মৌলভীবাজারে হিন্দু,মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল একই জায়গায়

213

জিবি নিউজ ডেস্ক।।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নে পাশাপাশি অবস্থিত ন্যাশনাল টি কোম্পানির মালিকানাধীন পাত্রখোলা চা বাগান ও ব্যক্তি মালিকানাধীন শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান।

১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক-কর্মচারীদের দাফন ও সৎকারের জন্য ৪ দশমিক ৯৪ একর (১৫ বিঘা) জমি বরাদ্দ করা হয়। এই কবরস্থান ব্যবহার করা হয় আরও পরে গড়ে ওঠা গোবিন্দপুর চা বাগানের শ্রমিক কর্মচারীদের জন্যও। প্রায় দেড়শ বছর ধরে সম্প্রীতির নিদর্শন বহন করছে দুটি চা বাগানে পাশাপাশি গড়ে ওঠা মুসলমানদের কবরস্থান, হিন্দুদের শ্মশান আর খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল।

স্থানীয়রা জানান, যুগ যুগ ধরে একইস্থানে কবর, শ্মশান ও সমাধি রেখে তিন ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে থেকে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি পালন করে আসছেন। এ নিয়ে কখনও কোনও বাকবিতণ্ডা হয়নি বলে স্থানীয় চা শ্রমিকদের দাবি। বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ায় এখানকার মানুষ খুবই খুশি।.

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে পাত্রখোলা চা বাগানে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার, হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় আট হাজার ও খ্রিস্টানদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। আর শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগানে হিন্দু মুসলিম মিলে প্রায় আট হাজার মানুষ আছেন। তবে ধর্ম নিয়ে কোনও হানাহানি বা মতবিরোধ নেই।

পাত্রখোলা চা বাগানের জয়করণ বাউরী ও শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগানের আব্দুল মন্নান জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের কবর দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে কখনোই কোনও বিরোধ বা দেন-দরবার করতে হয় না। .

পাত্রখোলা চা বাগানের বাজার লাইনের বাসিন্দা চা শ্রমিক দুর্জয় ধন অলমিক বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে এখানে সবাই যার যার নিজের ধর্মের নিয়মে সৎকার করে আসছেন। আমাদের মাঝে কোনও মতপার্থক্য নেই। যার যার ধর্ম সে সে পালন করে।’

জানতে চাইলে পাত্রখোলা চা বাগান সার্বজনীন মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ প্রসাদ শর্মা বলেন, ‘আমরা পাশাপাশি তিন ধর্মের মানুষ এক জায়গায়ই আছি। এক সঙ্গেই যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনটা কাটাতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি, মৃত্যুর পরেও সবাইতো আমরা একসঙ্গেই থাকবো। আজও পর্যন্ত চা বাগানে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়নি, হবেও না।’.

পাত্রখোলা জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল আজিজ জানান, ‘কবর, শ্মশান ও খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল পাশাপাশি অবস্থিত। সড়কের দক্ষিণে কবরস্থান, মাঝখানে খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল আর উত্তরে হিন্দুদের শ্মশানের স্থান। এই চা বাগান প্রতিষ্ঠা করার পর তিন ধর্মের মুরব্বীরা ভেবেছিলেন কী দৃষ্টান্ত রাখা যায়! পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এমন একটা সৌহার্দ্য, এমন একটা সুসম্পর্কের নমুনা রেখে যাব যাতে পরবর্তীতে এটা তাদের ওপর ভালো সুফল বয়ে আনবে।’

পাত্রখোলা চা বাগান গীর্জার পরিচালক ধর্ম যাজক যোসেফ বিশ্বাস জানান, ‘এখানে একইস্থানে তিন ধর্মের সমাধিস্থল। নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই দাফন কিংবা সৎকার করা হয়ে থাকে এখানে। তিনটি ধর্মের লোকদের সম সুযোগ দিয়েই এখানে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তাই ধর্ম পালনে কারও কোনও সমস্যা হয় না।’

এ ব্যাপারে পাত্রখোলা চা বাগান ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান মুন্না বলেন, ‘১৮৭৫ সালে পাত্রখোলা চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। চা বাগানের জমির ওপর সব ধর্মের মানুষ মৃত্যুর পর দাফন ও সৎকার এবং সমাধিস্থল হিসেবে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই থেকে একই জায়গায় ধর্ম পালন ও নির্বিশেষে দাফন কিংবা সৎকার হচ্ছে। সব ধর্মের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন হিসেবেই এই সমাধিস্থলটি গড়ে উঠেছে। আমি মনে করি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে পাত্রখোলা চা বাগানে।’