জিবি নিউজ প্রতিনিধি//
সিলেট বিভাগে সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে লোডশেডিং। শহর এলাকায় ঘণ্টা দেড় ঘণ্টা পর বিদ্যুতের দেখা মিললেও গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ অবস্থা।
বিদ্যুৎ বিভাগে এই চরম অবস্থা বিরাজ করলেও কোনো তথ্যই জানেন না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেট বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন। তিনি জানান, ‘সিলেটের লোডশেডিং হচ্ছে- আমার জানা নেই’।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নগরীর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। বিভাগের কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে সব মিলিয়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। দিন-রাতের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগে পড়েছেন সিলেটের মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, বয়স্করা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতাল, এসএসসি পরীক্ষার্থী, বয়স্করা আছেন বিপাকে। মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। দিনের শেষভাগে ব্যবসা শুরুর আগেই বন্ধ করতে হচ্ছে তাদের প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীদের রাস্তায় নামা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
পিডিবি জানিয়েছে, সিলেটে বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় দৈনিক গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ লোডশেডিং চলছে।
জানা যায়, হবিগঞ্জের বিবিয়ানায় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। সিলেটের অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত কোনো সময়সূচি ছাড়াই গত কয়েকদিন ধরে সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র শিল্প ও দোকানপাটেও উৎপাদন ও বেচাকেনায় প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে। অনলাইনে ক্লাস ও পড়াশোনা নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। এছাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রেস্তোরাঁ, কফিশপ, ফাস্টফুডসহ বিভিন্ন খাবার দোকানের ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকলে তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বেশিরভাগ সময় ফোন রিসিভ করা হয় না। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় দৈনন্দিন কার্যক্রম ও দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা জানান, দিন-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিনির্ভর এলাকার অনেকেই সেচ ও অন্যান্য বিদ্যুৎনির্ভর কাজেও সমস্যায় পড়ছেন।
বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন আরও কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে জাতীয় গ্রিডে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও সরবরাহ বাড়েনি। জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন না বাড়লে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।
বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা যায়, সিলেটে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে বর্তমানে লোডশেডিং পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় দৈনিক গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিঘ্নিত হচ্ছে। সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের মোট চাহিদা ১৭৫ মেগাওয়াট, বর্তমান সরবরাহ হচ্ছে ১৪৫ মেগাওয়াট, বর্তমানে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে এই লোডশেডিং হচ্ছে। এছাড়া সিলেটে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকদের প্রতিদিন ৫৪৬ মেগাওয়াট চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমাদের সরবরাহ করা হচ্ছে ৪১৬ মেগাওয়াট। ১৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি কারণে লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে আরও জানা যায়, সিলেট মহানগরে গড়ে দৈনিক প্রায় ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গত কয়েক দিনে প্রায় ৭০ শতাংশ সময় লোডশেডিং হয়েছে। এ সময় মাত্র ৩০ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল। প্রতিটি ফিডারে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিং চালানো হচ্ছে।
এ ছাড়া, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। সিলেট বিমানবন্দরে বিদ্যুৎ বন্ধ না রেখে সরবরাহ অব্যাহত রাখা হচ্ছে। বিমানবন্দরের নিজস্ব ডিজেল সংকট থাকায় তারা বিদ্যুৎ চালু রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। এছাড়া গ্রিড থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ বরাদ্দের ওপর ভিত্তি করে লোডশেডিং নির্ধারণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তিত হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো শিডিউল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না ও পূর্বঘোষিত সময়সূচি ছাড়াই রোটেশন ভিত্তিতে লোডশেডিং চলছে বলে জানা গেছে।
এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী নগরীর সুবিদবাজারের বাসিন্দা নিশানী পাল বলেন, ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা। বর্তমানে দিন ও রাতে বারবার বিদ্যুৎ নেওয়া ভোগান্তিতে পড়েছি। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। নগরীর পাঠানঠুলার বাসিন্দা রাসেল আহমদ কালবেলাকে বলেন, দিন ও রাতে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে আমাদের। গরম আবহাওয়ার কারণে শিশু ও আমার অসুস্থ মাকে নিয়ে বিপাকে পড়েছি।
সুনামগঞ্জের এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য নুরুল হাসান আতাহার কালবেলাকে বলেন, একদিকে বৃত্তি পরীক্ষা চলছে অন্যদিকে আগামী ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে, এসময় সুনামগঞ্জে বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। দিনে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ী সাকিব আহমদ কালবেলাকে বলেন, আমার ব্যবসাটা নির্ভর করে বিদ্যুতের উপর, কারণ বিদ্যুৎ ছাড়া ডিজিটাল মেশিন চলে না। দিনে রাতে সমান তালে লোডশেডিং চলছে। বিদ্যুৎ অফিস যখন মন চায় তারা ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ করে রাখে। এ নিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরা মাঠে মরা অবস্থা।
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন