সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে নৈতিকতার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী

141
gb

মিজানুর রহমান মিজান ||

একটা সুসভ্য সমাজ গঠনে মানুষের নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন আচার-আচরণ, সৌহার্দ পূর্ণ মনোভাব থাকা আবশ্যক। নৈতিক উৎকর্ষতা সমাজ বিনির্মাণে সুসংগঠনের মুল মন্ত্র হিসেবে পরিগণিত। সমাজ,সভ্যতা,শালীনতা সমৃদ্ধ হয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মানবিক মূল্যবোধে এগিয়ে যাবার নামই সংস্কৃতি। আবার সুন্দর ও কল্যাণের পথ অনুসরণে সমাজের সুদৃঢ় ভিত জীবন যাত্রার অন্যতম উপাদান। সুন্দরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেমন বেশী, অসুন্দরকে মানুষ অনুরূপ বর্জন করার পক্ষপাতী। কিন্তু’ সামাজিক অবস্থানে অনেক সময় লোভ-লালসার মোহে অসুন্দরকে আঁকড়িয়ে ধরে। ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলার। সুন্দরের পরিবর্তে অসুন্দর মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। যাকে বলা চলে অপসংস্কৃতি। কিন্তু’ অপসংস্কৃতি কখনই মঙ্গল বয়ে আনে না বা বয়ে আনতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহমান শাদাব বলেছেন, “সমাজ জীবন বিষিয়ে তুলতে দুরাচারীর সংখ্যা বেশী হবার দরকার নেই। পর পর তিন রাত্রি পাড়ায় ডাকাতি হলে গৃহস্থের চোখে আর ঘুম থাকে না“ বলে বাস্তবতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন সুনৈপূণ্যতার সহিত। আবার নিকোলাস চেমস ফোর্ড বলেন, সমাজ দুই ধরনের লোক নিয়ে গঠিত যারা তাদের আহারের রুচি বা ক্ষুধার তুলনায় অনেক বেশী খাবার খায়, আর যারা ক্ষুধার তুলনায় খুব কম আহার খায়“। আবার সময়ের সহিত পাল্লা দিয়ে বা যুগের সহিত তাল মিলাতে গিয়ে অনেক কিছু হয়ে উঠে নির্ধারিত,অবধারিত ও অনিবার্য। সর্বোপরি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় সত্য, সততা ও মানবিক মূল্যবোধের সরব উপস্থিতি’তি ধরে রাখা বা পুনরুদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ভিনসেন্ট বলেন ,“পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টা থাকলে জীবনে অথবা সমাজে পরিবর্তন আসবেই“। সত্য ,সুন্দরের পূজারী হওয়া সর্বোত্তম পন্থা। 
আমরা সুতীক্ষ্ণ নজরদারীতে দেখতে পাই এক সময় আমাদের সমাজ জীবনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর ছিল। আজ তা বহুলাংশে নির্বাসিত জীবনের অধিকারী। ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে সুসম্পর্ক হেতু শ্রদ্ধা, সম্মান, মর্যাদা বন্ধু সুলভ আচরণে বিমোহিত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। কিন্তু’ লোভ লালসা ও প্রতিহিংসার দাবানলে তা পরিপূর্ণ গ্রাসের সম্মুখীন। যা কখন ও কাম্য ছিল না বা থাকার কথা ও নয়। আমরা ছোট বেলা প্রত্যক্ষ করেছি, স্বজন ব্যতীত ও এলাকার কোন মুরবিবয়ান বা বয়োজৈষ্টদেও সম্মুখে যুবক সম্প্রদায় এমন কোন কাজ করতে ইতস্তত বোধ করতেন যা বেয়াদবির বা অমর্যাদার সামিল। যা আজ উধাও শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। “কি হলো“ বা আমিত্বের অহংকারে গর্বিত। প্রাইভেট পড়াব বর্তমান ছাত্রদের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত। আমি বুঝি না যে শিক্ষক প্রাইভেট পড়ান স্কুলে ক্লাসের সমসংখ্যক ছাত্রদের জড়ো করে। ঐ শিক্ষকই ত ক্লাস নেন ঐ বিষয়ের উপর। প্রাইভেট পড়লে ছাত্ররা অনায়াসে বুঝে। কিন্তু’ ক্লাস নিলে ছাত্ররা বুঝে না। এ দু‘য়ের মাঝে কি পরিমাণ পার্থক্য বিরাজমান? শিক্ষক যেমন প্রাইভেট পড়াতে অভ্যাস’, অনুরূপ ছাত্ররা ও পড়তে অতি উৎসাহী। সুতরাং এক্ষেত্রে ছাত্র শিক্ষক অভিভাবক সচেতন হলে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় উদ্ভাবন সম্ভব। কোমল মতি ছাত্রদের যে দিক নির্দেশনা দেবেন বা মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত রেখে শিক্ষক দেবেন । তাই তারা গ্রহণে অনুপ্রাণিত হবে, আগ্রহ জমবে। গাইড বই নিষিদ্ধ। কিন্তু’ এক শ্রেণীর শিক্ষক এ ব্যাপারে জড়িত। ছাত্রদের উৎসাহিত করে তোলেন বই বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে। কিন্তু’ ঐ শিক্ষকের বিবেক বোধ জাগ্রত না 
হলে করণীয় কিছুই নেই। যে শিক্ষকের বিবেক বিসর্জিত, ঐ শিক্ষকের নিকট থেকে ছাত্ররা কি শিখবে আমার প্রশ্ন থেকেই যায়। নীতির অভাব ঐ শিক্ষকের চরিত্রে প্রকট। সুতরাং নৈতিকতার প্রয়োজন সর্বাগ্রে। সরকার আইন করে যথাযথ প্রয়োগের সহিত নাগরিকের আইন মান্যের বা পালনের অভ্যাস গঠন অতীব জরুরী। বয়ঃক্রম অনুসারে গ্রামের মানুষজন সম্মিলিত ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা, সহমর্মিতা প্রকাশ বা বিপদে এগিয়ে আসা নৈমিত্তিক ব্যাপারে ছিল পরিগণিত। এ ক্ষেত্রে দু‘একটা ঘটনার উদ্ধৃতি বিষয়টিকে সুস্পষ্ট রূপে প্রতীয়মানে সাহায্য করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস । আমি ১০/১১ বছরের বালক । শীতের সকাল বেলা প্রতি দিনের মত গ্রামের সকল সমবয়সী জমায়েত হত এক স্থানে। আমরা ও কয়েকজন ছোট হওয়াতে তাঁদের থেকে একটা দূরত্ব বজায় রেখে খোশ গল্পে মত্ত। ওরা একে অপরের চুল কাটছেন পালাক্রমে অত্যন্ত আনন্দ উল্লাসের সহিত। যা নিয়মের আবর্তে নির্ধারিত। ইত্য বসরে গ্রামের এক বয়োজৈষ্ট ব্যক্তি দুর থেকে একজনের নাম ধরে বললেন তিনির ছোট ছেলের চুল কেটে দিতে পায়ে চলা না থামিয়ে। তাৎক্ষণিক এক যুবক ছোট বিবেচনায় সাথে সাথে চুল কেটে দিলেন এবং ঐ বয়সের আরো দু‘জনের। অত:পর তাদের কর্মে নিয়োজিত। 
দশ পনের জনের কাফেলা। দু‘জন দু‘জন হয়ে পারস্পরিক চুল কাটায় মশগুল। ফাঁকে ফাঁকে রং তামাশা। সবেমাত্র একজনের আগমন। আগন্তুক ব্যক্তিকে একজন ধরেন বিড়ি প্রদানের নিমিত্তে। এ ক্ষেত্রে উভয়ে তামাশা স্বরূপ জেদ ধরেছেন দিবেন না এবং না নিয়ে ছাড়বেন না। অপর একজন শরিক হয়েছেন নেবার দলে এবং তিনির হাতে সম্পূর্ণ নুতন ব্লেড খোলে ঐ ব্যক্তির কনুইর উপর ধরে বলছেন, না দিলে হাত কেটে দেব। হঠাৎ ধৃত ব্যক্তি মুক্ত হবার প্রত্যাশায় জোরে ঝাঁকুনি মারতেই পূর্ণ ব্লেড হাতের মাংসে ঢুকে পড়ে। শুরু হয় অঝোর ধারায় রক্তপাত। প্রচুর রক্তপাতের ফলে মানুষটি ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করে। এখন সকল যুবক ঐ যুবকের সুস্থতার চিন্তায় মগ্ন। সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যুব সম্প্রদায়ের মাঝে। সমবয়সীদের মুহূর্তে আগমন। কিন্তু’ কেউ কাউকে কটু বাক্য, অশালীন বা উত্তেজনা মূলক কথা থেকে বিরত। একটাই মাত্র সবার লক্ষ্য ওকে সুস্থ করে তোলা এবং সুস্থ হয়ে ওঠা। যে ক‘দিন ঐ ব্যক্তি অসুস্থ ছিলেন সকলেই তার প্রয়োজনীয় পারিবারিক কাজ কর্ম সমাধা করে দিয়েছেন। তার অনুপস্থিতি পরিবারকে বুঝতেই দেয়া হয়নি। আর অভিভাবক মহল সমবয়সীদের ব্যাপার বলে সর্বক্ষণ এড়িয়ে চলার নীতিতে ছিলেন বিশ্বাসী এবং অটল।
আমি আশির দশকে স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলাম। একটি ঘর তৈরীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ঘর তৈরীর সকল সরঞ্জাম ক্রয় করেছি বিভিন্ন স্থানে। এগুলো সংগ্রহে আমার অনেক টাকার দরকার। ভাবনায় কুল কিনারা পাচ্ছি না। অকস্মাৎ পাশের গ্রামের এক যুবক বললেন উপযাচক হয়ে আপনার যাবতীয় সরঞ্জাম পরিবহনের একটি তারিখ নির্দিষ্ট করে জানানোর নিমিত্তে। তিনির কথা মত তারিখ সাব্যস্ত করে বলতেই ঐদিন আমার সকল সরঞ্জাম বিশ জন যুবক মিলে এনে দিলেন এবং তারা সুবিধা জনক দিনক্ষণ ঠিক করে স্বেচ্ছায় এসে ঘরটি তৈরী করে দিলেন। সে সময় এ জাতীয় কর্ম পন্থা ছিল প্রচুর বিদ্যমান। কিন্তু বর্তমানে একে অপরের ছোট খাট ব্যাপারে ও এগিয়ে আসার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে বা একে বারে নির্বাসিত। বড় হলেত কথাই নেই। সর্বত্র কর্ম বিমুখতার লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় অধিক হারে।

খেলাধুলা, উৎসব অনুষ্ঠানে ছিল ঐক্যের প্রাণ চাঞ্চল্য। নিত্যদিন প্রত্যেক গ্রামের নির্দিষ্ট মাঠে বিভিন্ন বয়সের মানুষের একত্রিত হবার সুবাদে একে অপরের সুখ-দু:খের অংশীদার, সমব্যথী ছিলেন সর্বক্ষণ। ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের অপূর্ব বাঁধন হত মজবুত। “মানুষ মানুষের জন্য“শ্লোগান ছিল যুতসই। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অত্যাধুনিক আবিষ্কারের ফলে প্রত্যেকের ঘরে বসে টিভি, ভিসিডি ইত্যাদি দর্শনে সক্ষম হওয়ায় পূর্বের মত ভাবের আদান-প্রদান উঠেছে লাটে। কে কোথায়, কখন চলছে পাশের গৃহের প্রতিবেশী ও খবর রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না বা হয় ও না। এ জাতীয় জীবন যাত্রাকে বলা হত শহুরে জীবন। আজ গ্রামকে গ্রাস করেছে শহুরে জীবনের প্রভাবে। সবাই যেন যন্ত্র চালিত, যন্ত্র মানব রোবট। উৎসবে ,অনুষ্ঠানে গ্রামের সবাই নিজের কাজ হৃদয় তন্ত্রীতে ধারণ পূর্বক রাত দিন ছিল কর্মব্যস্ত। আজ টাকার বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োজিত। একে অপরের সহিত কথাবার্তা ,আচার-আচরণে শ্রদ্ধা, সম্মান, সমীহ, আন্তরিক সৌহার্দ্য পূর্ণতার পরিবর্তে মেকির প্রবণতা লক্ষণীয়। জায়গা জমি ক্রয়-বিক্রয়ে মৌখিক কথাবার্তা অনেক গুরুত্ব বহনকারী ছিল। কথা রক্ষা, ওয়াদা পালনে ছিলেন অধিক সচেষ্ট। ভঙ্গ বা বর খেলাফের সংখ্যা ছিল নগণ্য। সহজ সারলিকতা প্রদর্শন ছিল নৈমিত্তিক। কারসাজি, প্রতারণার হার ছিল হাতে গোণা। গ্রাম্য সালিশ বৈঠকে ন্যায় বিচার প্রাপ্তি বা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার প্রবণতা অধিক মাত্রায় হত প্রতিষ্ঠিত। আজ সালিশ বিচারে ও ঘুষের ছড়াছড়ি এবং মুখ চেয়ে বিচারের ফলে “বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে“ অহরহ। ন্যায় বিচার ব্যবস্থাটা’াটা যেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অসহায়ের ন্যায় বিচার প্রাপ্তি সোনার হরিণ তুল্য। সালিশ বিচারকরা আধুনিক ঘুষের প্রবণতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এই যেমন বিচারে আসতে হলে টাকা নেবে ঋণ স্বরূপ অথবা চাইবে ঋণ। না দিলে আসবে না। আবার দিলে তা আর ফেরত পাবে না। এ ধারার সংস্কৃতিকে আমি বলতে চাই আধুনিক ঘুষ। দুর্বলের স্বপক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার মানুষের বড়ই অভাব, তীব্র থেকে তীব্রতর। এ থেকে উত্তরণ জরুরী । সৎ থাকা ও সত্য বলা দু:স্বপ্নের মত।“ বিবেক মানুষের সর্বোচ্চ আদালত“ বাক্যটিকে আমাদের জীবন যাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করার সচেতনতা সবার হৃদয়ে ধারণ করা এবং লালনে অগ্রসর থাকা আবশ্যক। 
বিয়ে শাদীর ক্ষেত্রে বর পক্ষ থেকে গ্রামের সকল মুরবিবয়ানকে নিমন্ত্রণ করে “বর সাজাতে হত“। আবার কনে পক্ষের বাড়ীতে বরকে বরণ করতে কনের গ্রামের মুরবিবয়ানকে নিমন্ত্রণ করে অনুমতি সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। এটা এক প্রকার বাধ্যতামূলকের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু’ আজ পঞ্চায়েত বা গ্রাম বাসীর নিমন্ত্রণে কোন প্রকার বাধ্যবাধকতা ছাড়া ও “ইচ্ছে হলে“ নিমন্ত্রণের ব্যাপার বলে গণ্য। পুরাতন বলে এ সকল নিয়ম নীতি পরিগণিত। নিত্য নুতন নিয়ম প্রতিষ্ঠিত। নৈতিকতার মান উন্নত হলে একটি জাতি ,দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। নতুবা নীতি হীনতার পচনে সোপান হয় ব্যাহত। 
অর্থ ও জনবলে বলীয়ান হয়ে প্রতিবেশীর ভূ-সম্পত্তি তিলে তিলে গ্রাস যা সর্বক্ষেত্রে নীতিহীনতার পরিচায়ক। আপনার গাছের ডাল কাটবেন না অপরের বিরাট ক্ষতির পর ও তা কি মানবিক? আপনার ভূমির এক ইঞ্চি ও রাখবেন না,খনন করবেন জলাশয়। ভাঙ্গনের মাধ্যমে মাটি নেবার আজব ফন্দি এবং চাতুরী। মানুষ নামের অমানুষের কাজ নয় কি? মরণ রয়েছে সর্বক্ষণ তোমার সাথী হয়ে। নিবে না কিছুই সঙ্গে। কোন লোভে পশুত্বের আচরণে মগ্ন ? ভাবিয়া করিও কাজ, নাহি পাবে লাজ। মানব জীবন সবার সফল ও সার্থক হোক মানবীয় গুণাবলীতে এ আশাবাদ মহান আল্লাহর দরবারে। 
মিজানুর রহমান মিজান, সাবেক সভাপতি বিশ্বনাথ প্রেসক্লাব, বিশ্বনাথ, সিলেট।

gb
মন্তব্য
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More