শায়খ আবদুল কাইয়ূম ||
ভাই ও বোনেরা, কতবার আমরা নামাজে দাঁড়িয়েছি, হাত তুলেছি, আর আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে বলেছি—আমার কষ্ট দূর করুন, আমার দুঃখ হালকা করুন, আমাকে সেই জিনিস দিন যেটার জন্য আমি বহুদিন ধরে প্রার্থনা করছি?
তবুও দিন যায়, মাস যায়, এমনকি বছর যায়, মনে হয় যেন সেই দো‘আ কবুল হচ্ছে না। তখন শয়তান ফিসফিস করে: “আল্লাহ কি আসলেই তোমার কথা শুনছেন? তুমি কি এতই গুনাহগার যে তোমার দোআ কবুল হচ্ছে না?”
এই সপ্তাহে এক ভাই ফোন করেছিলেন । তিনি স্পষ্টতই গভীর যন্ত্রণায় ছিলেন । দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি বিষয়ের জন্য দো'আ করছেন, কিন্তু এখনও তা পূর্ণ হয়নি। তিনি দেখছেন, অন্যরা খুব সহজেই সেই জিনিস পাচ্ছে, অথচ তিনি পাচ্ছেন না। তাই তিনি কষ্ট পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কি কোনো সমস্যা আছে? আমার দো'আ কি আদৌ কবুল হচ্ছে?”
আমাদের অনেকেরই জীবনে এমন অনুভূতি আসতে পারে । কিন্তু আমাদের একটি সত্য মনে রাখতে হবে: পরীক্ষাই হলো জীবনের অংশ । আল্লাহ আমাদের কখনো প্রতিশ্রুতি দেননি যে জীবন কষ্টমুক্ত হবে । বরং তিনি কুরআনে স্পষ্ট বলেছেন:
মানুষ কি মনে করেছে আমি মুসলিম, আমি ঈমান এনেছি, এ কথা বললেই আমি তাকে ছেড়ে দেবো? আমি তাকে জীবনে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো। তার জীবনে অনেক উত্থান পতন ঘটবে। তার কষ্ট দুঃখ অনেক লম্বা হতে পারে। নিশ্চয়ই আমরা আগের লোকদেরও পরীক্ষা করেছি । আর আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করবেন কারা সত্যবাদী এবং অবশ্যই প্রকাশ করবেন কারা মিথ্যাবাদী। (কুরআন, সূরা আনকাবূত)
সুতরাং হ্যাঁ, পরীক্ষা অবশ্যম্ভাবী । কিন্তু এ জন্য কিছুতে মনে করা উচিত নয়, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে পরিত্যাগ করেছেন । অনেক সময় এই পরীক্ষা আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসার নিদর্শন।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাদের পরীক্ষা করেন । যে খুশি থাকে, তার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি; আর যে অসন্তুষ্ট হয়, তার জন্য থাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।”
এটি একটি বড় শিক্ষা—কষ্টের মাঝেও প্রজ্ঞা রয়েছে । ধৈর্য ও আস্থা নিয়ে সাড়া দিলে পরীক্ষাগুলো আমাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়।আর ভুলে গেলে চলবে না—প্রতিটি আন্তরিক দো'আ কবুল হয় । তবে সব সময় আমাদের ইচ্ছামতো হয়না ।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “কোনো মুসলিম যখন এমন দো'আ করে যাতে কোনো গোনাহ নেই (অর্থাৎ নিজের জন্য খারাপ কিছু চায়না) বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো কিছু নেই, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাকে যেকোনো তিনটির মধ্যে একটি দেন: তিনি দ্রুত দোআর উত্তর দেন, অথবা তার পাওনা আখিরাতের জন্য রেখে দেন, অথবা এর সমপরিমাণ কোনো অমঙ্গল তার থেকে দূর করে দেন।”
সুবহানাল্লাহ! আমরা ভাবি দো'আ উত্তরহীন, অথচ আল্লাহ আমাদের এমন বিপদ থেকে বাঁচাচ্ছেন যা আমরা টেরও পাই না। অথবা তিনি সেই দো'আ আখিরাতে বিশাল সওয়াব হিসেবে জমা রাখছেন।
নবী আইয়ুব (আঃ) এর কাহিনী দেখুন । ১৮ বছর ধরে তিনি অসুস্থতা, দারিদ্র্য ও একাকীত্বে ভুগেছেন। কিন্তু দো'আ ছাড়েননি। তাঁর দো'আটি ছিল একেবারেই সহজ: “নিশ্চয়ই কষ্ট আমাকে স্পর্শ করেছে, আর আপনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।” (কুরআন, সূরা আম্বিয়া ২১:৮৩)
আল্লাহ উত্তর দিলেন: “অতঃপর আমরা তার দো'আ কবুল করলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিলাম। আর তাকে তাঁর পরিবার ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম-আমাদের পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।” (কুরআন, সূরা আম্বিয়া ২১:৮৪)
আরেকটি দৃষ্টান্ত হলেন নবী ইয়াকুব (আঃ)। তিনি বহু বছর প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আঃ)-কে হারিয়ে ছিলেন । কেউ কেউ বলেছেন, তা ছিলো প্রায় ৪০ বছর । তিনি এত কেঁদেছিলেন যে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছিলেন । তবুও তিনি আশা ছাড়েননি, দো'আ চালিয়ে গেছেন। অবশেষে আল্লাহ তাদের মিলিত করেছেন।
ইউনুস (আঃ) এর কাহিনী কে ভুলতে পারে? মাছের পেটে আটকা পড়লেন, চারদিকে অন্ধকার, তখন তিনি বললেন: “আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র । নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।” (কুরআন, সূরা আম্বিয়া ২১:৮৭) আল্লাহ তায়ালা বলেন: “অতঃপর আমরা তার দো'আ কবুল করলাম এবং তাকে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দান করলাম। আর এভাবেই আমরা মুমিনদের রক্ষা করি।” (কুরআন, সূরা আম্বিয়া ২১:৮৮)
এসব শুধু গল্প নয় । এগুলো আশা জাগানো শিক্ষা । মনে করিয়ে দেয়, যত দেরিই হোক, যত গভীর কষ্ট হোক, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে কখনও পরিত্যাগ করেন না।
অনেক সময় আমরা শুধু দো'আ কবুল হয়েছে কিনা সেটাতেই মনোযোগ দিই। অথচ আসল কল্যাণ নিহিত দোআ করার মধ্যেই। একজন আলেম বলেছেন: “আমি দো'আ কবুল হলো কি না, সে নিয়ে চিন্তিত নই। আমি শুধু দো'আ করার ব্যাপারেই চিন্তিত, কারণ এটাই আমার কর্তব্য।”
আরেকজন জ্ঞানী আলেম বলেছেন: “কেয়ামতের দিনে যখন পর্দা উঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন দেখা যাবে দোআ বিলম্বিত করা তোমার জন্য দুনিয়াতে তাড়াতাড়ি কবুল হওয়ার চেয়েও ভালো ছিল।
তাই প্রিয় ভাই ও বোনেরা, দোআ করা কখনও বন্ধ করবেন না। বছর লেগে গেলেও, চোখের পানি শুকিয়ে গেলেও, উত্তর না দেখলেও—দোয়া করতে থাকুন। প্রতিটি দোআ আপনাকে আল্লাহর কাছে, আরও কাছে নিয়ে যায়। প্রতিটি দোআ আপনার অন্তরকে অলোকিত করবে। প্রতিটি অশ্রু সেই মহান সত্তার কাছে পৌঁছে যায়, যিনি কখনও ভুলে যান না।
হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা কখনও আপনার রহমতের ব্যাপারে আশা হারায় না । আমাদের দোআ কবুল করুন, আমাদের চাহিদার উত্তর সর্বোত্তম উপায়ে দিন এবং আমাদেরকে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও ঈমানভরা অন্তর দান করুন। আমীন।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা । শুক্রবার, ২২ আগস্ট ২০২৫: শায়খ আবদুল কাইয়ূম : ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব

মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন