শায়খ রাশিদ খান ||
কুরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়; বরং একজন মুমিনের জীবন, সাফল্য, আনন্দ-বেদনা, বিশ্রাম ও আখিরাতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। কথাগুলো বলেছেন ইমাম শায়খ রাশিদ খান।
৩১ জুলাই শুক্রবার জুমার খুতবায় "কুরআনের আলোয় জীবনকে দেখার শিক্ষা" শিরোনামে প্রদত্ত খুতবায় তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবন ছিল অসাধারণ ভারসাম্যের উদাহরণ । তিনি যেমন হাসতেন, শিশুদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেন, তেমনি আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।
তিনি বলেন, অনেক সময় রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর ব্যক্তিত্বকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয় । কেউ তাঁকে সবসময় গম্ভীর হিসেবে দেখেন, আবার কেউ শুধু হাস্যোজ্জ্বল ও রসিক হিসেবে তুলে ধরেন । অথচ তাঁর চরিত্রে ছিল মমতা, হাস্যরস, গভীর চিন্তা ও আল্লাহভীতির অপূর্ব সমন্বয়।
ছোট সাহাবি আবু উমাইরের পোষা পাখি মারা যাওয়ার ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা:) তাঁর দুঃখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আবার হযরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাও মহানবীর (সা:) পারিবারিক জীবনের আনন্দময় দিক তুলে ধরে।
একই সঙ্গে রাসুল (সা:) বলেছেন, “তোমরা যদি তা জানতে যা আমি জানি, তাহলে কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে।”
শায়খ রাশিদ বলেন, তাঁর হাসি কখনো উদাসীনতার প্রকাশ ছিল না এবং আখিরাতের ভয়ও তাঁকে কঠোর করে তোলেনি। তাঁর সমস্ত আচরণ পরিচালিত হতো ওহির আলোকে।
হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, “তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”
খতিব শায়খ রাশিদ বলেন, কুরআন ছিল মহানবী (সা:)-এর পৃথিবীকে দেখার ‘লেন্স’। রহমত, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট, জীবন-মৃত্যু—সবকিছুকে তিনি কুরআনের আলোকে বিচার করতেন।
তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষ পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও পরিবেশের প্রভাবে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবনকে দেখে। কিন্তু একজন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধনের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত কুরআন।
এ প্রসঙ্গে তিনি সূরা আল-আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াত উল্লেখ করেন: “নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য।”
তিনি বলেন, ইসলাম জীবনকে ইবাদত ও দুনিয়াবি কাজ—এভাবে আলাদা করে না। একজন মুসলমানের নামাজ যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি তার কর্মজীবন, পরিবার, সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, বিশ্রাম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর সামনে এক মা তার হারিয়ে যাওয়া শিশুকে ফিরে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ সেখানে কেবল মাতৃস্নেহ দেখেছিল। কিন্তু রাসুল (সা:) সেখানে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখেছিলেন। তিনি সাহাবিদের বলেছিলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই মায়ের সন্তানের প্রতি দয়ার চেয়েও অধিক দয়ালু।”
দুনিয়ার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ সম্পর্কে শায়খ রাশিদ বলেন, ইসলাম দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করতে নিষেধ করে না। তবে সাময়িক জীবনকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করা যাবে না। ফুল যেমন একসময় শুকিয়ে যায়, তেমনি দুনিয়ার সৌন্দর্য ও অর্জনও একদিন শেষ হয়ে যাবে।
সাফল্যের কুরআনিক সংজ্ঞা তুলে ধরে তিনি সূরা আলে ইমরানের আয়াত উল্লেখ করেন: “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃতপক্ষে সফল।”
তিনি বলেন, অনেকের কাছে সম্পদ, পদমর্যাদা, প্রভাব ও পরিচিতি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের চূড়ান্ত সাফল্য হলো আল্লাহর রহমত লাভ এবং জান্নাতে প্রবেশ ।
বিশ্রাম ও অবসর নিয়েও তিনি বলেন ঘুম, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং বিরতি নেওয়া আল্লাহর নিয়ামত। তবে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে স্ক্রল করাকে প্রকৃত বিশ্রাম মনে করা ঠিক নয়। এতে অনেক সময় মানুষ আরও ক্লান্ত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে।
খুতবার শেষদিকে শায়খ রাশিদ খান বলেন, জীবনের সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। সন্তানদের সঙ্গে আচরণ, অনলাইন ব্যবহার, অবসর সময় কিংবা নিজের চিন্তাধারা—যেকোনো একটি ক্ষেত্র দিয়ে কুরআনের আলোকে পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।
তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন কুরআনকে আমাদের পৃথিবী দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বানিয়ে দেন, আমাদের অগ্রাধিকার সংশোধন করেন এবং দুনিয়ার নিয়ামত উপভোগ করেও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে যেন আমরা গাফিল না হই।
শায়খ রাশিদ খান : অতিথি খাতীব, ইস্ট লন্ডন মসজিদ এন্ড লন্ডন মুসিলম সেন্টার। জুমার খুতবা ৩১ জুলাই ২০২৬।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন