মারা গেছেন সাবেক ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার বালাদুর

ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার বালাদুর ৯৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। সোমবার তার মৃত্যুর খবর জানান দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু।

তবে তার মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।

 

লেকর্নু বলেন, ফ্রান্সের পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের পাঁচ দশকের ইতিহাসের সঙ্গে বালাদুরের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জর্জ পম্পিদুর সঙ্গে কাজের শুরুর সময় থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সের জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯২৯ সালে তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের উপকূলীয় শহর ইজমিরে একটি খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম বালাদুরের।

তার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে শহরটির ফরাসি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার বাবা উসমানীয় ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। ১৯৩৪ সালে বালাদুরের বাবা-মা ছয় সন্তানকে নিয়ে ইজমির ছেড়ে ফ্রান্সে চলে যান। পরে তারা দক্ষিণ ফ্রান্সের মার্সেই শহরে বসতি গড়েন।

 

 

বালাদুর ফ্রান্সের আমলাতান্ত্রিক অভিজাতদের প্রশিক্ষণের প্রধান প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল স্কুল অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে প্রধানমন্ত্রী জর্জ পম্পিদুর উপদেষ্টা হিসেবে সরকারি কাজে যোগ দেন। পরে পম্পিদুর প্রধান কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে পম্পিদুর মৃত্যুর পর কিছু সময়ের জন্য রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান বালাদুর। তবে ১৯৮৬ সালে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তখন জ্যাক শিরাকের মধ্য-ডানপন্থী সরকারে অর্থনীতি, অর্থ ও বেসরকারিকরণবিষয়ক মন্ত্রী হন তিনি। মন্ত্রী হিসেবে বালাদুর বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এর মধ্যে ছিল কর ও সরকারি ব্যয় কমানো, শ্রমবাজারের কিছু নিয়ম শিথিল করা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেওয়া।

 

তার সময় ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি বেসরকারি খাতে বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ছিল ব্যাংক সোসিয়েতে জেনেরাল, পারিবাস এবং সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান তিএফ১। পরে পারিবাস বিএনপি পারিবাসের অংশ হয়ে যায়। ১৯৯৩ সালে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী হন বালাদুর। সে সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সমাজতান্ত্রিক নেতা ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ। রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে সরকার পরিচালনার এই ব্যবস্থা ফ্রান্সে ‘কোহাবিতাসিওঁ’ নামে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালাদুর পেনশন ব্যবস্থায় সংস্কার আনেন এবং বেসরকারিকরণ কর্মসূচি আরো বাড়ান।


 

বালাদুরের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনে জ্যাক শিরাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দুজনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বও ছিল। শিরাক মনে করেছিলেন, বালাদুর প্রধানমন্ত্রী হলে ভবিষ্যতে তার নিজের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ আরো সহজ হবে। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালাদুরের জনপ্রিয়তা শিরাককে ছাড়িয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে বালাদুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। এর পরই দুই পুরোনো বন্ধুর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ শুরু হয়। বালাদুর আগে বলেছিলেন, ক্ষমতা ভাগাভাগি করে পরিচালিত সরকারের কোনো প্রধানমন্ত্রীর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া উচিত নয়। পরে নিজেই প্রার্থী হওয়ায় তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। শুরুতে অবশ্য তার জনপ্রিয়তা ছিল অনেক বেশি। 

১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে ফরাসি দৈনিক ‘লে মঁদ’ এক প্রতিবেদনে তাকে নির্বাচনের স্পষ্ট ফেবারিট হিসেবে তুলে ধরে। বিভিন্ন জনমত জরিপেও তিনি অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারের সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও বালাদুর খুব স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। বহু বছর পর এক তথ্যচিত্রে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, ‘আমি খুব ভালো প্রার্থী ছিলাম না।’ শেষ পর্যন্ত প্রথম দফার ভোটেই বাদ পড়ে যান বালাদুর। তিনি পান ১৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে শিরাক পান ২০ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট। পরে শিরাকই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৯৫ সালের পরাজয়ের পর বালাদুরের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিকোলা সারকোজিও সেই সময় রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়েন। কারণ, তিনি বালাদুরের নির্বাচনী প্রচারে জোরালোভাবে কাজ করেছিলেন।


 

১৯৯৫ সালের নির্বাচনী প্রচার বালাদুরের রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার প্রচারের অর্থ কোথা থেকে এসেছিল, তা নিয়ে পরে তদন্ত শুরু হয়। কৌঁসুলিদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনী প্রচারে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের সন্দেহ ছিল, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি থেকে পাওয়া অবৈধ কমিশনের অর্থ ওই প্রচারে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এই অভিযোগের সঙ্গে পরে পাকিস্তানের করাচিতে ২০০২ সালের আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনাও যুক্ত হয়। ওই হামলায় ফরাসি নৌযান নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ১১ কর্মী নিহত এবং ১২ জন আহত হন। নিহত ব্যক্তিরা পাকিস্তানের সঙ্গে করা একটি চুক্তির আওতায় সাবমেরিন নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন। তাদের কয়েকজনের পরিবার বালাদুরের বিরুদ্ধে অভিযোগও করে।

মামলাটি ফ্রান্সে ‘করাচি কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়। তবে বালাদুর শুরু থেকেই সব ধরনের অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে ফ্রান্সের প্রজাতন্ত্রের বিচার আদালত তাকে খালাস দেন। আদালত জানায়, অস্ত্র চুক্তির সঙ্গে যুক্ত অর্থ দেওয়ার নির্দেশ বালাদুর নিজে দিয়েছিলেন- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার নির্বাচনী প্রচারের অর্থের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগও প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বালাদুর পরে বলেছিলেন, তার বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ বছর ধরে ‘অপপ্রচার’ চালানো হয়েছে। ১৯৯৫ সালের পরাজয়ের পরও রাজনীতি ছাড়েননি বালাদুর। ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে পাঁচ বছর জাতীয় পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

পরে প্রেসিডেন্ট হওয়া নিকোলা সারকোজি তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের দায়িত্ব দেন। এর একটি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০০৮ সালে ফ্রান্সের সংবিধানে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। ব্যক্তিগত জীবনেও বালাদুর ছিলেন তুলনামূলকভাবে শান্ত স্বভাবের মানুষ। ব্যাংকারের ছেলে এই রাজনীতিককে ফ্রান্সের মধ্য-ডানপন্থী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। তবে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে তিনি অনেকটা দূরে- এমন সমালোচনাও ছিল। সংবাদপত্রের কার্টুনে তাকে প্রায়ই অভিজাত ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হতো। ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক ‘লে কানার অঁশেনে’ তাকে ব্যঙ্গ করে একটি বিশেষ নামও দিয়েছিল।


 

বালাদুরের সঙ্গে ফরাসি রাজনীতির আরো অনেক পরিচিত নামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি এবং ব্যবসায়ী নিকোলা বাজিরে। ১৯৯৫ সালের নির্বাচনে শিরাকের কাছে পরাজয় এবং পরবর্তী আইনি বিতর্ক তার রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল। তবু ফ্রান্সের অর্থনীতি, বেসরকারিকরণ ও প্রশাসনিক সংস্কারে তার ভূমিকা দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। ব্যক্তিগত জীবনে বালাদুরের স্ত্রী ছিলেন মারি-জোসেফ। তাদের চার ছেলে - পিয়ের, জেরোম, অঁরি ও রোমাঁ।

জিবি নিউজ24ডেস্ক//

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন