তিতাসের মৃত্যু: যুগ্ম সচিবের দোষ খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি

বিশেষ প্রতিনিধি জিবি নিউজ ২৪ ||

মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে ফেরিতে থাকা স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মণ্ডল ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) ওয়াহিদুল ইসলামের কোনো দোষ খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। তবে ফেরিটি দেরিতে ছাড়ার জন্য ঘাটের দায়িত্বরত তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি।

বৃহস্পতিবার অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। দায়ী তিনজন হলেন- ঘাটের ব্যবস্থাপক সালাম হোসেন, ঘাটের প্রান্তিক সহকারী খোকন মিয়া এবং উচ্চমান সহকারী ও গ্রুপ প্রধান ফিরোজ আলম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা দেরিতে ফেরি ছাড়া হয়। এ কারণে তিতাসের মৃত্যুর দায় এই তিনজন কিছুতেই এড়াতে পারেন না। প্রতিবেদনে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়, তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মণ্ডলের কোনো দোষ নেই। তিনি জানতেন না যে, ফেরি ঘাটে মুমূর্ষু রোগী অপেক্ষা করছে। একইভাবে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসকও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য কোনোভাবেই ফেরি দেরি করে ছাড়া যাবে না বলে প্রতিবেদনে সাতদফা সুপারিশ করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রেজাউল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি এ প্রতিবেদন দাখিল করে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুস সাত্তার শেখ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের যুগ্ম সচিব তোফায়েল ইসলাম।

প্রতিবেদন দাখিলের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল বাশার সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মণ্ডলের দোষ খুঁজে পায়নি। কারণ ফেরি আটকে রাখা হয়েছে এ বিষয়টি তিনি জানতেন না। একইভাবে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসকও বিষয়টি অবহিত ছিলেন না। তাই তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের দায়ী করা হয়নি। তবে এ ঘটনায় ঘাটের ব্যবস্থাপক সালাম হোসেনসহ তিনজনকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের কারণে ফেরি বন্ধ ছিল।

ডিএজি বাশার জানান, এ প্রতিবেদনটি এফিডেভিট করে আদালতে জমা দেওয়া হবে। হাইকোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শেষে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের গঠিত বেঞ্চে প্রতিবেদনের ওপর শুনানি হবে।

গত ৩১ জুলাই মাদারীপুর কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাটে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনায় অতিরিক্ত সচিবের নিচে নয়, এমন পদমর্যাদা সম্পন্ন কর্মকর্তার নেতৃত্বে তদন্ত করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। জনপ্রশাসন সচিবের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিতাসের পরিবারকে কেন তিন কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। ওই সময় ভিআইপি প্রটোকল বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নন, বাকিরা সবাই রাষ্ট্রের কর্মচারী। আদালতে জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন মানবাধিকার সংগঠন লিগ্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড পিপলস রাইটসের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জহির উদ্দিন লিমন।

সাত দফা সুপারিশ: ১. ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া ও পৌঁছানোর সময় মাস্টারকে অবশ্যই স্থায়ী লগ বুক বা রেজিস্ট্রারে সময় লিখে স্বাক্ষর করতে হবে। ২. ফেরিঘাটে ভিড়িয়ে ফেরির র‌্যাম্প উঠিয়ে কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য কোনোভাবেই অপেক্ষা করা যাবে না। ৩. নীতিমালা অনুযায়ী ভিআইপি সুবিধা চেয়ে কেউ ফেরি পারাপার হতে চাইলে তাকে অবশ্যই তার সরকারি ভ্রমণবিবরণী আগে থেকে ফেরি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। তবে জরুরি প্রয়োজনে ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ নিয়মের শিথিল করা যেতে পারে। ৪. অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স/গাড়ি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. প্রত্যেক ঘাটে ও ফেরিতে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে গাড়ি ও ফেরি পারাপারের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৬. ফেরিঘাট ও ফেরিতে কর্মরত সবার নাম ট্যাগসহ নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করতে হবে এবং ফেরিঘাট ও ফেরিতে জরুরি মোবাইল ফোন নম্বর প্রদর্শন করতে হবে।

নড়াইলের কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তাকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ২৫ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত ৮টার দিকে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটের মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ১ নম্বর ভিআইপি ফেরিঘাটে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্সটি। তখন এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মণ্ডল পিরোজপুর থেকে ঢাকা আসবেন বলে ওই ফেরিকে অপেক্ষা করতে ঘাট কর্তৃপক্ষকে বার্তা পাঠানো হয়। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরিতে ওঠে অ্যাম্বুলেন্সটি। এরই মধ্যে মস্তিস্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে মাঝ নদীতে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তিতাস। এ ঘটনা তদন্তে ২৯ জুলাই তিনটি কমিটি গঠন করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিতাসের মৃত্যু নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়।

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন তবে আপনি চাইলে অপ্ট-আউট করতে পারেন Accept আরও পড়ুন