ক্ষমতার বদল হোক, রাষ্ট্র যেন বদলে না যায়—.অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান – উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

337
gb

রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন আগামী ৩০ জুলাই হতে যাচ্ছে। এটি আমাদের জাতীয় নির্বাচনের একটি মহড়া বলা যায়। কারণ দলীয় প্রতীকে ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হচ্ছে। আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে যেসব দল বড় ভূমিকা পালন করে তারা হয় নিজেরাই অংশ নিচ্ছে, না হয় কাউকে সমর্থন করছে। সেদিক থেকেও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এই নির্বাচন। নিকট-অতীতে হয়ে যাওয়া আমাদের খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, সেখানে কোনো মারামারি, দাঙ্গা বা একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার কথাও কোথাও শোনা যায়নি। কিন্তু সেদিন রাজশাহীতে ছাত্রদলের সমাবেশে মোটরসাইকেলযোগে এসে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোর খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়টাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে, সতর্ক হতে হবে এবং অত্যন্ত শক্তভাবে প্রতিহত করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ করার সাহস কেউ না পায়। তবে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এতে করে অচলাবস্থা সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে এরকম চিন্তা করাও অমূলক। কারণ আমাদের দেশে ‘বেøাইম গেইম’-এর রাজনীতি আছে আমরা এটি জানি। নির্বাচন কমিশনেরও জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণে বড় একটি সুযোগ এটি। জাতীয় নির্বাচনে যে রকম অসুবিধা তৈরি হতে পারে কিংবা ফাঁকফোকর দেখা দিতে পারে সেগুলো খুঁজে বের করে পূর্ব প্রস্তুতির জন্য এটি একটি ফিল্ড ওয়ার্ক। জাতীয় নির্বাচন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে আসবে।
আরেকটি বিষয়, বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে ২০১৪-১৫ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা জ্বালাও-পোড়াও, পেট্রল বোমার মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে, তাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে যাতে নির্বাচনকালীন সুযোগে অপশক্তির উদ্ভব না ঘটে। তবে চার বছর আগের ঘটনা নিয়ে নির্বাচনের আগে ব্যাপক ধরপাকড় করে কোনোভাবেই নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত করা যাবে না। নির্বাচনের সময় অনেক ধরনের অভিযোগ আমরা শুনি বিভিন্ন পক্ষ থেকে। নির্বাচনকালীন এই পরিস্থিতি সুষ্ঠু রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়েও যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো সব দলের নেতাকর্মীদের যার যার প্রার্থীর পক্ষে মাঠে অবস্থান করা।
সাম্প্রতিকালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির নতুন মেরুকরণের কথা শোনা যাচ্ছে। এরকম হলে তা মূলত আওয়ামী লীগ বনাম বাকি দলগুলোর একটা জোট হতে পারে এবং তাদের একমাত্র পুঁজি হবে ভারত বিরোধিতা ও ইসলাম ধর্ম। এই দুটি বিষয় ছাড়া তাদের খুব বেশি কিছু করার নেই। যেমন বিএনপির যে ভোটব্যাংক তারা মূলত ভারতবিরোধী ও ইসলামি উন্মাদনায় ভরপুর। আজকাল বিএনপি যেমন ভারত সহনীয় কথাবার্তা বলছে এতে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। কারণ তৎকালীন মুসলিম লীগের যে সেটআপ সেটাই মূলত আজকের বিএনপি। পুরনো এ বৈশিষ্ট্য থেকে বেরিয়ে আসলে বিএনপি তো আর বিএনপি থাকছে না। জোটের ব্যাপারে বলতে গেলে, অনেক সময় পুরোপুরি একই আদর্শের দল না বলেও কৌশলগত কারণে একাধিক দল একসঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। বামপন্থি দলগুলো একত্রে জোট গঠন করতে পারে বলে শুনেছি। ভারতে বামদল ক্ষমতায় এসেছে, অনেক বছর টিকেও থেকেছে এটা আমরা দেখেছি। কিন্তু আমাদের দেশের বামদের মধ্যে এত বিভাজন যে, আজ যদি দেখেন তারা জোট করেছে কাল সকালে দেখতে পারেন কেউ কেউ জোট ছেড়ে দিয়েছে। এদের মধ্যে মার্কসবাদী, লেনিনবাদী বিভিন্ন তরিকার লোকজন আছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যখন জোটের নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল বাধে কেবল তখনই আদর্শিক দ্ব›দ্বগুলোকে সামনে এনে এরা জোট ভেঙে দেয়। আসলেই যদি বামদলগুলো এক হয় এবং নির্বাচনে অংশ নেয় এটা অবশ্যই আমাদের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ভালো দিক। তবে জোটবদ্ধ হয়ে এলেই যে এই নির্বাচনে তারা খুব ভালো ফলাফল করবে না এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ বামদলগুলো সমাজের শ্রেণি ভাঙতে চায়, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, মানুষে মানুষে সাম্য চায়, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে আত্মকেন্দ্রিকতা, সেলফিশনেস এ কারণেই মূলত মানুষ তাত্তি¡কভাবে বামদলগুলোকে গ্রহণ করলেও আপন করে নিচ্ছে না। অনেক সময় আমাদের বামদের একটা সীমাবদ্ধতা হলো, বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে তারা মানিয়ে নেয়া, খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো উদার মানসিকতা দেখাতে পারে না। সোভিয়েত ইউনিয়নে সত্তর বছর সমাজতন্ত্র থাকার পরও কিন্তু এক সময় ভেঙে পড়েছে।
আর চায়নাতে যেটা আছে আদৌ এটাকে সমাজতন্ত্র বলে কিনা আমি জানি না। কিউবাও সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওরা ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তির অনুমোদন দিবে। আরেকটি বিষয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যে কেবল পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি তা কিন্তু না, নোয়াখালী কুষ্টিয়াসহ দেশের অনেক জায়গায় সর্বহারা বাম, অতিবাম, চিনাপন্থি বামদেরও আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যে বামদলগুলো ছিল তারা একটা শক্ত পক্ষ হতে পারে। কারণ ক্ষমতার পালাবদল হবেই, তা হোক। কিন্তু রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্য তার পরিবর্তন যেন না হয়। সব সরকারই যেন স্বাধীনতার পক্ষের হয়। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি বিভিন্ন সময় আমাদের দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রেরও পরিবর্তন হয়েছে, রাষ্ট্রটাকেই ভিন্ন এক রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে!
২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দল যখন ক্ষমতায় আসল, তখন প্রথম আঘাতটাই তারা করল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের যে মূল কাঠামো সেটাই পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেল। একইভাবে পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার মাধ্যমে এ দেশে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতারই পরিবর্তন হয়নি, রাষ্ট্রটাকেই পরিবর্তন করে একটা পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হয়েছিল। তাই বলতে চাই আমাদের রাজনীতিকে আরো পরিশীলিত করতে হলে, স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলোকে হারুক আর জিতুক নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। আজকের নির্বাচনে হারলেও কাল বা পরশু নির্বাচনে হয়তো তারা জয়ী হবে।
সম্প্রতি বিএনপি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এদের নিয়ে যদি বিএনপি জোট গঠন করে এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে ত্যাগ করে, সেটাও শুভ উদ্যোগ। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের অবদান রয়েছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যারা শক্ত প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের একজন। কিন্তু তাদের সঙ্গে নিয়ে আবার যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকেও সঙ্গে রেখে যদি কোনো জোট হয় তাহলে সেটা টিকবে না। বলা হয় রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই, তবে আমাদের দেশের রাজনীতিতে শেষ কথা বলে একটা কথা আছে সেটা হলো আওয়ামী লীগ এর বিরোধিতা করা। একদিকে আওয়ামী লীগ থাকবে আর বাকি সবাই মিলে এর বিরোধিতা করবে। একটুআধটু ন্যায় নীতি, সুশাসন এসব কথা বলবে কিন্তু মূল যে কাজটা করবে সেটা হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার এবং ভারত বিরোধিতা। আমাদের জাতীয়তা বাঙালি না বলে মুসলিম বাঙালি বলে একটা কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করবে।
সে যাই হোক, আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে মেয়াদ শেষ করতে চলেছে। সামনে আরেকটি নির্বাচনী বৈতরণী অপেক্ষমাণ নির্বাচনকে নিয়ে সরকারের ইতিবাচক ব্যাপারগুলো যদি বলি, দেশে দশ বছর আগে সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকের যে অবস্থা ছিল সে তুলনায় এখনকার উন্নতি অভাবনীয় ও অনুকরণীয়। যে মেগা প্রজেক্টগুলো আছে যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল। সরকার পরিবর্তন হলে এই প্রজেক্টগুলো ব্যাহত হবে বলেই মনে করে জনগণ। সুতরাং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আবার আসলে চলমান উন্নয়ন কাজগুলো অব্যাহত থাকবে। এখন যদি নেতিবাচক দিকগুলোর দিকে যাই, প্রথমেই শুরু করতে হয় নোবেল লরিয়েট নেইল কাইনম্যানের একটা কথা দিয়ে সেটা হলো, ‘মানুষ উপকারের চেয়ে অপকার বেশি মনে রাখে।’ তাই আওয়ামী লীগের কেউ যদি আমার এ লেখা পড়ে, তাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, উন্নয়নের চিত্র প্রচার করার প্রয়োজন আছে, তবে তারচেয়েও বেশি দরকার এটা খুঁজে বের করা কোথায় কোথায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি যে সব সময় আর্থিকভাবেই হতে হবে ব্যাপারটা এমন না, মানসিকভাবেও হতে পারে। যেমন, কোনো এমপি, তার আত্মীয়স্বজন, বিশেষ করে শ্বশুরবাড়ির পক্ষের লোকজন মানুষের ওপর নিপীড়ন করেছে কিনা। আওয়ামী লীগেরই ভোটার, আওয়ামী লীগ সমর্থন করে এরকম অনেক লোকও সরকারের ওপর বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে অনেক নেতার কারণে। অসন্তোষের এই জায়গাগুলোর সমাধান করতে হবে। কারণ মানুষ যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় সে বুঝতে পারে রাস্তাটা পাকা হয়েছে, আগে লোডশেডিং ছিল, এখন আলো জ্বলছে এসব মানুষ দেখতে পারে। অতএব অপকার, অসন্তোষ এসব ব্যাপার যে যে জায়গায় ঘটে গেছে সেই জায়গাগুলোকে মেরামত করটা এখন সবচেয়ে জরুরি।