মফস্বল  সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে

161
gb

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির:সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এ পেশার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকতে হবে মানব সেবা করা। পৃথিবীতে মানব সেবা করার যতগুলো পন্থা আছে তার মধ্যে লেখার সেবাও কম নয়; লেখনীর মাধ্যমে যেভাবে এদেশের সকল মানুষের উপকার করা যায় অন্যভাবে তা করা যায় না। এক্ষেত্রে মফস্বলের প্রত্যেকটা সাংবাদিক পরিচিত। সবাই সবাইকে চেনে। এখানে কোন সংবাদ হলে তাকে টার্গেট করা সহজ। মফস্বলের সাংবাদিক প্রতি মুহুর্তে, প্রতিদিনই ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
এডমন্ড বার্ক বলেছেন ‘পার্লামেন্টের তিনটি রাষ্ট্র রয়েছে। কিন্তু ঐ যে দূরে সাংবাদিকদের আসন সারি সেটি হচ্ছে পার্লামেন্টের চতুর্থ রাষ্ট্র এবং আগের তিনটি রাষ্ট্রের চেয়ে তা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ’! এডমন্ড বার্কের সে উক্তি থেকে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করলে সহজেই বোঝা যায় যে, পার্লমেন্ট ও সংবাদপত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা দু’টি ভিন্ন বিষয় হলেও পরস্পর পরস্পরের পরিপুরক। সংবাদপত্র ছাড়া সাংবাদিকতা যেমন ভাবা যায় না- তেমনই সাংবাদিকতাকে বাদ দিয়ে সংবাদপত্রেরও অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেননা সাংবাদিকতা হচ্ছে ব্যক্তি এবং সংবাদপত্র হচ্ছে প্রতিষ্ঠান।

 

সংবাদপত্রের জন্য কোন ব্যক্তি যখন সংবাদ সংগ্রহকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে তখন তাঁকে বলে সাংবাদিক। আর তাঁর পেশাকে বলা হয় সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা হচ্ছে সেবামূলক একটি পেশা। পেশাটি খুবই সহজ বা আরামের বলে অনেকের কাছে প্রতীয়মাণ হলেও আদতে সাংবাদিকতা ব্যতিক্রমধর্মী পেশা- যা কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় অন্য সব পেশার চাইতে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুনিয়ার তাবৎ সমাজ ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে অনেক প্রতিকুল পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়- দায়িত্ব পালনও করতে হয় বিচক্ষণতার সাথে। আধাত্মিক জ্ঞান, প্রতিভা বা মেধা না থাকলে প্রকৃত সাংবাদিক যেমন হওয়া যায় না- তেমনই সমাজ বা রাষ্ট্রও তাদের দ্বারা উপকৃত হতে পারেনা।

উন্নয়নশীল দুনিয়ায় ক্ষুধা-দারিদ্রতার কারণে সমাজ ও রাজনীতি অস্থিতিশীল থাকায় দুর্নীতি শক্ত শেকড়ে বিশাল বটবৃক্ষের ন্যায় ক্রমশ: বিস্তৃত হওয়ায়- সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিপরীতে পেশীশক্তিধারী অপসাংবাদিকদের দাপট-দৌরাত্ম্য এখন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা বাংলাদেশে এখন অপ্রতিরোধ্য! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প ২৮লক্ষ পপুলার ভোট কম পেলেও এবং নির্বাচনকালে তাঁর কথাবার্তা নিয়ে গণমাধ্যমসহ এখন পর্যন্ত অনেকেই তাঁর সমালোচনা মুখর থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী তিনি প্রেসিডেন্ট। তাঁর অভিষেক অনুষ্ঠানে লোক সমাগম নিয়ে গণমাধ্যম সঠিক তথ্য তুলে ধরেনি উল্লেখ করে ‘সাংবাদিকরা পৃথিবীর সবচাইতে অসৎ লোক’ বলে মন্তব্য করে সাংবাদিকদের চড়া মূল্য দেওয়ার যে হুমকী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দিয়েছেন- তা উদ্বেগজনক হলেও বাংলাদেশে ও বিশ্বে সাংবাদিকরা আদর্শচ্যুত হওয়ায়ই তিনি এ সাহস পেয়েছেন।

চরম সত্যকথা! অর্থলোভী সাংবাদিক নামধারীরা অপসাংবাদিকতাসহ গুপ্তচরের ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হওয়ার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যসহ দুনিয়ার দেশে দেশে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বৃদ্ধিসহ রক্তের হোলিখেলা চলছে- তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধলে এই অপসাংবাদিকদের কারণেই বাঁধতে পারে। জীবনের অধিকাংশ সময় জেল জুলুমের শিকার হয়ে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ক্ষেত্রও প্রস্তুত করেছিল অপসাংবাদিকরাই! বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন যদি সাংবাদিকদের দুর্নীতির তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিত- তা’হলে দেশের ৬০% দুর্নীতি যেমন দ্রুত হ্রাস পেত- তেমনই আরও ১৫ বছর আগেই মালেয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার মত উন্নত জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হতো বাংলাদেশ।

ফাস্টওয়ার্ল্ডে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে যতটা মর্যাদা দেয়া হয় থার্ডওয়ার্ল্ডে তা কল্পনাই করা যায় না! থার্ডওয়ার্ল্ডে ক্ষুধা-দারিদ্রতার কারণে সুশিক্ষা বঞ্চিত হওয়া ও অপসংস্কৃতিসহ নানা প্রতিকুলতার কারণে মূল জনগোষ্ঠির ৯০% নাগরিকরা অসচেতন বিধায় তাদের অনেকই ভাগ্য বিধাতার ওপর নির্ভরশীল। যে ১০% নাগরিককে ‘সচেতন’ বলা হয়েছে তন্মধ্যে ৯৫% অর্থাৎ আমলা, পুলিশ আর বিচারক-সমাজপতিরাসহ রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষবৃক্ষকে তারা সবাই সেবাযত্ন করে তার ক্রমবিস্তৃতি ঘটানোর প্রয়াস পাচ্ছে। এতেকরে মূল জনগোষ্ঠির ৯০% মানুষের রক্ত চুষে স্বীয় ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দুর্নীতিকে ওরা লালনসহ ফাস্টওয়ার্ল্ডের মুনাফাখোরদের ইন্ধনে থার্ডওয়ার্ল্ডের রাজনীতিকে করে রাখছে অস্থিতিশীল। ফলে উন্নয়নশীল দুনিয়ায় অনেক কিছুই আর্থিক মানদন্ডে তুলনা করা হয়- বিধায় সাংবাদিকতা পেশায় সৎভাবে অর্থ উপার্জনের স্বল্পতার কারণে অনেকের কাছে পেশাটি এক্কেবারে নগন্য! বিশেষ করে বাংলাদেশের অসাধু রাজনীতিবিদ আর আমলা-পুলিশ ও বিচারক-সমাজপতিদের কাছে সাংবাদিকতা পেশাটি অর্থের বিনিময়ে পাওয়া কতিপয় চাকর-চামচাদের মতই বর্তমানে গন্য হচ্ছে!

বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির এযুগে শিক্ষা, সংস্কৃতির তথা জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশার মান বৃদ্ধি পেলেও মর্যাদাশীল বলতে যা বোঝায় তার স্বীকৃতি পাওয়া এখনো সম্ভব হচ্ছেনা। একজন সাংবাদিককে অনেকগুলো গুণের অধিকারী হতে হয়, তন্মধ্যে নিরহংকার, নির্লোভ ও অহিংসার মনোভাবসহ চরম ধৈর্য্য ও পরমত সহিষ্ণুতা তাঁর মধ্যে থাকতে হবে। কঠিন সাধনা ও অধ্যবসায়সহ সুকুমারগুণের অধিকারী না হলে- এ পেশায় বেশীদিন টিকে থাকাও সম্ভব নয়! পেশাগত দায়িত্ব পালনে ত্যাগ ও অবদানের তুলনায় বাংলাদেশে প্রাপ্তিটা এক্কেবারে নগন্য হওয়ায় সামাজিকভাবে মর্যাদাশীল ভাবা না হলেও আত্মতৃপ্তিটা বড়কথা হওয়ায় অনেকে এ পেশাকে বেছে নিয়েছেন এবং এখানো নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু অপসাংবাদিকরা এ পেশাটিকে আজ মর্যাদা সম্পন্ন না করে ‘সাংঘাতিক’ বলে ভূক্তভোগি অনেকের কাছে তিরস্কারের পেশা হিসেবেও প্রমাণ করাচ্ছে।