আইনের ফাঁদে আটকা উপজেলার গতি

ভোটের আগেই বিধান সংশোধনের দাবি

সদস্যরাও প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হোক * নির্বাচনের আগেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বিষয়টি তুলব -স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী

41

আইনের ফাঁদে আটকে আছে উপজেলা পরিষদের গতি। ফলে দীর্ঘ ৩২ বছরেও স্থানীয় সরকারের এ প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শক্তিশালী হয়নি। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ছাড়া এর একজন সদস্যও উপজেলার জন্য নির্বাচিত নন।

তারা ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার জন্য নির্বাচিত হয়ে পদাধিকার বলে উপজেলার সদস্য হচ্ছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা অনেক সময় জোট বেঁধে চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ান। এতে কাজের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় নির্দিষ্ট মেয়াদের উন্নয়ন কাজও সময়মতো শেষ হয় না।

এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা নির্বাচনের আগেই সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের দাবি তুলেছেন। তারা চান- ইউনিয়ন বা পৌরসভার মতো উপজেলা পরিষদের সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হোক। এ বিষয়টি আইনে যুক্ত করতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হলে বিদ্যমান আইন সংশোধনের কথা বলছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো উপজেলা পরিষদের সব সদস্যকে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার বিধান যুক্ত করতে হবে। উপজেলা পরিষদ কাক্সিক্ষত মাত্রায় কার্যকর ও গতিশীল করতে হলে এই আইনি দুর্বলতা দূর করার কোনো বিকল্প নেই। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনের আগেই এ সংক্রান্ত আইন সংশোধন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

এ প্রসঙ্গে নবনিযুক্ত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজেই পাঁচ বছর উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলাম, আমি এর ভুক্তভোগী এবং বিষয়টি অবগত। নির্বাচনের আগেই যাতে এ সমস্যার সমাধান হয়, সে ব্যাপারে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সমস্যা তুলে ধরব।’

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়ররা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হলেও পদাধিকার বলে তারা উপজেলা পরিষদের সদস্য। এ জন্য তাদের আলাদাভাবে কোনো নির্বাচনে জয়ী হতে হয় না। ফলে তারা একটি নির্বাচনে জয়ী হলেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী হচ্ছেন।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদ একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক একাংশ। একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন ভাইস চেয়ারম্যান (একজন পুরুষ ও অপরজন নারী) জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। পদাধিকার বলে সংশ্লিষ্ট উপজেলার এলাকাভুক্ত প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও সব সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের একটি অংশ পরিষদের সদস্য হন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিষদের সচিব হিসেবে সাচিবিক সহায়তা দেন। অর্থাৎ উপজেলা পরিষদে শুধু চেয়ারম্যান ও দুই ভাইস চেয়ারম্যান জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। বাকিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্বাচিত হলেও তারা উপজেলা পরিষদের জন্য নির্বাচিত নন। এদের সংখ্যাও নির্বাচিতদের চেয়ে বেশি।

নির্বাচনের আগে বিদ্যমান উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন করা ঠিক হবে না। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এক আইনের আওতায় এনে নির্বাচন করা যেতে পারে। যা প্রতিবেশী দেশ ভারতে রয়েছে। প্রতিটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাচন করা উচিত।’ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়ররা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্বাচিত হলেও তারা এক ভোটে দুই প্রতিষ্ঠানের পদ পাচ্ছেন মন্তব্য করে ড. তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, ‘বিদ্যমান আইন সংশোধন করে উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’ একাধিক উপজেলা চেয়ারম্যানের দাবি- ইউপি চেয়ারম্যানরা উপজেলা পরিষদের জন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। যেহেতু তারা উপজেলা পরিষদের জন্য নির্বাচিত হননি তাই তারা বৈঠকে এসেই শুধু বরাদ্দের টাকা ছাড় করাতে ব্যস্ত থাকেন। উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী হোক তা তারা চান না। গোষ্ঠীগত কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউপি চেয়ারম্যানরা একজোট হয়ে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবও করার নজির রয়েছে। এমনকি এ কারণে বরখাস্ত হয়েছেন কোনো কোনো উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, ‘২০০৭ সালে ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও গতিশীলকরণের কমিটিতে আমি ছিলাম। সেখানে আমরা উপজেলা পরিষদে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পরিবর্তে প্রতি ইউনিয়ন থেকে একজন করে সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার সুপারিশ করেছিলাম।

কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। আমি মনে করি সেটাই হওয়া উচিত। কারণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছা করলে উপজেলা পরিষদকে অকার্যকর করে দিতে পারেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এমনও বলেছে- উন্নয়ন যা করার ইউনিয়ন পরিষদ করছে, উপজেলা পরিষদের কোনো কার্যক্রমের দরকার নেই। দেশে এমনও নজির রয়েছে যে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা অনাস্থা প্রস্তাব দেয়ায় উপজেলা চেয়ারম্যানদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করেই উপজেলা নির্বাচন দেয়া উচিত।’

এ প্রসঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে যেভাবে উপজেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে তা সংবিধানসম্মত হয়নি। কারণ উপজেলা পরিষদ একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক একাংশ। কাজেই উপজেলা পরিষদের সব সদস্যের অবশ্যই সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। পদাধিকার বলে সদস্য হওয়া ঠিক না। জেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ যেভাবে গঠন হয়েছে উপজেলা পরিষদও সেভাবেই গঠন হওয়া উচিত। কারণ উপজেলা পরিষদের নিজস্ব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তারা বাধার সৃষ্টি করে থাকে। এ কারণে উপজেলা পরিষদে কাক্সিক্ষত গতি আসছে না।’

বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার যুগান্তরকে বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী হওয়ার প্রধান অন্তরায় বিদ্যমান আইন। কারণ ইউনিয়ন পরিষদের জন্য নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের নিয়ে গঠিত উপজেলা পরিষদ স্বশাসিত নয় এবং সংবিধান নির্দেশনাবিরোধী। উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের মতো প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে একজন করে সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসা উচিত। কারণ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়ররা তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্বাচিত, তারা তো উপজেলা পরিষদের জন্য নির্বাচিত নয়। তারা উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী করতে কেন ভূমিকা নেবে? এর আগে জেলা পরিষদে এ ধরনের সমস্যা ছিল কিন্তু জেলা পরিষদ নির্বাচনের আগেই আইন সংশোধন করে সমাধান করা হয়। তাই এ সমস্যার সমাধান করে উপজেলা নির্বাচন করা উচিত।’

মন্তব্য
Loading...