প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই রাজধানীকেন্দ্রিক। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ধাপে ধাপে এই পর্যায়ে এগিয়ে নেওয়া হবে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বর্তমান সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায়।
গতকাল সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, হামের টিকা নিয়ে বিগত দুই সরকারের উদাসীনতা ক্ষমাহীন অপরাধ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ বক্তব্য দেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠক। অনুষ্ঠানে উপজেলা পর্যায়ের ছয়জন চিকিৎসক ডা. মঞ্জুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, ডা. শোভন কুমার বসাক, ডা. মজিবুর রহমান, ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, ডা. সুমন কান্তি সাহা ও ডা. তাসনিম জুবায়েরকে কর্মদক্ষতার জন্য ক্রেস্ট প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচ অ্যান্ড এফপিও) কার্যক্রমকে যুগোপযোগী করা, সার্বিক কার্যক্রম অবহিত করাসহ সরকারের নির্দেশনা জানানোর জন্য এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সব চিকিৎসক ও কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, চিকিৎসা পেশার গুরুত্ব যেকোনো পেশার চেয়ে বেশি এবং বর্তমান সরকার সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, চিকিৎসকরা রোগে-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু এবং বিপদের প্রকৃত সঙ্গী। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে স্বাস্থ্যনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছিলাম। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে, “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম”। আমরা যদি আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি তাহলে রোগের বিস্তার মোকাবিলা সম্ভব। আমাদের এই নীতি বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।’
তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে প্রণীত ‘যৌথ ঘোষণা’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে সংক্রামকের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ যেমন শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, হৃদরোগ ইত্যাদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে উপজেলা পর্যায়েই গুরুত্বসহকারে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং নিয়মিত করা প্রয়োজন। জীবনযাপনের ধরন পরিবর্তন করার ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি জরুরি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইউএইচ অ্যান্ড এফপিওরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কর্মযজ্ঞে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং সেখানে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম সারির যোদ্ধা। ‘হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট’ একটি অপরটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিজ কর্মস্থলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার কাজটিও সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে হয়। কারণ হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট এবং হেলথ কেয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজমেন্ট এই দুটি বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং সম-উন্নয়ন না হলে স্বাস্থ্যসেবায় কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে না।
তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপি সরকার বিস্তারিত পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
আমেরিকার বিখ্যাত পুষ্টিবিদ প্রয়াত ‘জ্যাক লালেন’-এর উক্তি ‘আজকের স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণেই যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) জেনারেল প্র্যাকটিশনার-জিপির আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের চিন্তা রয়েছে। এই স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটগুলোতে দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারা দেশে ১ লাখ ‘হেলথ কেয়ারার’ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তারা মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথ কেয়ার দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ভবিষ্যতের স্বার্থে যেকোনো মূল্যে আমাদের মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে হবে।
তিনি বলেন, সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ায় বিগত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ। এসব ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য আমি সব চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আর যারা তাদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন সেই সব পিতামাতা এবং স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে দুঃখপ্রকাশ করছি। দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহির আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেকোনো নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমাব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যাতে কোনো নাগরিক চিকিৎসাব্যয়ের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা রক্ষায় সরকার আন্তরিক। নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কেও সরকার ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারেও সরকার সাধ্যমতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বদ্ধপরিকর।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমি একটি বার্তা দিতে চাই, সেটি হলো প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ এলাকায় একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন। আপনারা একটি জবাবদিহিমূলক, টেকসই এবং জনগণকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। আপনাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকার কর্মস্থলকে একটি মডেল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত করবেন।’
জিবি নিউজ24ডেস্ক//
মন্তব্যসমূহ (০) কমেন্ট করতে ক্লিক করুন