ওদের ঈদ কাটল হাসপাতালে

53

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। নতুন পোশাকে শুভেচ্ছা বিনিময়। কিন্তু সবাই সেই আনন্দ উপভোগ করতে পারে না। দুর্ঘটনা কিংবা শারীরিক অসুস্থতা সেই আনন্দ থেকে দূরে রেখেছে।

খুশির দিনে অনেকেই হাসপাতালের শয্যায় দিন কাটাচ্ছে। অসুস্থতার সঙ্গে লড়তে গিয়ে তাদের ঈদের আনন্দ ম্লান। হাসপাতালের শয্যায় বসেই আত্মীয়, স্বজন ও বন্ধুদের অভাব বোধ করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

বুধবার দুপুরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে এই চিত্রই দেখা গেছে।

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সামান্ত গ্রামের রকিবুল হাসান (১০)। মঙ্গলবার বাড়ির পাশে জাম গাছ থেকে পড়ে দুই হাত ভেঙেছে। তাকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে। দুই হাতে ব্যান্ডেজ দিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পাশেই মা রোকেয়া বেগমের চোখে জল। সন্তানের দুই হাত ভেঙে হাসপাতালে।

ঈদের দিন এভাবে হাসপাতালে কাটাতে হবে কল্পনাও ভাবেননি। জানালেন রোকেয়া বেগম। বলছিলেন, ছেলেটার বিপদ। এই অবস্থায় ঈদে বাড়িও যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছে। কিছু করার নেই। এভাবেই কয়দিন এখানে থাকতে হবে।

রকিবুল জানায়, বাড়ির সবাই কত আনন্দ করছে। আর আমি হাসপাতালে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।

যশোরের অভয়নগর উপজেলার নন্দীমিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম। জানালেন চার সদস্যের পরিবার সবাই মিলে হাসপাতালেই ঈদ করছেন তারা। পাঁচদিন আগে বড় ছেলে সোহান (১১) ভর্তি করা হয়। এরপর ছোট ছেলে সোহাগ (৩) জ্বরে আক্রান্ত। দুই ছেলেকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হাসপাতালেই আছেন। আগে কখনো তাদের এমন ঈদ করতে হয়নি।

রোকেয়া বেগম বলেন, এই রকম ঈদ যেন কারো জীবনে না আসে। হাসপাতাল থেকে সেমাই রুটি দিয়েছিল। সেটি ছেলেদের খাওয়ায়ছি।

পাশের বেডের শ্যামলী বেগম ৪৫ দিন বয়সী মেয়ে রাইসাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। স্বজনদের ছাড়াই এবার তাদের হাসপাতালে ঈদ। একটু কষ্ট লাগছে, তবুও কিছু করার নেই। জানালেন শ্যামলী বেগম। তার বাড়ি নড়াইলের তুলারামপুর এলাকায়।

পেটের ব্যাথা নিয়ে মঙ্গলবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ফুলজান বেগম (৫৭)। বললেন, গরীব মানুষ বাপু। পরে ক্ষেতে কাজ করে খাই। গতকাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। মেয়ে ছাড়া আমার কেউ নেই। পাশে মেয়েই আছে। জীবনে প্রথমে এই হাসপাতালে ঈদের দিন কাটাতে হচ্ছে।

যশোর সদর উপজেলার চান্দুটিয়া গ্রামের রেবেকা খাতুন বলেন, শাশুড়ি আবেজান বেগম কাপড় নাড়তে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেছে। বাম পা ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি। আমাদের এবার ঈদ হাসপাতালেই। বাড়িতে আত্মীয় স্বজন থাকলেও আমরা যেতে পারছি না।

তবে হাসপাতালে ঈদ করার অভিজ্ঞতা রেবেকা খাতুনের আছে। তিনি জানালেন, গতবার ঈদের দিন দেবর মাহবুবকে নিয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে ছিলেন। এই দিনে হাসপাতালে থাকা খুবই কষ্টের।

সদর উপজেলার আবাদ কচুয়া গ্রামের আয়শা বেগম তার নাতি সিয়াম (৯) হাসপাতালে আছেন। চারদিন আগে খেুঁজর গাছ থেকে পড়ে ডান পা ভেঙেছে তার। ঈদের দিন হাসপাতালে থাকতে চাইছে না সিয়াম। বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করছে। মামার দেয়া জামা গায়ে থাকলেও হাসপাতালের শয্যাই তাকে থাকতে হয়েছে।

শুধু সিয়াম, রকিবুল, ফুলজান কিংবা আবেজান বেগম নয়, তাদের মত কয়েক শত রোগী যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রত্যেকের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়েছে দুর্ঘটনা কিংবা রোগে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তার স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ব্যতিক্রমী আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বজন সংঘ ও ভ্যাস।

ঈদের দিন বেলা সাড়ে ১১টায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও শিশুদের মাঝে খেলনা, বই উপহার দেয়া হয়। প্রায় ৮০জন শিশুকে ঈদের উপহার দেয়া হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (চলতি) ডা. আবুল কালাম আজাদ, স্বজন সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাধন দাস, সহকারী সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় কুমার নন্দী, সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মাসুদ হোসাইন, দপ্তর সম্পাদক সঞ্জয় কুমার মণ্ডল, কোষাধ্যক্ষ তাপস লাহা, সদস্য কৃষ্ণপদ মল্লিক, প্রসেনজিত গাইন প্রমুখ।

স্বজন সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাধন কুমার দাস বলেন, ঈদের সময় যখন বাড়িতে সবাই আনন্দ করে, তখন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে কষ্ট ও হতাশা বিরাজ করে। তাদের মানসিকভাবে সাপোর্ট দেয়ার জন্যই মূলত ঈদের দিন আমরা শুভেচ্ছা বিনিময় ও শিশুদের উপহার দিচ্ছি। সর্বশেষ তিনটি ঈদে আমরা এটি চালু করেছি। এই ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে ভর্তি শিশু ও তার অভিভাবকদের মধ্যে একটু বেশি কষ্ট লক্ষ্য করা যায়। এজন্য শিশুদের আমরা উপহার দিই। এটি পেয়ে তারাও খুশি হয়। এটাই হলো আমাদের ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি।

মন্তব্য
Loading...