মিরপুরের আতঙ্ক ‘রোমিও পার্টি’

106
gb

অপহরণ, মাদক মামলায় ফাঁসানোসহ নানা অপকর্মে জড়িত ৬ সদস্যের চক্র–জিবি নিউজ ২৪– ওদের আছে দামি গাড়ি। টার্গেট করা ব্যক্তিদের সঙ্গে মিটিং করে পাঁচতারকা হোটেলে। কথা বলতে পারে অনর্গল ইংরেজিতে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে চাকরি করছে এমন পরিচয় দেয় যেখানে-সেখানে। তবে এসবের আড়ালে বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় অপহরণ, মাদক মামলায় ফাঁসানো, ব্যবসায় জড়িয়ে নানাভাবে সাধারণ মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের সংঘবদ্ধ গ্রুপ। এই গ্রুপের দলনেতা হলো খন্দকার মো. খালিদ ওরফে রোমিও। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা রোমিওর সেকেন্ড ইন কমান্ড জালাল উদ্দিন সানি। ‘রোমিও পার্টি’ আতঙ্ক এখন মিরপুর এলাকায়। সর্বশেষ গত নভেম্বরে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয়ে বাঙলা কলেজের ছাত্র রায়হান বিন আব্দুল্লাহকে অপহরণ করে তার বাবার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে রোমিও ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। এরপর রায়হানকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে ছেড়ে দেওয়ার আগে রায়হানের সামনে ইয়াবা ও তা সেবনের জন্য পাইপ রেখে ছবি তুলে রাখে তারা। ওই ছবি রায়হানের বাসায় পাঠিয়ে বলা হয়, যদি আবারও তিন লাখ টাকা দেওয়া না হয়, তাহলে তা পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে।

ডিবির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, সাতক্ষীরার দেবহাটার জগন্নাথপুরের খবির উদ্দিনের ছেলে জালাল উদ্দিন সানি একসময় চট্টগ্রামের হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসায় পড়ত। একই মাদ্রাসায় পড়ত সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের পাইকপাড়ার মো. আব্দুল্লাহর ছেলে  রায়হান বিন আব্দুল্লাহ। পরে রায়হান ভর্তি হয় মিরপুরের বাংলা কলেজে। আর সানি মাদ্রাসায় পড়াশোনা ছেড়ে মিরপুরে মধু ও কালিজিরা বিক্রির দোকান খুলে বসে। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে রায়হান প্রায়ই সানির দোকানে যাতায়াত করত। একপর্যায়ে রায়হানের কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নেয় সানি। পরে ওই টাকা পরিশোধের কথা বলে গত ২১ নভেম্বর রায়হানকে ডেকে নেয় সানি। পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক মিরপুর থানাধীন আসাদুজ্জামান তাপসের বাসায় আটকে রাখা হয় রায়হানকে। ওই বাসায় রোমিও এবং সাঙ্গোপাঙ্গরা গিয়ে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয়ে ইয়াবার ট্যাবলেট সামনে রেখে তার ছবি তোলে। পরে রায়হানের বাবার মোবাইলে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দুই অপহরণকারীর হাতে তিন লাখ টাকা তুলে দেওয়ার পর রায়হানকে দারুস সালাম এলাকার হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠের পাশে ফেলে যায়। ৮ ডিসেম্বর আবার রাতে রায়হানদের রূপনগরের বাসার ঠিকানায় একটি খাম পাঠানো হয়। সেই খাম খুলে দেখা যায় একটি চিরকুট। তাতে লেখা- ‘দুইজন আসামি রিমান্ডে ইয়াবা কারবারি হিসেবে আপনার ছেলের নাম প্রকাশ করেছেন। ইয়াবা কারবারির তালিকায় রায়হানের নাম চলে আসবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু থেকে গণমাধ্যমে তা ভাইরাল হবে।’ মাদক কারবারির তালিকা থেকে রায়হানের নাম কাটছাঁট করতে ০১৮৮১৫৩০৮৪০ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলে ওই চক্রের সদস্যরা। এ বাবদ আরও তিন লাখ টাকা দাবি করা হয়। দ্রুত টাকা না দিলে আবার রায়হানকে ধরে থানা পুলিশের কাছে চালান করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর ভয় ও আতঙ্কে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা পাঠান রায়হানের বাবা। পরে বাকি টাকা পরিশোধের জন্য আরও চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কোনো উপায় না দেখে রায়হানের পরিবার বিষয়টি পুলিশকে জানায়।

ডিবির তদন্তে বেরিয়ে আসে একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ মিরপুর এলাকায় অপহরণ, জালিয়াতিতে জড়িত। এ চক্রে রয়েছে খন্দকার মো. খালিদ রোমিও, খন্দকার শাহিদুর রহমান কালু, জালাল উদ্দিন সানি, গাজী ইমরান-উল হোসেন রাহাত, আসাদুজ্জামান তাপস। বিপ্লব নামে এ চক্রের আরও একজনকে খুঁজছেন গোয়েন্দারা।

রোমিও গ্রুপের দলনেতা রোমিও জানায়, তার একটি এলিয়ন গাড়ি রয়েছে। কখনও সেটি উবারে ভাড়ায় চলে। আবার কখনও রেন্ট-এ কারে সেই গাড়ি ভাড়ায় চালানো হয়। এক যুগের বেশি সময় ধরে সে যুক্তরাষ্ট্রে ছিল। ২০০৫ সালে দেশে ফিরে আসে। কয়েক মাস আগে সানির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সানির হাত ধরে অপহরণসহ নানা অপকর্মে জড়ায় রোমিও।

সানির দাবি, ব্যবসায় মার খাওয়ায় সে হতাশ হয়ে পড়ে। এরপর পূর্ব পরিচিত রায়হানকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করা হয়। মুক্তিপণের ৮০ হাজার টাকা রোমিওকে দেওয়া হয়।

ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, মিরপুরকেন্দ্রিক অপরাধ চক্রের সদস্যরা এতটাই ধূর্ত, তারা রায়হানকে অপহরণের আগে তাদের বাসার গাড়িচালক শাহিদুর রহমান কালুকে হাত করে নেয়। তার মাধ্যমে রায়হান ও তার পরিবারের খবর নিত। অপহরণকারীদের কাছ থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা পাওয়া গেছে।

ডিবির উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বদরুজ্জামান জিল্লু বলেন, রোমিও উচ্চশিক্ষিত। সে মিরপুরকেন্দ্রিক অপরাধ চক্রের নেতৃত্ব দিত। অপহরণ, কয়েন বিক্রির নামে প্রতারণা, ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে ফাঁসানোর কারবার ছিল তাদের। রোমিওসহ এই চক্রের পাঁচজনকে ধরা হয়েছে। অপহরণের কাজে ব্যবহূত প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন তবে আপনি চাইলে অপ্ট-আউট করতে পারেন Accept আরও পড়ুন