ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে কোটি টাকার চেক ডিজঅনার মামলা

জেল খেটে ৯৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ড নিয়ে দ্বারে দ্বারে নিরপরাধ আলাউদ্দিন * ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি হিসাব বন্ধ করেছে ব্যাংক, জব্দ হয়নি চেক

141
gb

সিলেটের এনসিসি ব্যাংকে একজনের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে সেই অ্যাকাউন্টের চেক দিয়ে এনআই অ্যাক্টে মামলার ঘটনা ঘটেছে। সেই মামলায় ভুয়া অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের অজান্তেই আদালতে ৩ মাসের সাজা ও ৯৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে ৩ মাসের জেল খেটেছেন জকিগঞ্জ উপজেলার নিরপরাধ আলাউদ্দিন।

ভুয়া অ্যাকাউন্টের মামলার ৯৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ড থেকে বাঁচতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি। আলাউদ্দিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পিবিআইকে ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দিলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর কাহিনী। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের তদন্তে বেরিয়ে আসে পূর্বশত্রুতার জেরে কীভাবে ভুয়া ছবি, জাল কাগজপত্র ও এনআইডি দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। বেরিয়ে আসে মূল হোতার নাম।

একই গ্রামের সালিক আহমেদ এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এসব ঘটনা জানাজানি হলে ব্যাংক নিজ দায়িত্বেই বন্ধ করে দেয় ভুয়া অ্যাকাউন্টটি। কিন্তু নিয়ম থাকলেও জব্দ করতে পারেনি চেক বইটি। এসব বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি নয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

সিলেটের আদালতপাড়ায় কথা হয় জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তরকুল গ্রামের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব আলাউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে জানতে পারেন আদালতে তার বিরুদ্ধে সাজা হয়েছে, সঙ্গে কোটি টাকার অর্থদণ্ড। খবর পেয়ে তিনি আদালতে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন তার বিরুদ্ধে একটি চেক ডিজঅনারের মামলায় ৩ মাসের সাজা ও ৯৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হয়েছে। বিষয়টি জেনে আকাশ ভেঙে পড়ে তার মাথায়।

কাগজপত্র তুলে দেখেন এনসিসি ব্যাংক কুমারপাড়া শাখায় তার নামে ২০১৫ সালে একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেই চেক বইয়ের পাতা দিয়ে দিলওয়ার হোসেন নামে একজন ৯৫ লাখ টাকার মামলা করেন আদালতে। তিনি জানান, তিনি কখনোই এই ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলেননি। কোনো দিন ব্যাংকেও যাননি। তাহলে কীভাবে হল এই অ্যাকাউন্ট। এমনকি এই মামলার কোনো সমন কিংবা কাগজপত্রও যায়নি তার ঠিকানায়।

পরে তিনি প্রতিকার চেয়ে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আবেদন দেন। আদালত আবেদন গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্তের ভার দেন। কিন্তু সাজার রায় থাকায় সেদিনই জেলে পাঠিয়ে দেন আলাউদ্দিনকে। ৩ মাসের জেল খেটে বের হন আলাউদ্দিন। কিন্তু ৯৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ড থেকে মুক্তি পাবেন কীভাবে। সরকারের উচিত আইন করে হলেও এসব মামলায় এমন হয়রানি বন্ধ করা হোক।

এরই মধ্যে তদন্ত শেষে সিলেটের কুমারপাড়া শাখা এনসিসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট যে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে করা হয়েছে, তার প্রমাণ পেয়ে যান। পিবিআই সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সারোয়ার জাহান যুগান্তরকে জানান, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আলাউদ্দিনের নামে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তা ২৫ বছরের কোনো যুবকের আর নমিনিতে আলাউদ্দিনের স্ত্রীর নাম ভুয়া, ছবিও আছে অন্য কারও। দুটি এনআইডির কোনটিই সঠিক নয়, জাল। তবে শুধু আলাউদ্দিনের স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে ব্যবহার হয়। এসব তুলে ধরে আদালতে নিয়মিত মামলা করার জন্য আবেদন করে পিবিআই। কিন্তু আইনে না থাকায় অনুমতি দেননি আদালত। এর কিছুদিন পর ১৩ জানুয়ারি আরও একটি চেকে সাড়ে আট লাখ টাকা লিখে মামলা করতে আসেন এক ব্যক্তি। পরে তাকে ধরে ফেলেন আদালতপাড়ার আইনজীবীরা।

তার কাছ থেকে পাওয়া যায় মূল হোতা সালিক আহমেদের নাম। যার সঙ্গে আলাউদ্দিনের দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছে। পরে তাকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন আইনজীবীরা। কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়েরের পর সালিককে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে মূল ঘটনা। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে সালিক স্বীকার করেন, ভুয়া অ্যাকাউন্টটি নিজেই করেছেন তার এলাকার ব্যাংক ম্যানেজার মাহফুজুর রহমানকে দিয়ে। স্বীকারোক্তিতে সালিক জানায়, তিনি শুধু একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছেন, বাকি কাগজপত্র ও ছবি ব্যাংক ম্যানেজার জোগাড় করেছেন। মূলত আলাউদ্দিনকে শায়েস্তা করতেই তিনি এই অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন জনকে মোটা অঙ্কের টাকার চেক দিয়ে আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন। এসব স্বীকারোক্তি দিলেও জেলে গিয়েই ভোল পাল্টে ফেলেছেন প্রতারক সালিক।

কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার সময় যুগান্তরকে জানান, তিনি কখনোই এই ব্যাংকে যাননি। স্বীকারোক্তি দেয়ার কথা বললে তিনি বলেন, তিনি তা প্রত্যাহার করবেন। এনসিসি ব্যাংক কুমারপাড়া শাখায় গিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যাংক ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে দুই বছর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন। কথা হয় বর্তমান ম্যানেজার জয়দ্বীপ বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, যেহেতু সাব জুডিস বিষয়, তাই কথা বলতে পারব না। তবে তারা হিসাবটি বন্ধ করেছেন বলে জানান; কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী চেক বই জব্দ করার বাধ্যবাদকতা থাকলেও তা তারা করেননি।

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More