প্রেস ক্লাবের ব্যাতিক্রমী অনুষ্ঠান: মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবা ‘ফিরে পাওয়ার’ গল্প (ভিডিও)

62

লন্ডন প্রতিনিধি ||

লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের ৪৮তম জন্ম বার্ষিকীর প্রাক্ষালে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান ‘মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবা ‘’ফিরে পাওয়ার’’ গল্প’ অনুষ্ঠান শুনতে এসে বক্তারা বলেছেন, বিলেতের সুপরিচিত যুব মুখ, জন্মপূর্বে পিতৃহারা সন্তান জামাল খানের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবা নুরুল হক খান মূলত মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবাদেরই প্রতীক। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব এই বাবার বীরত্বগাঁথার গল্প শুনার অনুষ্ঠান আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া সব বাবাদেরই সম্মান জানালো।

সোমবার পূর্ব লন্ডনের প্রেস ক্লাব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের জন্ম পূর্বে হারিয়ে যাওয়া বাবার ছবি উদ্ধার করে বিলেতের পরিচিত যুব মুখ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক জামাল খান সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়ায় আলোড়ন তুললে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব এবারের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজন করে ‘মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবা ‘’ফিরে পাওয়ার’’ গল্প’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠান।
প্রেস ক্লাব সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জোবায়েরের সঞ্চালনায় অায়োজিত এই অনুষ্ঠানের শুরুতে ২৫শে মার্চের কালো রাত্রী ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দাড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। আলোচনার শুরুতে জামাল খান নিজের জন্মের ৪৮ বছর পর জন্ম পূর্বে হারিয়ে যাওয়া বাবার ছবি উদ্ধারের কাহিনী বলতে গিয়ে অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন। বিগত ৪৮ বছর হারিয়ে যাওয়া বাবার অবয়ব কল্পনায় তৈরীকারী জামালের কন্ঠ তখন অব্যক্ত এক কান্নায় বারবার রুদ্ধ হয়ে আসছিলো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামালের বড় আরও চার ভাই বদরুজ্জামান খান, সদরুজ্জামান খান, খসরুজ্জামান খান ও জয়নাল খান। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাবা হারিয়ে যাওয়ার সময়ে ১২ বছর বয়সী জামাল খানের বড় ভাই কাউন্সিলার সদরুজ্জামান খানও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তাঁর বাবা হারানোর সময়কার গল্প। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ও পরবর্তীতে সংসার সাগরে স্বামীহীন তাঁর মায়ের মানবেতর হাবুডুবু খাওয়ার হৃদয়স্পর্শী কাহিনী তিনি এসময় শেয়ার করেন অনুষ্ঠানের দর্শক স্রুোতাদের কাছে। বাবার সাথে সাথে তাঁর ছবিগুলোও হারিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে কাউন্সিলার সদরুজ্জামান খান বলেন, ‘বাবার ছবি ও ডকুমেন্টের আশায় বারবার পিলখানায় (বিজিবি সদর দপ্তর) গেলেও আমাদের দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর জন্ম নেয়া আমাদের ছোট ভাই জামালের বাবার চেহারা দেখতে না পাওয়ার মানষিক যন্ত্রণা বারবার আমাদের পিলখানায় নিয়ে গেলেও প্রতিবারই আমাদের ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।’ শেষ পর্যন্ত মানষিক যন্ত্রনাকাতর ছোট ভাই জামালই বাবার ছবি ও ডকুমেন্ট উদ্ধার করে, এমনটি জানিয়ে সদরুজ্জামান খান এসময় কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মূল্যায়নে শেখ হাসিনা সরকারের অসামান্য ভূমিকা অতুলনীয়। প্রধান মন্ত্রীর এই প্রেরণাদায়ক মূল্যায়নে বাবা হারানোর কষ্টটি এখন আমরা ‘গৌরবের কষ্ট’ ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করি’। তিনি এসময় মুক্তি বাহিনীর প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীর কথাও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন, বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এই স্বীকৃতি আদায়ে জেনারেল ওসমানীর অবদানও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি আমরা। এক প্রশ্নের জবাবে সদরুজ্জামান খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বাবা শহীদ হয়েছেন ৭২ সালে সরকারীভাবে এটি জানানো হলেও এতদিন আমরা জানতামনা বাবা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কখন, কোথায় শহীদ হয়েছেন। গত মাসে ডকুমেন্ট ও ছবি উদ্ধারের পরই আমরা জানতে পারি ১৯৭১ সালের ৫ই মে আমার বাবা শহীদ হন, এবং সিলেট ক্যাডেট কলেজে একটি গণ কবরে তাঁকে মাটিচাপা দেয়া হয়।
শহীদ সন্তান জামাল ও সদরুজ্জামান খানের বাবা হারানোর কাহিনী শুনার পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অন্যানের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের প্রবীন সংগঠক সুলতান শরীফ, প্রবীন সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন, সত্যবাণীর সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা, সাংবাদিক বুলবুল হাসান, কাউন্সিলার আহবাব হোসেন, কাউন্সিলার শাহ সোহেল আমীন, আব্দুল কাদির মুরাদ, রায়হান আহমেদ তফাদার ও সৈয়দ আব্দুল কাদির।
জামাল খানের বাবা শহীদ নুরুল হক খানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতিপয় মানুষের বিভ্রান্তি ছড়ানোর তীব্র প্রতিবাদ করে বক্তারা বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর ১৯৭২ সালেই সরকারী স্বীকৃতি পাওয়া এমন একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়ায় তারা নিজের মা ও মাটিকেই মূলত অস্বীকার করে। এরা সমাজের কলঙ্ক। শহীদ নুরুল হক খান মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া সব বাবাদের প্রতীক, এমন মন্তব্য করে বক্তারা বলেন, প্রেস ক্লাব আয়োজিত আজকের এই ব্যাতিক্রমী অনুষ্ঠান  মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া সব বাবাদের প্রতিই শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রতীকি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা শ্রদ্ধা জানাচ্ছি মাতৃভূমি রক্ষায় আত্মত্যাগকারী হারিয়ে যাওয়া সব বাবাদের।
১৯৭২ সালে ঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির প্রয়োজনীয় সরকারী ডকুমেন্ট অনুষ্ঠানে প্রেস ক্লাব নেতৃবৃন্দের হাতে তুলে দেন শহীদ নুরুল হক খানের সন্তানরা।
হারিয়ে যাওয়া বাবা ‘ফিরে পাওয়ার’গল্প পর্ব শেষে প্রেস ক্লাব সদস্যরা পরিবেশন করেন দেশাত্ববোধক গান।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্য যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির, যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক জামাল খানের বাবা শহীদ নুরুল হক খান তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ রাইফেলস , বিডিআর) একজন সৈনিক ছিলেন।
একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে আগে গ্রামের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুরে তিনি ছিলেন ছুটিতে। যুদ্ধ শুরু হলে দেশপ্রেমিক এ সৈনিক আর নিজেকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে পারেননি। গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে একাত্তরের এপ্রিল মাসে বেড়িয়ে যান বাড়ি থেকে। এরপর নুরুল হক খানের আর কোনো খবর নেই। পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন খবর আসতে থাকে নুরুল হক খানের পরিবারের কাছে। কেউ বলেন, তিনি গ্রেফতার হয়েছেন পাক আর্মির হাতে। কেউ বলেন, পাক আর্মির সাথে সম্মুখ সমরে নিহত হয়েছেন নুরুল হক খান।
৬ ছেলে ও ১ কন্যা সন্তানের জনক (জামাল তখনও মাতৃগর্ভে) নুরুল হক খানের কিশোর বয়সী বড় দুই ছেলে বদরুজ্জামান খান ও সদরুজ্জামান খান বাবার খোঁজে চষে বেড়াতে থাকেন সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল। সাহায্যের আশায় পাকিস্তানী বাহিনীর দোসর স্থানীয় শান্তি কমিটির এক নেতার কাছে গেলে তাদের অপমানিত হয়ে বেড়িয়ে আসতে হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই ফেরেন বীর বেশে। কিন্তু নুরুল হক খানের কোনো খবর নেই। অবশেষে তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নুরুল হক খান মিশে আছেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে। শুয়ে আছেন সিলেট ক্যাডেট কলেজের ভেতরে একটি গণকবরে। যুদ্ধ করতে গিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে একাত্তরের ৫ মে শহীদ হন তিনি।
শহীদ নুরুল হক খানের ছোট ছেলে জামাল খানের জন্ম হয় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে, বাবার মৃত্যুর ৮ মাস পর। জন্ম থেকে মধ্য বয়স— এই দীর্ঘ সময় বাবার অবয়ব ছিল জামালের কল্পনায়। গত মাসে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে ছবি পাওয়ার পর কল্পনায় বাবার অবয়ব আঁকার সমাপ্তি হয় জামালের। বাবার চেহারা কেমন ছিল— শেষ পর্যন্ত তা জানতে পেরেছেন, এটাই জামাল খানের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা এখন।

মন্তব্য
Loading...