পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা হানাদার বাহিনীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে: রিজভী

234
gb
জিবিনিউজ ডেস্ক::

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর গত দু’দিনে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হানাদার বাহিনীর হামলাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

আজ মঙ্গলবার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ও জাল নথির সাজানো মামলায় কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দিয়ে তাকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করাসহ নানাভাবে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি মেডিকেল বোর্ড বেগম জিয়াকে অর্থোপেডিক বেড দেয়ার সুপারিশ করলেও এখন পর্যন্ত সেটি সরবরাহ করা হয়নি। হাইকোর্ট জামিন দেয়ার পরও শুধুমাত্র বিভিন্নভাবে কষ্ট দিতেই সরকারের নির্দেশে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে রাখা হয়েছে। আমি দলের পক্ষ থেকে আবারো অবিলম্বে বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর গত দু’দিনে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হানাদার বাহিনীর হামলাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর রোববার রাতভর কি নিষ্ঠুরভাবে গুলি করা হয়েছে, টিয়ারশেল মারা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে, হাসপাতালে শত শত ছাত্র-ছাত্রী যেভাবে রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছিল তা দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিন্দার ঝড় বইছে।

তিনি বলেন, কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করে আসছে, তাদের দাবি মানার জন্য বারবার সরকারের কাছে আহবান জানিয়ে আসছে কিন্তু তাতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কর্ণপাত করা হচ্ছে না। গতকালও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতারা তাদের সঙ্গে লোক দেখানো বৈঠক করলেন। তারা কি বললেন-একমাস পর বিষয়টি দেখবেন, কিন্তু আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি না দিয়ে বললেন কারা ভাংচুর ও হামলায় জড়িত তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ছাড়া হবে। গুলি, হামলা, ভাংচুর তো করেছে ছাত্রলীগ। গণমাধ্যমে সেসব খবর বেরিয়েছে, ছবি প্রকাশ হয়েছে তাদের ধরছেন না কেন? সাধারণ শিক্ষার্থীরা তো জানিয়ে দিয়েছে ভিসির বাসভবনে তারা হামলা করেনি।

রিজভী বলেন, ঢাবির ক্যাম্পাস তো ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দখলে ছিল। ঢাবি ক্যাম্পাসে এ মুহূর্তে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী ছাড়া আর কেউ হামলা, ভাংচুর করার সাহস রাখে কি? এ হামলা পরিকল্পিত। আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা ক্যাম্পাসে প্রবেশের দশ মিনিটের মাথায় এই হামলা সংঘটিত হলেও এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভিসির বাসভবনে দু’ঘন্টাব্যাপী হামলা রহস্যজনক। সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ভিন্নখাতে নিতেই সরকারি এজেন্টদের দিয়ে ভিসির বাসভবনে হামলা হয়েছে কি না এ প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

রিজভী আরো বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রীদের কত দাম্ভিকতা। মেধাবী শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে, বারবার তারা সরকারকে তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আহবান জানালেও, এমনকি আলোচনা করে সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানালেও দীর্ঘদিন মন্ত্রীরাসহ শীর্ষ নেতারা বললেন তাদের সাথে কোন আলোচনা নয়, উল্টো মেধাবী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের গুলি করতে ও গ্রেফতার করতে পুলিশকে নিষ্ঠুর আদেশ দিয়ে দিল সরকার। প্রথমে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানানো হলেও এখন আবার আলোচনায় বসলেন সেটিও তামাশার। তামাশা এজন্য যে, আলোচনায় বসার পরেও হুমকি দেয়া হচ্ছে ফুটেজ ধরে বেছে বেছে গ্রেফতার করার জন্য। অর্থাৎ এটি আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদেরকে ভয় দেখানোর জন্য। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের দাবি হলো তারা মেধার ভিত্তিতে চাকরি চায়, মেধার মূল্যায়ন চায়। তাদের ওপর এমন নিষ্ঠুর আচরণ কেন?

তিনি বলেন, গতকাল অর্থমন্ত্রী বলেছেন দেশে সৎ লোকের সংখ্যা বাড়ছে। ক্ষমতাসীনদের দেশ পরিচালনার সাবজেক্ট জনগণ নয়, তাদের সাবজেক্ট জনগণের সাথে মশকরা করা। এই অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা লুট হওয়াকে আশকারা দিয়ে বলেছিলেন-চার হাজার কোটি টাকা লোপাট হওয়া কোনো দুর্নীতি নয়-এখনও সেই কথা মানুষের স্মৃতি থেকে বাসী হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সেক্টরের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ হয়ে অর্থমন্ত্রীর ঐ মন্তব্যটি অপরাধমনস্কতা। দুর্নীতির মহাযজ্ঞে হাইওয়ে খুলে দিয়েছেন দেশের অর্থমন্ত্রী। দুর্নীতির টাকা পাচার করছেন ক্ষমতাসীন দলের অনেক রুই-কাতলা, বিদেশে সেই টাকায় পালিত হচ্ছে তাদের পরিবার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে পালাচ্ছেন এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা, নিরাপদ আশ্রয়ে থাকছেন বিদেশে। সবচেয়ে বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারী হয়েছে এই অর্থমন্ত্রীর আমলে। রাজকোষ থেকে উধাও হয়ে গেছে আটশো কোটি টাকা। আওয়ামী নেতারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত গচ্ছিত সম্পদের ওপর এখন গড়াগড়ি খাচ্ছেন। অথচ এসব বিষয়ে নীরব অর্থমন্ত্রী নিজেদের সরকারকে সৎ মানুষ উৎপাদনের ফ্যাক্টরি বলে মনে করছেন।

রিজভী বলেন, আমরা এর আগে বলেছিলাম-জিডিপির’ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের ঘোষণা চাপাবাজি। গতকাল বিশ্বব্যাংক বলেছে- দেশে বিনিয়োগ স্থবির, রফতানি আয় কমছে, সকল খাতে প্রবৃদ্ধিও নেতিবাচক। তাহলে জিডিপি বাড়লো কীভাবে, এ প্রশ্ন করেছে বিশ্বব্যাঙ্ক। বিশ্বব্যাঙ্ক আরো বলেছে-জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ এর বেশি হবে না। লুটপাটের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত আওয়ামী সরকার ডাহা মিথ্যার ফেরিওয়ালা।

রিজভী আটক নেতাকর্মীদের বিষয়ে বলেন, গতকাল চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র সহ-সভাপতি এম এ আজিজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম দুলাল, বন্দর থানা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন, মহানগর বিএনপি’র হকার বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল বাতেন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হালিম স্বপন এবং আলকরণ ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক জসিম মিয়াসহ ৫৩ জন নেতাকর্মীর জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া কুলাউড়া বিএনপি’র ৩৯ জন নেতাকর্মীর জামিন বাতিল করে তাদেরকেও জেলে পাঠানো হয়েছে। আমি দলের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বানোয়াট ও অসত্য মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।