বছরে বেকার হচ্ছে ৮ লাখ কর্মক্ষম মানুষ

সিপিডির সংলাপে বক্তারা

কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধিসহ সরকারের সামনে পাঁচ চ্যালেঞ্জ * মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের তাগিদ

39

চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় প্রতি বছর নতুন করে বেকার হচ্ছে ৮ লাখ কর্মক্ষম মানুষ। গত ১০ বছরে আর্থ-সামাজিক খাতে অনেক উন্নয়ন হলেও কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর বাইরে আরও ৫টি চ্যালেঞ্জ বর্তমান সরকারের সামনে।

এগুলো হচ্ছে- কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে যুব কর্মসংস্থান নিশ্চিত, বৈষম্য বৃদ্ধি রোধ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত, সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা ও মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে আনা এবং দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ‘কাক্সিক্ষত সামাজিক উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি : বিষয়াদি এবং অগ্রাধিকার’ প্রতিবেদন এবং সংলাপে দেয়া বক্তব্যে এসব বিষয় বেরিয়ে এসেছে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও তাগিদ দেয়া হয়েছে।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী।

আলোচক ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. রশিদ-ই মাহবুব। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংস্থার সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

সংলাপে ‘স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যান্ড ন্যাশনাল ইলেকশন-২০১৮ প্রায়োরিটিস ফর ইলেক্টরাল ডিবেটস’ বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে ২১ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কর্মের বাজারে ঢুকছে। কিন্তু কর্মসংস্থান হচ্ছে প্রায় ১৩ লাখের। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১১ সালে ৬ ভাগ থাকলেও পরে তা বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ৮৬ ভাগ। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশ। ২০১৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ ভাগ। সেটি এখন ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুটি ভাবনার বিষয় হচ্ছে- উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া। অন্যটি প্রবৃদ্ধির সুফল সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। যা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক নয়।

বৈষম্য নিয়ে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ ধনী ৫ শতাংশের তুলনায় সর্বনিু ৫ শতাংশের আয় বৈষম্য ব্যাপক বেড়েছে। ১৯৯১-৯২ সালে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ধনীর আয় ছিল ১৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। সেটি বেড়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে হয়েছে ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। উল্টো চিত্র গরিবের ক্ষেত্রে। ১৯৯১-৯২ সালে সর্বনিু ৫ শতাংশ গরিবের আয় ছিল ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। সেটি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ২৩ ভাগে। এ বিষয়ে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোর উন্নয়ন হলেও তার মানসম্মত ব্যবহার হচ্ছে না। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানোসহ স্বাস্থ্যে অনেক ক্ষেত্রে সুমান অর্জন করেছে দেশ। এরপরও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব। এজন্য সম্পদের সীমাবদ্ধতা, পেশাদারিত্বের অভাব এবং নিুমানের ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত উদ্যোগকেই দায়ী করা হয়েছে।

সরকারিভাবে গত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ২০৫ টাকা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় এ দেশে ব্যক্তির পকেট থেকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে এ খাতে একজন মানুষের পেছনে মোট যে ব্যয় হয় তার ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ যায় ব্যক্তির পকেট থেকে। ভারতে ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ, পাকিস্তানে ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ, নেপালে ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভুটানে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় হয়।

শিক্ষায়ও অর্জন অনেক। প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি, বয়স্ক শিক্ষার হার বৃদ্ধি, উপবৃত্তির আওতা বৃদ্ধি, বিনামূল্যে বই, ছাত্র ও শিক্ষকের গড় অনুপাত হ্রাস, শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানোয় সাফল্য রয়েছে।

কিন্তু মানসম্মত শিক্ষার ব্যাপক অভাব। সরকারিভাবে শিক্ষার খরচও খুব বেশি বাড়েনি। গত ১০ বছরে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় বেড়েছে ৪৪৫ টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে দ্বৈধতা পরিহার, কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং তদারকি জোরদারের তাগিদ দেয়া হয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমএ মান্নান বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ৯০ ভাগের বেশি সঠিক সুবিধাভোগীরাই পাচ্ছেন। হাজার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। কিছু ব্যর্থতা তো রয়েছে। তারপরও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, মানুষের আয় বাড়ছে, তারা এখন সরকারি হাসপাতালে যেতে চায় না। বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে তাদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। আমরা চাই বৈষম্য দূর হোক। জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করুক। দারিদ্র্য হচ্ছে অন্যতম প্রধান সমস্যা। ক্ষুধার নেকড়ে বাঘ সব সময় আমাদের তাড়া করছে। তাই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সমস্যা বাড়ানো যাবে না।

ড. রেহমান সোবহান বলেন, মানসম্মত শিক্ষা এখন অনেক বড় বিষয়। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিতে সরকারের জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন করতে হবে। দারিদ্র্য নিরসন হলেও জিডিপির সুফল সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।

মুহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বলা হচ্ছে শিক্ষা খাতে মানসম্মত শিক্ষা দেয়া হয় না। কিন্তু শিক্ষা খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি না করলে এত প্রবৃদ্ধি হয় কিভাবে। তবে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে কখনও আপস করা হবে না।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড. জাফরুল্লাহ বলেন, সুশাসন যে কোনো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তার, ডিসি ও অন্যান্য কর্মকর্তাকে হেদায়েত করার জন্য শিক্ষা দিতে হবে। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পুরনো ১৭টি জেলাকে স্টেট হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বেশকিছু ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন।

আলোচনায় অংশ নেন প্রফেসর ড. রওনক জাহান, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা চৌধুরী মুফাদ আহমেদ প্রমুখ।

মন্তব্য
Loading...