চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে স্বর্ণের চালান ধরেও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ

353
gb

জিবিনিউজ24 ডেস্ক:

রাজধানী ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় প্রতিদিনই ধরা পড়ছে অবৈধভাবে আনা সোনার বার, সিগারেট ও বিদেশি মুদ্রার চালান। বিদেশ থেকে এসব চালান এসে চট্টগ্রামে হাতবদল হয়ে ঢাকায় গিয়ে ধরা পড়ছে শুল্ক গোয়েন্দাদের হাতে।

কিন্তু চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে সেটি ধরা পড়ছে না। এ অবস্থায় এখানে দায়িত্বরত পুলিশ, কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বরত সংস্থাগুলো পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সোনার চালান ধরা পড়লেও খবরটা প্রকাশ করছে না। অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে চালানটা ছাড় হয়ে যাচ্ছে।

তবে শুল্ক গোয়েন্দা দল চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তারেক মাহমুদ এই অভিযোগ মানতে নারাজ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘পণ্য চোরাচালানের জন্য চিহ্নিত দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে শতভাগ যাচাই করা হচ্ছে। চেকিং থেকে কোনো যাত্রীই বাদ যাচ্ছে না। কাস্টমস এবং পুলিশের হাতেও তো ধরা পড়ছে না। তাহলে বুঝতাম কোনো এক পক্ষের গাফিলতি আছে।

’ শুল্ক গোয়েন্দার চৌকস এই কর্মকর্তা মনে করেন, চট্টগ্রামে চেকিংয়ে বেশি কড়াকড়ি হওয়ায় চোরাচালানিরা এখানে আসতে উৎসাহী হচ্ছে না। তারা হয়তো রুট পাল্টেছে।

শুল্ক গোয়েন্দারা জানায়, ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন প্রচুর সোনার বারসহ যাত্রী আটক করেছে। আটক এসব যাত্রীর বেশ কয়েকজন চট্টগ্রাম থেকে সোনা চোরাচালানের বাহক হিসেবে একই ফ্লাইটে ঢাকায় গেছেন এবং হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ধরা পড়েছেন শুল্ক গোয়েন্দাদলের হাতে।

তারেক মাহমুদ বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘আইনগতভাবে আমি সেই বিমানে গিয়ে তল্লাশি চালাতে পারি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলে সব যাত্রীকে তো তল্লাশি করা সম্ভব নয়। ’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, শাহ আমানত বিমানবন্দরে ২০১৬ সালে সবচেয়ে কম মাত্র তিন কেজি চোরাই সোনার বার ধরা পড়ে। আর সোনার অলংকার ধরা পড়ে এক কেজি ৬০০ গ্রাম। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সোনা ধরা পড়েছে পাঁচ কেজির বেশি। এর মধ্যে ৩০০ গ্রাম অলংকার, বাকিটা সোনার বার। এরপর থেকে প্রতি মাসে একটি বা দুটি আবার কোনো মাসে একটি সোনার বারও আটক করতে পারেনি কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দা বা পুলিশ।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে চোরাচালান হয়ে আসা সোনা আটকের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে কাস্টমসের। বিমানবন্দর পুলিশ ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের এই চালান আটকের এখতিয়ার নেই। তবে এই দুটি সংস্থার লোকজন সোনা পাচারে বাহক হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা দল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি করে, আর আটকের ক্ষেত্রে কাস্টমসের সহযোগিতা লাগে।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বর্তমানে দুজন সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে সাতজন কর্মকর্তা দায়িত্বরত। তাঁদের একজন সহকারী কমিশনার তানভীর আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাত্রীর শতভাগ লাগেজ স্ক্যান করছি এবং আর্চওয়ে ব্যবহার করছি। এতে দু-একটি সোনার বার, মদের বোতল, সিগারেট ধরা পড়লেও বড় চালান ধরা পড়ছে না। অবশ্য তার মানে এই নয় যে চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেছে। ’

চোরাচালানিদের নিত্যনতুন কৌশল ধরতে না পারায় কাস্টমস ব্যর্থ হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা যদি হতো তাহলে অন্য সংস্থার হাতেও সোনার চোরাচালান ধরা পড়ত। ’

গোয়েন্দারা বলছেন, ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা না ঘটলে সোনার চালান ধরাটা খুবই কঠিন। প্রধানত বাহকের অসাবধানতা অর্থাত্ চোরাচালানের কৌশল বুঝে ফেলায় সেটি ধরা পড়ে। আবার আগেভাগে তথ্য ফাঁস হয়েও অনেক সময় চালান ধরা পড়ে। আর ধরা পড়াকে ২০ শতাংশ ‘সিস্টেম লস’ বলেই মেনে নেয় চোরাকারবারিরা।

অভিযোগ উঠেছে, সিভিল এভিয়েশন, বিমানবন্দর পুলিশ ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের পারস্পরিক যোগসাজশ থাকায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন সোনার চালান ধরা পড়েনি। দায়িত্বরত কিছু সাংবাদিকও মধ্যস্থতা করেন পাচারে সহযোগিতা করতে। ২০১৬ সালে সোনা চোরাচালান ও মানবপাচার এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে বিমানবন্দরে কর্মরত পুরো পুলিশ টিমকে ঢাকায় বদলি করা হয়। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতা থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর পুলিশকে ঢাকার কেন্দ্রীয় পুলিশের অধীনে নেওয়া হয়। তাতেও চোরাচালান কমেনি। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম কাস্টমস একজন সহকারী কমিশনারকে তিন মাসের বেশি দায়িত্বে না রাখার সিদ্ধান্ত চালু করে। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে একজন কর্মকর্তা সোনা চোরাচালান প্রতিরোধের কৌশল রপ্ত করার আগেই বদলি হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। এ অবস্থায় গত ফেব্রুয়ারিতে বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালানে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় শুল্ক গোয়েন্দা দল। তারপর থেকে বেশ সুফল মিলছিল। ধরা পড়ছিল একের পর এক চালান, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তারাও থমকে গেছে।