়, বরং নেতৃত্ব মানে ভবিষ্যতের দর্শন নির্মাণ।

ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সময় সময় নেতাদের সামনে এসেছে পুনর্জন্মের সুযোগ কেউ তা কাজে লাগিয়েছে, কেউ হারিয়েছে। আজ, ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে, সেই সুযোগটি এসেছে তারেক রহমানের সামনে। তাঁর পদক্ষেপ শুধু বিএনপির দিক নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথও নির্ধারণ করবে। এই সময়ই বলবে তিনি কি উত্তরাধিকার রক্ষা করবেন, নাকি তা নতুন স্বপ্নে পুনর্লিখন করবেন।  

তারেক রহমান যদি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে তাঁর নেতৃত্বকে নতুন গণআন্দোলনের ভাষায় রূপ দিতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো আবারও এক নতুন যুগের সূচনা ঘটবে। আর যদি না পারেন, তবে বিএনপি হয়তো থেকে যাবে অতীতের গৌরবগাথার আড়ালে এক সময়ের বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি, যা নিজের পুনর্জাগরণের সুযোগ হারিয়েছে। ইতিহাসের ঘড়ি কিন্তু অপেক্ষা করে না। সময়ের করিডোরে এখন তারেক রহমানের পদধ্বনিই বলে দেবে, বিএনপি অতীতের স্মৃতিতে বন্দি থাকবে, নাকি ভবিষ্যতের নেতৃত্বে নিজেদের নতুন করে চিনিয়ে দেবে, আর এখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে “আই হ‍্যাভ এ প্ল‍্যান” এর মাহাত্ম্য।

সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন