কানাডার মদসহ বিভিন্ন পণ্যে ট্রাম্পের নতুন নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমিয়ে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায় কানাডা। এ পরিবর্তনের জন্য কানাডাকে কিছুটা মূল্য দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।

যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর কানাডার নতুন করে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার সময় এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ কথা বলেন।

 

কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা কানাডার শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বৈচিত্র্য বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি কানাডীয় ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর কানাডার নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে।

এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, আসবাবপত্র ও সুতি টি-শার্ট। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। ১৫ মিনিটের ভিডিও বার্তায় কার্নি বলেন, কানাডার প্রধান লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে চায় তার সরকার।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দিয়ে যাবে।

 

 

কার্নি বলেন, ‘আমাদের সামনে এগিয়ে গিয়ে সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন, সবই আমাদের আছে। এই পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই মূল্য দিতে হবে।’ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছাতে চান। তবে আগস্টের শেষ দিকে দুই দেশের আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত নতুন কোনো বৈঠক নির্ধারিত হয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কানাডার নতুন শুল্কের জবাব দেওয়ার কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, ওয়াশিংটন মঙ্গলবার থেকেই কানাডার বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে। কানাডার সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক ফরাসি ভাষার সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ারকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আজ বিকেলে দেখা যাবে।’

 

বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে সোমবার কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেছেন, বোম্বার্ডিয়ারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের ব্যবসা বন্ধ করা হতে পারে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বোম্বার্ডিয়ার কানাডার অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়নে হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে কানাডার মোট দেশজ উৎপাদনে ৭০০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি অবদান রেখেছে বোম্বার্ডিয়ার।

 

 

ট্রাম্পের দাবি, আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করলে মার্কিন ভোক্তারা দেশে তৈরি পণ্য কিনতে উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে বিদেশি কম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, শুল্কের আওতায় থাকা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বেশি খরচ করতে হবে। সপ্তাহান্তে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে কানাডাকে নিয়ে একাধিক পোস্ট করেন ট্রাম্প। এর একটি পোস্টে উত্তর আমেরিকার একটি মানচিত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে কানাডা, মেক্সিকো ও গ্রিনল্যান্ডসহ পুরো মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার নকশা দেখানো হয়। এ নিয়ে কানাডায় নতুন করে সমালোচনা তৈরি হয়।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থনৈতিক আকারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ বড়। কানাডার মোট রপ্তানির বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। এই কারণে দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধ কানাডার ব্যবসা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সীমান্তের দুই পাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে কানাডার গাড়ি ও ট্রাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক রয়েছে।

 

 

আগস্টের শেষ দিকে কানাডার আরও কয়েকটি পণ্যের ওপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল দুগ্ধজাত পণ্য, মদ, হকি স্টিক ও সুগন্ধি। এর জবাবে মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় আসা শত শত পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে কানাডা।  যুক্তরাষ্ট্রের দুধ, গলফ ক্লাব, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, জ্যাকেট ও টি-শার্টের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। পনির, টয়লেট পেপার এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মতো কিছু গৃহস্থালি পণ্যের ওপর শুল্কের হার ২৫ শতাংশ। ফর্কলিফট ট্রাক ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ছাঁচের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। এর বাইরে কানাডা আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কিছু গাড়ি ও ট্রাকের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে।

তবে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতাভুক্ত গাড়ি ও ট্রাক এই শুল্কের বাইরে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এই চুক্তি ইউএসএমসিএ এবং কানাডায় কুসুমা নামে পরিচিত। জনমত জরিপে দেখা গেছে, কানাডার বেশির ভাগ নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের পক্ষে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারকে সতর্কভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কানাডার চেম্বার অব কমার্স নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর পরিকল্পিতভাবে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরামর্শ দিয়েছে। শুক্রবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডেসা লেইং বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারে। তবে তারা দুই দেশের বাণিজ্য পরিস্থিতির লাগামহীন অবনতি চায় না।

 

 

কানাডার পাল্টা শুল্কের তালিকাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। মৎস্য খাতের চাপের মুখে তালিকা থেকে কয়েক ডজন সামুদ্রিক খাবার বাদ দিয়েছে কানাডা। এর প্রধান কারণ হলো, এই খাতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা একে অপরের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বিশেষ করে দুই দেশের গলদা চিংড়ি শিল্পের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ধরা অনেক গলদা চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কানাডায় পাঠানো হয়। প্রক্রিয়াজাত করার পর সেগুলো আবার যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে বিক্রি করা হয়। ফলে এসব পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ালে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে কানাডার অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কানাডার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে দেশটিতে ১ লাখ ৮১ হাজার নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হয়। তবে আগস্টে কানাডায় প্রায় ৪১ হাজার কর্মসংস্থান কমে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে এবং দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যায়। কানাডার উৎপাদন খাতে অবশ্য সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দেশটির সরকার বলছে, কানাডার ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশে তৈরি পণ্য বেশি কেনায় এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার কানাডার উদ্যোগের কিছু প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ের বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, কানাডার মোট রপ্তানির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া রপ্তানির অংশ কমে ৬৬ শতাংশে নেমেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগে এই হার গড়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ ছিল।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন