আগামী ২৬ জুন ইসহাক আলীর ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী

 

আনসার আহমদ উল্লাহ


১৯৭৮ সালে আলতাব আলীর বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড পূর্ব লন্ডনের বাঙালি সম্প্রদায়ের জন্য নিঃসন্দেহে একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা ছিল। তবে এই হত্যাকাণ্ডই একমাত্র বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ড ছিল না। জুন মাসে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, স্থানীয় বাঙালিদের ওপর আরও সহিংস হামলা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে পার্শ্ববর্তী হ্যাকনিতে ৪৫ বছর বয়সী বাঙালি ইসহাক আলীর হত্যাকাণ্ডও ছিল।

 

২৫ জুন ১৯৭৮ সালে, ইসহাক আলীর ওপর হ্যাকনিতে নির্মম হামলা চালানো হয়। হামলায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরবর্তীতে সেই আঘাতের কারণে সৃষ্ট হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

 

২৫ জুন ১৯৭৮ সালের ভোররাত, আনুমানিক রাত ২টা ৩০ মিনিটে, ৪৫ বছর বয়সী ইসহাক আলী এবং তাঁর ২০ বছর বয়সী শ্যালক ফারুক উদ্দিনের ওপর ইসহাক আলীর বাড়ির কাছাকাছি উরসউইক রোডে তিনজন শ্বেতাঙ্গ যুবক হামলা চালায়। ইসহাক আলী নিকটবর্তী কুপারসেল রোডের ৬৫ নম্বর বাড়িতে বসবাস করতেন। সেদিন রাতে ইসহাক আলী হ্যাকনির ক্ল্যাপটন রোডে অবস্থিত পারিবারিক টেকঅ্যাওয়ে দোকানে ছিলেন। রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় তাঁর আত্মীয়, বড় ছেলে ফারুক উদ্দিনকে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সঙ্গে পাঠান।

 

হামলাকারীদের বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ছিল। তাদেরকে সাধারণ পোশাক পরিহিত এবং মাঝারি গড়নের, প্রায় ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি থেকে ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার শ্বেতাঙ্গ যুবক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রথমে একজন যুবক তাদের কাছে এসে সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার  চায়, পরে টাকা দাবি করে। ইসহাক আলী ও ফারুক উদ্দিন তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই যুবক ইসহাক আলীকে লাথি মারে। অল্পক্ষণের মধ্যেই আরও দুইজন শ্বেতাঙ্গ যুবক তার সঙ্গে যোগ দেয় এবং তারা দুই বাঙালি ব্যক্তির ওপর হামলা চালায়। ইসহাক আলী ও ফারুক উদ্দিনকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। একটি বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করতে জুতার ফিতা ব্যবহার করা হয়েছিল। পাঁচ সন্তানের জনক ইসহাক আলী হামলার পর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও, রাত ৩টা ৩২ মিনিটের দিকে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যু পূর্ব লন্ডনে বাঙালি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত বর্ণবাদী সহিংসতার এক মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

 

ইসহাক আলী

 

ইসহাক আলী ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে আসেন। তিনি পেশায় একজন টেইলার ছিলেন এবং পাশাপাশি ব্রিক লেনে একটি ফ্যাক্টরির মালিকও ছিলেন। তাঁর জন্ম বাংলাদেশের সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ফেনগ্রাম। ইসহাক আলীর স্ত্রী লতিফা আক্তার এবং তাঁর পাঁচটি ছোট সন্তান ছিল, শামিম, কবির, বাবর, জুবের এবং সোহেল । এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তানটির বয়স ছিল মাত্র নয় মাস, যখন তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি গভীর শোক ও সংকটে পড়ে। ১৯৭৮ সালের আগস্টে তাঁর মরদেহ নিজ গ্রাম, সিলেট, বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়।

 

 

ইসহাক আলীর কবর

 

ইসহাক আলী ছিলেন একজন উদ্যোক্তা। তাঁর ঢাকার গাউসিয়া মার্কেটে একটি পোশাকের দোকান, বিয়ানীবাজারে একটি শাড়ির দোকান ছিল এবং তিনি চট্টগ্রামেও কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজন, বিশেষ করে কাজিন ও ভাগ্নেদের, যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ইসহাক আলীর জন্ম ১৯৩৩ সালে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ফেনগ্রামে। তিনি ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট; তাঁর একজন বড় ভাই এবং পাঁচজন বড় বোন ছিলেন। বিবাহের পর তিনি প্রথমবার ১৯৬৫ সালে, ৩২ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে আসেন। শুরুতে তিনি ব্রিক লেনে একজন মেশিনিস্ট হিসেবে কাজ করেন এবং পরে নিজস্ব একটি লেদার ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা করেন। হ্যাকনিতে একটি বাড়ি কেনার পর তিনি ১৯৭৫ সালে তাঁর স্ত্রী ও তিন ছেলেকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তাঁদের আরও দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ, যিনি পরিবারের উন্নতি ও সাফল্যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি বহু আত্মীয়কে স্পনসর করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসেন এবং তাঁদের তাঁর ফ্যাক্টরিতে কাজের সুযোগ দেন। তিনি ছিলেন ফুটবলের প্রতি আগ্রহী একজন ব্যক্তি এবং বন্ধু ও পরিবারের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তাঁকে জানতেন এমন লোকেরা তাঁর ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা ও দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করতেন। অনেকেই মনে করতেন তিনি জীবনে বড় সাফল্যের জন্যই জন্মেছিলেন, তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে।

 

ইসহাক আলী (বায়ে ) তার পরিবারের সদস্যদের সাথে 

 

দুঃখজনকভাবে, ইসহাক আলীর মৃত্যু পরিবারটির ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। ১৯৮৪/৮৫ সালে তাঁর স্ত্রী লতিফা আক্তার স্ট্রোক করেন। চিকিৎসকেরা শুরুতে তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র কয়েক মাস বলে জানালেও তিনি অসাধারণ দৃঢ়তা ও ধৈর্যের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন। তবে স্ট্রোকের কারণে তাঁর শরীরের ডান পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই কঠিন সময়ে লতিফা আক্তার-এর দুই বোন পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দেন। তারা দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা , সন্তানদের বড় করা এবং অসুস্থ বোনের যত্ন নেওয়ার কাজে সহায়তা করেন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে লতিফা আক্তার-এর মা তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর খানসহ বাংলাদেশ থেকে হ্যাকনিতে এসে পরিবারের সঙ্গে কয়েক বছর বসবাস করেন। লতিফা আক্তার ২০২১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এই লেখকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সোহেল আহমেদ পরিবারের সম্পর্কে বলেন,  “আমার সব ভাইয়েরই বিয়ে হয়েছে এবং তাদের সন্তান আছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করি। আমার মনে হয়, এতে করে আমরা কিছুটা শান্তি খুঁজে পেয়েছি।”

 

 

লতিফা আক্তার তার পাঁচ ছেলের সাথে

 

 

হ্যাকনি গেজেট

 

 

শেষ পর্যন্ত এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজন তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যা অভিযোগ আনা হয়। তাদের মধ্যে ছিল জেমস মিচেল (১৭ বছর বয়স), যে ক্যামডেনের কেন্টিশ টাউন রোডের একজন ক্যাবিনেট মেকার ছিল, এবং হোমারটন এলাকার আরও দুইজন ১৬ বছর বয়সী কিশোর। ১৯৭৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে। তবে তারা হত্যা অভিযোগে নয়, বরং “এসোল্ট উইথ ইনটেন্ট টু হার্ম ” এবং “অ্যাকচুয়াল বডিলি হার্ম ”–এর জন্য দোষী প্রমাণিত হয়। প্রত্যেক অপরাধের জন্য তাদের ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা একই সাথে কার্যকর হয়।

 

 

টাইমস, জুলাই ১৯৭৮

 

কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া

 

এই হত্যার পর কমিউনিটির অনেকেই  নিজ উদ্যোগে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেন। ৩০ জুন তারিখে প্রায় ৩০০ জন মানুষ কালো পতাকা ও কালো আর্মব্যান্ড পরে ইসহাক আলীর ওপর হামলার স্থান থেকে হ্যাকনি পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত মিছিল করেন। এই প্রতিবাদ মিছিলটি সংগঠিত করে হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি। এই সংগঠন পরবর্তীতে ১৭ জুলাই একটি “ডে অফ একশন ” ঘোষণা করে।

 

 

১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে ইসহাক আলীর হত্যাকাণ্ডের পর হ্যাকনি টাওয়ার হ্যামলেটস প্রতিরক্ষা কমিটি গঠিত হয়েছিল। ছবি © হমার সাইকস

 

 

হ্যাকনি টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি

 

ইসহাক আলীর মৃত্যুর পর, ১৯৭৮ সালের পরবর্তী মাসে হ্যাকনির কর্মী ও টাওয়ার হ্যামলেটসের কর্মীরা একত্রিত হয়ে “হ্যাকনি ও টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি” গঠন করেন। এই কমিটি গঠিত হয়েছিল হ্যাকনি কমিটি এগেইনস্ট রেসিজম এবং টাওয়ার হ্যামলেটস মুভমেন্ট এগেইনস্ট রেসিজম অ্যান্ড ফ্যাসিজম, এই দুই সংগঠনের একীভূত রূপ হিসেবে। এর নেতৃত্বে ছিলেন রেভারেন্ড কেন লিচ। এই উদ্যোগটি পূর্ব লন্ডনের বাঙালি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী সহিংসতা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

A newspaper with a picture of a group of people

Description automatically generated with low confidence

১৬ জুলাই ছিল দুই দিনের একটি কর্মসূচির সূচনা, যা সংগঠিত করেছিল হ্যাকনি অ্যান্ড টাওয়ার হ্যামলেটস ডিফেন্স কমিটি, হ্যাকনি ও টাওয়ার হ্যামলেটসের কাউন্সিল ফর রেশিয়াল ইকুয়ালিটি এবং এন্টি নাজি লীগ । এই দিনে বর্ণবাদবিরোধীরা সকাল ১০টা ৩০ থেকে ব্রিক লেনে একটি সিট-ডাউন প্রতিবাদ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ন্যাশনাল ফ্রন্টকে তাদের সংবাদপত্র বিক্রি করতে বাধা দেওয়া। পরদিন, ১৭ জুলাই, বাঙালি শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ধর্মঘট করেন। এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত সমাবেশে বক্তারা প্রায় ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ স্থানীয় শ্রমিকের বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখেন, যা “ব্ল্যাক সলিডারিটি ডে ” হিসেবে বর্ণবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে এক যৌথ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই ধর্মঘটে গ্রুনউইক এশিয়ান মহিলা ধর্মঘটকারী শ্রমিকরা, ফোর্ড ডাগেনহাম প্ল্যান্টের শ্রমিকরা এবং স্কুল শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন। এটি পূর্ব লন্ডনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের একটি বড় ও ঐক্যবদ্ধ প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

সেই দিনে হ্যাকনির প্রায় ৭০ শতাংশ এশীয় দোকান বন্ধ ছিল এবং অনেক শিশু স্কুলে যায়নি। ক্ল্যাপটন স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থী হ্যাকনি টাউন হলে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অংশ নেয়। দিনটির শেষাংশে বেথনাল গ্রিন পুলিশ স্টেশনের বাইরে তিন ঘণ্টাব্যাপী একটি সিট-ডাউন - রাস্তায় অবস্থান - প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। এই বিক্ষোভ চলাকালে তিনজন প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

 

ধর্মঘটের কারণে কার্যত ব্রিক লেন ও স্পিটালফিল্ডসের

gbn

মন্তব্যসমূহ (০)


ব্রেকিং নিউজ

লগইন করুন


Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password


মন্তব্য করতে নিবন্ধন করুন